Advertisement
E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_04-05-26

‘যুদ্ধ’ নয়, সমবেত শৃঙ্খলা

উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কী করতে হবে গোছের নিদান নয়, শৃঙ্খলা এখন আসুক ভালবাসার অনুভূতি নিয়ে, এটাই আমাদের ভাবা দরকার।

অভিজিৎ চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২০ ২৩:৫৯

ভাইরাস সংক্রমণের গতি বাড়ল না কমল, এখন আমরা শুধু তারই হিসেব করছি, বোঝার চেষ্টা করছি আগামীর অঙ্ক। চিন্তার স্বচ্ছতা সমস্যা মুক্তির সঠিক পথের হদিশ দিতে সাহায্য করে। দেশের পরিচালকদের তো বটেই, প্রতিটি সাধারণ মানুষের মুক্ত মনে ভাবা দরকার, এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় আমরা কী কী করতে পারি।

প্রথমত, করোনার সঙ্গে মানুষের পাশা খেলাটা একটা দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্রম হতে যাচ্ছে। মাথা ঠাণ্ডা করে, সংযম, শৃঙ্খলা আর অনুশাসনের মধ্যে আমাদের থাকা প্রয়োজন। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কী করতে হবে গোছের নিদান নয়, শৃঙ্খলা এখন আসুক ভালবাসার অনুভূতি নিয়ে, এটাই আমাদের ভাবা দরকার। বুঝে নেওয়া দরকার যে, স্বাভাবিক সমাজজীবন বলতে আমরা যা বুঝি, তা এখন ফিরবে না। অবশ্যই ভবিষ্যতে তা ফিরবে আবার, কিন্তু কালকেই নয়। কত দিন নয়, তা কারওই জানা নেই, কারণ ভাইরাসের সঙ্গে যে লড়াই বিশ্ব জুড়ে চলছে তাতে এখনও মানুষের ভূমিকাটা অনেকটাই অন্ধের হস্তিদর্শনের মতো। সমাজমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো বিভীষিকার অঙ্কগুলো কিন্তু বিজ্ঞানীদের কসরত, দেশের পরিকল্পকদের প্রস্তুতিতে সাহায্য করার লক্ষ্যে তৈরি। সাধারণ মানুষ সেই গূঢ় তত্ত্বের হদিশ পাওয়ার ফলে সামগ্রিক ভাবে তার সহায়ক না হয়ে ভূতচতুর্দশীর চালচিত্র হয়ে আসছে। ও দিকে চোখ না-ই বা দিলাম।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ছেড়ে সামগ্রিক এই উদ্যোগটাকে বহু মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক ভালবাসার অনুশীলনে পরিণত করা দরকার। যুদ্ধের ভাষাও ভাব এখানে প্রয়োগ করতে গেলে সমাজের অকল্যাণই হবে বেশি। যেমনটা বস্তুত হয়েছে— করোনার সঙ্গে লড়তে গিয়ে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের দরিদ্র মানুষগুলোকে দিল্লির চৌহদ্দির বাইরে বার করার চেষ্টা করে যে অসামাজিক এবং অবৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কথা মনে করুন। এ ভাবেই শত্রু হয়ে ওঠে সেই মানুষরা, যাদের রক্ষা করা আমাদের দায় এবং দায়িত্ব। সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষ এই মুহূর্তে ভীষণ আতঙ্কে আছেন। হুঙ্কার দিয়ে মানুষকে গৃহবন্দি করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতন আখড়া বানিয়ে যে দুশ্চিন্তা এবং আশঙ্কার কালো মেঘ বিছিয়ে দিচ্ছি, তাতে সাধারণ মানুষ আরও আতঙ্কিত হতে পারেন, সরকার এবং সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্নতার বোধ তীব্রতর হতে পারে। এমনিতেই আমাদের সমাজের নানা বিভেদের আলোছায়া প্রতি মুহূর্তে আমাদের অস্তিত্বকে বিদ্রুপ করে— সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অসুরপনা এবং আমার জমিদারিতে অন্য কেউ যাতে ঢুকে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা আমাদের প্রায় প্রতিটা কাজের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। জনপদগুলিতে বিভাজন এই মুহূর্তে বিপজ্জনক হতে পারে। প্রতিটা মহল্লায় তৈরি করা দরকার সচেতন শৃঙ্খলার নজির— যুদ্ধপরাক্রমের প্রদর্শনী নয়।

তৃতীয়ত, ক্ষুধার বিরুদ্ধে আমাদের পরিকল্পনাকে এখনই আরও ঠাসবুনোট করা দরকার। মানুষগুলি বাঁচার পর এটাই হবে আসল যুদ্ধ। মূল্যস্ফীতি, কাজের অভাব কিংবা ছাঁটাই, বণ্টনের অসাম্যে জর্জরিত আমাদের সমাজকে তাড়না করছে এখনই। অবশ্যই এটা সারা বিশ্বের চিত্র, কিন্তু আমাদের বাড়িটা যেহেতু অন্যদের থেকে ঠুনকো, তাই মেরামতির প্রস্তুতিও আগেভাগেই করা চাই। এটা মনে রাখা দরকার যে, বুভুক্ষু মানুষ লকডাউনের গুরুত্ব না-ও বুঝতে পারেন।

চতুর্থত, এই লড়াই কারও একার কাজ হতে পারে না, সরকারকেই সবাইকে হেঁকেডেকে এ কাজে নামানো দরকার। প্রচলিত একটা ভাবনা আছে যে, উন্মুক্ত হৃদয় নিয়ে রাজনীতির খেলা চলে না— সফল রাজা নাকি বুদ্ধি দিয়ে চলেন, বুক দিয়ে নয়। আমাদের এটা মনে রাখা দরকার যে ক্রান্তিকালে রাজাকে সিংহাসন ছেড়ে রাজপথে এসে ভিক্ষুকও হতে হয়, গাইতে হয় সম্মিলনের জয়গান। সফল রাজা সবাইকে নিয়েই চলেন।

সংক্রমণ আর অসুস্থ মানুষকে চিহ্নিত করার কাজে প্রতিটা মানুষের যোগদান যেমন সুনিশ্চিত করা দরকার, ঠিক তেমনই মানুষের একসঙ্গে পথ চলা, কথা বলার মধ্যে দিয়ে আতঙ্ক কমতে পারে। ‘করোনা-আক্রান্ত’— এই ছাপ যেন এই মুহূর্তে এবং ভবিষ্যতে কখনও সমাজে বিচ্ছিন্নতার যুক্তি হয়ে না আসে। সংক্রমণ ধরা পড়লে কাউকে পাড়াছাড়া করার মতো ধ্বংসাত্মক উদ্যোগ করলে হিতে বিপরীত হবে, কারণ তা হলে মানুষ সমস্যা লুকিয়ে রাখতে আরও বেশি চেষ্টা করবেন। আমাদের দেশের বহু মানুষ ভবিষ্যতে সংক্রমিত হতে পারেন, যার মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ ভাল হয়ে উঠবেন। আতঙ্কের বদলে সতর্কতাভিত্তিক ধারণাকে মজবুত করতে পারলে এই কাজে সফল হওয়া যায়।

করোনার সঙ্গে লড়াইয়ের কোনও একটা প্রেসক্রিপশন নেই, এটা একটা বহু পরিচ্ছেদের উপন্যাস হতে যাচ্ছে। আমরা এখন তার প্রথম পরিচ্ছেদের গোড়ায়। পরের পাতাগুলো এখনও লেখা বাকি। উপন্যাসের চরিত্রও হবে পঞ্চগ্রামের প্রতিটি নাগরিক, কেউ একা নয়।

চিকিৎসক, লিভার ফাউন্ডেশন-এর সচিব

ইমেল-এ সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার জন্য প্রবন্ধ পাঠানোর ঠিকানা: editpage@abp.in
অনুগ্রহ করে সঙ্গে ফোন নম্বর জানাবেন।

Coronavirus Health
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy