Advertisement
E-Paper

মজুরি ছাড়াও গরিবরা যা পাচ্ছেন

জা তীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনার জন্যই হয়তো গ্রামের গরিব পরিবারগুলোতে বাচ্চাদের টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে, অথবা নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন বড়রা— এমন কথা শুনলে অনেকেই প্রতিবাদ করবেন। ভারতে বেশির ভাগ টিকাই নিখরচায় দেওয়া যায়। শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র অবধি গেলেই হয়। হাসপাতালে গেলে ওষুধও পাওয়া যায়। তার জন্য নারেগা-কে কৃতিত্ব দেওয়ার দরকার কী?

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০১
গরিবের সম্মান। ময়নাগুড়িতে ‘নারেগা’-র কাজ চলছে। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক

গরিবের সম্মান। ময়নাগুড়িতে ‘নারেগা’-র কাজ চলছে। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক

জা তীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনার জন্যই হয়তো গ্রামের গরিব পরিবারগুলোতে বাচ্চাদের টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে, অথবা নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন বড়রা— এমন কথা শুনলে অনেকেই প্রতিবাদ করবেন। ভারতে বেশির ভাগ টিকাই নিখরচায় দেওয়া যায়। শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র অবধি গেলেই হয়। হাসপাতালে গেলে ওষুধও পাওয়া যায়। তার জন্য নারেগা-কে কৃতিত্ব দেওয়ার দরকার কী?

যাঁরা এই যোজনার ঘোর সমর্থক, তাঁরাও ‘নারেগা’-র পক্ষে যুক্তি খাড়া করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ সুবিধার কথাই বলছেন। বলছেন, আয় বাড়ার ফলে কী ভাবে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে দরিদ্র পরিবারগুলিতে, কী ভাবে ধীরগতিতে হলেও পুষ্টির উন্নতি হচ্ছে। অথবা, এই প্রকল্পের ফলে কী ভাবে গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নতি হচ্ছে। প্রত্যেকটা প্রসঙ্গই অত্যন্ত জরুরি, সন্দেহ নেই। কিন্তু, ‘নারেগা’-কে শুধু ওই সীমার মধ্যে দেখলে তার সবচেয়ে বড় তাৎপর্যটা ধরা পড়ে না। রাষ্ট্র যত উন্নয়নমূলক কর্মসূচি চালায়, সেগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার কাজ করে নারেগা। এখানেই তার সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন থেকে শিশুর অধিকার, মানব উন্নয়নের বহু ধাঁধার উত্তর রয়েছে এই প্রকল্পে।

সেই তাৎপর্যের হদিশ পেতে গেলে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ সেন্ধিল মুলাইনাথন আর প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ এলডার শাফিরের শরণ নিতে হবে। গত দুই দশকে অর্থনীতির একটি নতুন ধারা ক্রমে মহা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার নাম আচরণবাদী অর্থনীতি। মানুষের মন কী ভাবে প্রভাবিত করে তার বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে— মনস্তত্ত্ব ও স্নায়ুবিজ্ঞানের সাহায্যে তা বুঝতে চাওয়াই এই ধারার মূল জিজ্ঞাস্য। সেন্ধিল আর এলডার সেই প্রশ্নটিকে নিয়ে গিয়েছেন একটা নতুন স্তরে। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন, অভাব কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে মানুষের সিদ্ধান্তে।

সেই প্রভাব মারাত্মক। সেন্ধিলরা দেখিয়েছেন, আমাদের মাথার ভাবার ক্ষমতা যতখানি— যাকে মাথার ব্যান্ডউইথ বলা যেতে পারে— অভাব তার অনেকখানিই দখল করে রাখে। তার ফলে তীব্র অভাব থাকলে আমাদের সচেতন ভাবে ভাবার ক্ষমতা হ্রাস পায়। তীব্র অভাব আমাদের বোকা করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সমীক্ষা করে তাঁরা দেখেছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় কোনও মানুষের ইন্টেলিজেন্স কোশেন্ট বা বুদ্ধ্যঙ্ক যত, মাথার ওপর অভাবের চাপ থাকলে বুদ্ধ্যঙ্ক কমে যায় তার চেয়ে প্রায় ১৫ একক। এক জন স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষ আর বর্ডারলাইন মেন্টাল রিটার্ডেশনে ভোগা মানুষের মধ্যে বুদ্ধ্যঙ্কের ফারাক যতখানি। অন্য দিকে, অভাব ভুলিয়ে দিতে পারে অনেক অতি প্রয়োজনীয় জিনিসও। যেমন, অভাবী মানুষ ভুলে যান কবে তাঁর ছেলেমেয়ের স্কুলের মাইনে জমা করতে হবে, কবে চাষের জন্য সার-কীটনাশক কিনতে হবে, কবে বাড়ির নতুন ছাউনি না বানালেই নয়। ভুেল যান বাচ্চাকে টিকা দেওয়ানোর কথা, নিজের ওষুধ খাওয়ার কথা।

আসলে ভোলেন না। গরিব মানুষের জীবন অনেকগুলো বল নিয়ে জাগ্‌লিং খেলার মতো। যে বলটা যখন বিপজ্জনক ভাবে মাটির কাছাকাছি নেমে আসছে, শুধু সেই বলটার দিকেই নজর ফেরানোর অবকাশ থাকে তাঁদের। হাওয়ায় থাকা বলগুলো এক এক করে নেমে আসার আগে সেগুলোর দিকে মন দেওয়ার কোনও সুযোগই নেই— ভুলেই থাকতে হয় তাদের। অতএব, পাওনাদার এসে গলায় গামছা দিলে সেই বিপদ সামাল দেওয়াই একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে, তখন আর ছেলের স্কুলের মাইনের কথা মনে পড়ে না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা, সবক’টা বল হাওয়ায় ওড়ে না। কিছু প্রয়োজনে পাশেই পড়ে থাকে, ফলে সেগুলোর কখনও নেমে আসার, এবং মনোযোগ পাওয়ার, সুযোগ হয় না। সেন্ধিলরা প্রয়োজনগুলোকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন— জরুরি, এবং গুরুত্বপূর্ণ। খুব সহজ ভাবে বললে, যে প্রয়োজনগুলোর জন্য বাইরে থেকে তাগাদা আসে, যেমন পাওনাদারের টাকা অথবা স্কুলের মাইনে, সেগুলো জরুরি প্রয়োজন। আর, যে কাজগুলোর গুরুত্ব আমরা নিজেরা বুঝি, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ সেই কাজগুলো করার জন্য আমাদের চাপ দেয় না, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। যেমন, বাচ্চাকে টিকা দেওয়ানো, নিজের ওষুধ খাওয়া, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়। তীব্র অভাব সবচেয়ে ক্ষতি করে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোরই। যে কাজ করতে কোনও বাড়তি খরচের প্রয়োজন পড়ে না, সেগুলোও করা হয় না, ঠিক সময়ে মনে পড়ে না বলেই।

কর্মসংস্থান যোজনার প্রকৃত মাহাত্ম্য যদি খুঁজতেই হয়, তবে এখানে খোঁজা প্রয়োজন। প্রকল্পটি যে শুধু দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষের জন্য, তা-ই নয়, যতখানি কায়িক শ্রমের বিনিময়ে যেটুকু মজুরি পাওয়া যায়, নিতান্ত নাচার না হলে কেউ তাতে আগ্রহী হবেন না। অর্থাৎ, যাঁরা এই খাতায় নাম লেখাবেন, ধরেই নেওয়া যায়, তাঁরা সকলেই মরা গরিব। এই গরিব মানুষদের কাছে দিনে ১৭০ টাকার মাপ কতখানি বড়? ভারতের গ্রামাঞ্চলে এখন দিনে মাথাপিছু ৩২ টাকা আয় থাকলেই দারিদ্রসীমার ওপরে ঠাঁই হয়। অর্থাৎ, যাঁরা ‘নারেগা’-র খাতায় নাম লেখান, তাঁদের পরিবারে বছরের কোনও সময়েই দিনে ১৭০ টাকা রোজগার হয় না। ফলে, পরিবারের এক জন ‘নারেগা’-য় কাজ পেলে সেই বাড়তি রোজগারে সেই পরিবারের আর্থিক ছবি বদলে যেতে পারে। অভাবের তীব্রতা কমতে পারে অনেকখানি।

তাতে কমার কথা মানুষের ভাবার ক্ষমতার ওপর চাপও। গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলির কথা তাঁরা সম্ভবত আর ততখানি ভুলে যাচ্ছেন না। ‘নারেগা’-র এই দিকটির ওপর এখনও কোনও পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা হয়নি। কিন্তু সেন্ধিল মুলাইনাথনদের বিস্তৃত গবেষণার ফলের মধ্যে যদি সত্য থাকে, তবে ‘নারেগা’-র দৌলতে গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারগুলিতে শিশুদের টিকা দেওয়ার হার বেড়েছে। বেড়েছে সঞ্চয়ের প্রবণতা, নিজেদের ওষুধ খাওয়ার সম্ভাবনা। বাড়তি টাকা দিয়ে যতটুকু কেনা যায়, ‘নারেগা’-র প্রভাব তার চেয়ে অনেকখানি বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। সেটা শুধু বাড়তি টাকার কারণেই নয়, আয়ের নিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার কারণেও। ‘আজ জুটেছে, কাল কী হবে’-র অনিশ্চয়তার বাড়া দুশ্চিন্তা নেই। ‘নারেগা’ আংশিক ভাবে হলেও সেই চিন্তা দূর করে।

গোটা দুনিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতির মানচিত্রে ‘নারেগা’ বিশিষ্ট হতে পারত শুধু এই কারণেই। গরিব মানুষের জন্য টুকরোটাকরা ভাবনায় যে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব হয় না, তা এত দিনে প্রমাণিত। সম্প্রতি কৃষিবিমার প্রসঙ্গেও সেই তর্ক উঠে এসেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন ফসলের জন্য বিমার প্রিমিয়াম অনেকখানি মকুব করে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছিল, এখনই তো বহু রাজ্যে বহু ফসলের বিমা নিখরচায় করা যায়। তবুও মানুষ বিমা করান না কেন? সেন্ধিলদের তত্ত্বের প্রেক্ষিতে ভাবলে, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ। বিমা করানোর কাজটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জরুরি নয়। সেটা আগামী কালের জন্য ফেলে রাখা যায়— সেই আগামী কাল, যে দিন অন্য কোনও জরুরি প্রয়োজন দরজায় কড়া নাড়বে না। তেমন দিনও আসে না, বিমাও করানো হয় না। জরুরি প্রয়োজনগুলো সামলানোর মতো টাকার সংস্থান হলে হয়তো বিমা করানোর কথা অনেকেরই মনে পড়ত অনেক সহজে।

‘নারেগা’-র মতো প্রকল্প উন্নয়নের বিভিন্ন নীতির ফাঁক ভরাট করে দিতে পারে। সরকার শিশুদের জন্য নিখরচায় পড়ার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু ছেলেমেয়ে স্কুলে গেল কি না, সেটা ভাবার মতো অবকাশই যদি বাপ-মার না থাকে? যক্ষ্মার ওষুধ পাওয়া যায় নিখরচায়। কিন্তু, সারা দিনের মানসিক চাপে সেই ওষুধ খেতে ভুলে গেলে? ভুল যাতে না হয়, সেই মানসিক স্থিতিটুকু দিতে পারে নারেগা থেকে পাওয়া নিশ্চয়তা। একটা কর্মসংস্থান প্রকল্প কী ভাবে জুড়ে দিতে পারে অন্য উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোকে, ‘নারেগা’-র উদাহরণ নিয়ে গোটা দুনিয়ায় চর্চা হতে পারত। তার বদলে, রাজনৈতিক চাপান-উতোর আর ভোটের ফায়দা তোলার খেলাই সব হয়েছে।

যাঁরা এই প্রকল্পের ঘোর বিরোধী, তাঁরা বলবেন, গরিব মানুষকে যদি আয়ের নিশ্চয়তা দিতেই হয়, নির্ধারিত অঙ্কের টাকাটুকু প্রাপকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিলেই হয়। খেটে রোজগার করা টাকা, আর বিনা শ্রমে পাওয়া টাকার ব্যবহারে কতখানি ফারাক হতে পারে, অর্থনীতির দুনিয়ায় সে বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়েছে। পড়ে পাওয়া টাকা বাজে খরচের সম্ভাবনা অনেক বেশি। যদি ধরেও নেওয়া হয়, দু’গোত্রের টাকা থেকেই সমান ফল পাওয়া যাবে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। গরিব মানুষের সম্মানের প্রশ্ন। খেটে খাওয়ার সম্মানের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের কাছে হাত পেতে নেওয়া ভিক্ষা আর নিজের ঘাম ঝরিয়ে উপার্জনের মধ্যে ফারাক গরিবরাও বোঝেন। সচ্ছলদের তুলনায় বেশিই বোঝেন, কারণ তাঁদের জীবনে বিবিধ অপমানের ভার এমনিতেই বেশি।

কিন্তু, গরিবের আবার সম্মান! সেই সম্মানকে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়ার রাজনীতি ভারতে কোথায়? তা হলে অন্তত বামপন্থীরা ‘নারেগা’-র সপক্ষে মুখ খোলার সময় সেই প্রশ্নটা তুলতেন। বলতেন, স্বাধীনতার সাত দশক পেরিয়েও যাঁদের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারেনি রাষ্ট্র, তাঁদের জীবিকার সম্মান রক্ষা করতে মাটি খোঁড়া আর গর্ত বোজানোর জন্য টাকা খরচ করতে হলে হবে। সেটা রাষ্ট্রের কর্তব্য তো বটেই, প্রায়শ্চিত্তও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy