Advertisement
E-Paper

ব্যাপ্ত অন্ধকারে এক আলোকরেখা

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারাতে বাধ্য হন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাঙালিনিধন যজ্ঞে মেতে উঠেছিল।

আবুল হাসনাত

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৬ ০০:০০
নিন্দিত নন্দন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।  শব্দশৈলী, ৩০০.০০

নিন্দিত নন্দন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। শব্দশৈলী, ৩০০.০০

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারাতে বাধ্য হন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাঙালিনিধন যজ্ঞে মেতে উঠেছিল। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগঞ্জেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে হত্যাকাণ্ড চালায় তা এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। প্রাণ হারান ত্রিশ লক্ষ মানুষ।

যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্র ব্যাপক অর্থে লাঞ্ছিত নারীদের নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেনি বা সম্মান জানায়নি। তাঁরা দেশের জন্য লাঞ্ছিত হয়েছেন গর্বভরে একথা উচ্চারণ করে তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ আখ্যা দেওয়া হয়। পরে সামাজিক ও অবহেলাজনিত কারণে অনেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। অনেককেই মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। তবে কয়েক বছর থেকে এঁদের অনেককে রাষ্ট্র ও সমাজ নানা ভাবে সম্মান জানাচ্ছে।

বহু নারী আত্মসম্মানে ঘা লাগায় আত্মঘাতী হন। ধর্ষণের শিকার বহু নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এই সব মেয়েদের পরিবার গ্রহণ না করায় তাঁরা নারী-পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পুনর্বাসন কেন্দ্রে ও হোমে বহু শিশুকে রাখা হয়। বিদেশে দত্তক গ্রহণে ইচ্ছুক দম্পতিদের হাতে অনেক শিশুকে তুলে দেওয়া হয়। পাশ্চাত্যের বেশ কয়েকটি দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধশিশুকে পাঠানো হয়। মাদার টেরিজা তাঁর পরিচালিত হোমে কয়েকটি শিশুকে গ্রহণ করেন। আজ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত এই শিশুদের অনেকেই কখনও কখনও দেশমাতৃকার টানে বাংলাদেশ দেখতে আসেন।

Advertisement

বিগত শতকের একাত্তরে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, সেই দুঃসময়ে, সেই সুসময়ের কথা লিখিত হয়েছে একটি গ্রন্থে। গ্রন্থটি লিখেছেন এমন একজন নারী, যিনি ভাস্কর; যাঁর কাজ দেখলে অবনঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায়। প্রথাবদ্ধ ভাস্কর্যশিক্ষা নেননি বটে, তবে তাঁর কাজে ভাস্কর্যগুণ আছে। ছন্দ আছে। অন্য দিকে বর্তমানে তিনি প্রতিবাদী এক কণ্ঠস্বর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকার্যে পাকিস্তানিদের লোমহর্ষক নির্যাতনের সাক্ষ্যও দিয়েছেন। কী ভাবে তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন সে কথাও বলেছেন।

আলোচ্য বইয়ে ফেরদৌসী তাঁর সম্ভ্রম হারানোর বেদনা ও কষ্টের কথা লিখেছেন বিস্তারিত ভাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সব পর্যায়ের সেনারা মানুষ হত্যার সঙ্গে যে কত নারীলোলুপ হয়ে উঠেছিল তা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বুকচাপা এক কষ্ট নিয়ে ফেরদৌসী সে সব কথা লিখেছেন। সেনারা ছলে ও বলে নারীধর্ষণের মধ্যে দিয়ে এক মানসিক উল্লাসের স্বাদ পেত। কিন্তু বহু নারী ধর্ষিত হলেও ফেরদৌসীর মতো কেউ এই দুঃসহ কষ্টের কথা লেখেননি। সে দিক থেকে এই বইটি হৃদয়মথিত করা তাৎপর্যময় এক আলেখ্য হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেরদৌসী খুলনার একটি জুটমিলে চাকরি করতেন। অবরুদ্ধ খুলনায় তিনি সেই ঘেরাটোপে বন্দি হন ও ধর্ষিত হতে থাকেন। প্রথম যে দিন ধর্ষিত হন তার বিবরণ বড় মর্মস্পর্শী। পরে বারবার এর পুনরাবৃত্তি ঘটে। সম্ভ্রম রক্ষার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন ফেরদৌসী। কখনও একজনের হাত থেকে পরিত্রাণ পেলেও আর একজন ওঁত পেতে থাকে। একাত্তরের এপ্রিলের পর থেকে খুলনা ও খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে পাকিস্তানি অবাঙালি, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে ভাবে স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে নিধন করার যজ্ঞে মেতে উঠেছিল তা বিশদে উঠে এসেছে।

বইটিতে ফেরদৌসী তাঁর বাল্য ও কৈশোরের কথাও লিখেছেন। তাঁর বাল্য ও কৈশোর কেটেছে খুলনায়। কৈশোরকালের জীবনযুদ্ধের ও বেঁচে থাকার আকূতির কথা আছে। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন মধ্যবিত্তের বেঁচে থাকার খুঁটিনাটি, অসচ্ছলতা ও প্রাত্যহিক নানা অনুষঙ্গ। কৈশোরে সংগ্রাম করতে হলেও তাঁর কাছে সময়টা ছিল বর্ণময়। বাড়িতে ছিল সংস্কৃতি চর্চার আবহ। পিতার চাকরিসূত্রে খালিশপুর ও ঢাকায় পড়াশোনা করেন তিনি। খুলনা থেকে দৌলতপুর, কখনও ঢাকা, আবার খুলনায় কৈশোরের এই পরিক্রমা, শিক্ষাগ্রহণ ও জীবন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তিনি। স্কুলের শিক্ষা শেষে তাঁর বিয়ে হয়। সে বিয়ে সুখের হয়নি। স্বামীর পীড়নে বিবাহিত জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। স্বামী তিন সন্তান ও স্ত্রীর দায় বহন না করায় জীবনসংগ্রামে বিপর্যস্ত হতে হতে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে তখন ফেরদৌসী খুলনা জুটমিলে চাকরি নেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানর জন্য তাঁর এই চেষ্টায় পাশে ছিলেন তাঁর মা। এই পর্বেই তিনি একাত্তরের দিনগুলির সম্মুখীন হন। বাড়ির সামনে পাক বাহিনীকে ব্রাশফায়ারে একসঙ্গে চৌদ্দোজনকে মেরে ফেলতে দেখেছেন। এই হত্যাযজ্ঞ তাঁর হৃদয়কে দীর্ঘদিন বিষাদগ্রস্ত করে রেখেছিল। হত্যাদৃশ্য দেখা, ত্রাসের মধ্যে জীবনযাপন ছিল নিত্যসঙ্গী। মুক্তিযোদ্ধাদের কথাও লিখেছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী তাঁকে পরিত্যাগ করেন, সন্তানদের নিয়ে কিছু দিনের জন্য নিরুদ্দিষ্টও হয়ে যান। সন্তানদের ও সম্ভ্রমহানির জন্য তাঁর জীবনে যে শূন্যতা এসেছিল এবং বেঁচে থাকার সমস্ত অবলম্বন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় জীবন বিপন্ন জেনেও একজন উদারহৃদয় মানুষ পরম নির্ভরতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর জীবনে। সব জেনেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন তিনি, জীবনসঙ্গী হন। চরাচরব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে সেটাই ছিল এক আলোকরেখা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy