E-Paper

এই পরিবর্তন ভয় জাগায়

এই চৈত্রদিনে রাম এবং হনুমানকে নিয়ে জঙ্গলমহল পুরো মেতে উঠেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলে রামনবমী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কেউ আগ্রহ দেখাতেন না।

বেবী সাউ

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪২
হনুমান পুজো বালুরঘাটের ভুশিলা গ্রামে।

হনুমান পুজো বালুরঘাটের ভুশিলা গ্রামে। ছবি অমিত মোহান্ত।

সমর্থনের আশায় আমি আর এক জন শিক্ষিকার দিকে ঘুরি। কিন্তু তিনিও সংশয় প্রকাশ করে নির্লিপ্ত ভাবে বলেন, “আসলে এ রকম আমিও কখনও শুনিনি! রামের মতো কেউ কখনও মাংস খেতে পারেন? যে যা পারছে বলে দিচ্ছে! রাজশেখর বসু না কী বললেন যেন? তিনিও যে কোথা থেকে কী তুলে এনে অনুবাদ করেছেন, তার কিছু মানে আছে? বাল্মীকির নামে হয়তো চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে যত্তসব আজগুবি ব্যাপার!”

এই চৈত্রদিনে রাম এবং হনুমানকে নিয়ে জঙ্গলমহল পুরো মেতে উঠেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলে রামনবমী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কেউ আগ্রহ দেখাতেন না। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিতও ছিলেন না তেমন। নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি নিয়ে আনন্দিত ছিলেন তাঁরা। আর এখন কলস স্থাপন, নবরাত্রি উদ্‌যাপন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে শাল-সেগুনের শান্ত অঞ্চলটি। রাস্তার ধারে ধারে গদা হাতে হনুমানের বিশাল বিশাল প্রতিকৃতি। মন্দির। বিশাল গেরুয়া ঝান্ডা উড়ছে পতপত করে। এখনকার এই জঙ্গলমহল এত অপরিচিত লাগে! এখানকার সংস্কৃতি অনেকটা পাল্টে গেছে, তাকে পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি নামের দলটি। রিল দেখে, রামায়ণ-মহাভারত না পড়ে হঠাৎ করে সবাই কেমন রাতারাতি তাদের মতের হিন্দু হয়ে উঠল।

আর রাম হয়ে উঠেছেন নিরামিষভোজী, ডাল-রুটি-দুধ-পনির-মটরভোজী, কিন্তু কট্টর যুদ্ধবাজ এক জন মানুষ। যিনি হিন্দুকে (জনজাতি, আদিবাসী জনসমাজ বাদ) বাঁচাতে চান। ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’, সুতরাং নবরাত্রি পালন এবং রামনবমীর দিন ঝান্ডা নিয়ে যুদ্ধসাজের মধ্য দিয়ে হিন্দুকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে, এমন এক ধারণা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে জঙ্গলমহলের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত।

স্কুলের স্টাফ রুমে এ-সব কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক আজকাল। আর এই রাম আর মনগড়া রামায়ণের কাছে অসহায় রাজশেখর বসু, বাল্মীকি-রচিত রামায়ণও প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখে। চমকে উঠতে হয়— যাঁরা কখনও রামায়ণ পড়েননি, তাঁরা কী তীক্ষ্ণ আক্রমণের ভাষা শিখে গেছেন! যুক্তি নেই, তর্ক নেই, ভাবনার জায়গা পর্যন্ত নেই সে-সব কথায়! রামায়ণ পড়তেই হবে এমন কাউকে মাথার দিব্যি দেওয়া উচিত নয় যদিও, তবু চড়া গলায় গেরুয়াধারীদের রচিত রাম ও হনুমানে তাঁরা কেমন বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।

যে জঙ্গলমহল বিয়ের আগে শালগাছের কাছে প্রার্থনা করত উর্বরতার, বৃষ্টির জন্য গ্রাম্যদেবতার কাছে মানত করত ‘লাড়ু’ প্রসাদ দেওয়ার, সন্তানের মঙ্গলকামনায় পূজিত হতেন মা শীতলা, সেখানে নবরাত্রি উদ্‌যাপন কখন যে অজানতে ঢুকে পড়েছে, এই ক’বছরে কেউ বুঝতেই পারেনি। জঙ্গলমহলের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে সুকৌশলে। কোনও জাতির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার অর্থটা স্পষ্ট: এর মধ্য দিয়ে জাতির অস্তিত্ব, ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও সামগ্রিক সভ্যতার মূলভিত্তিকেও কৌশলে উপড়ে ফেলা। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড-সহ অন্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোয় চরম দুর্যোগের ঘনঘটা দেখেও যদি সাবধান না হই, আর কী বলার থাকে! অসম, ত্রিপুরার উদাহরণ চোখের সামনে। প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাকে বাঁচানোর জন্য বিহার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এক দিন, বিজেপির ক্রমাগত শাসন ও প্রতাপ তার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে; খানিকটা শুধরানোর চেষ্টা করছেন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। কিন্তু এক বার যা হারিয়ে যায়, তাকে ফিরিয়ে আনা কি অতই সহজ?

আজকাল কালীর পরিবর্তে মঙ্গলবার পালন করা শুরু হয়েছে বজরংবলীর পুজো। টুসু-ভাদু-করম-ঝুমুর-কীর্তনের পরিবর্তেও কি শোনা যাবে হনুমান চালিসা! রাফায়েল লেমকিন যে সংস্কৃতি-হত্যার কথা ভেবে শিউরে উঠেছিলেন, তেমনটাই ঘটে যাচ্ছে জঙ্গলমহলের সামাজিক জীবনে। সাধারণ মানুষের মনে চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিজেপি-সংস্কৃতি: মাতৃরূপা শক্তি-পূজার পরিবর্তে শুরু হয়েছে নিরামিষ ভক্ষণ, হনুমান চালিসার প্রচার-প্রসার। নবরাত্রির ঘট পাতার আয়োজন-সহ কলস যাত্রা, দশমীর দিন তির-ধনুক-টাঙ্গি-তরোয়াল হাতে বিরাট পদযাত্রা। বাসন্তীপুজো হারিয়ে গেল কোথায়!

যে রামকে আমরা আজন্ম চিনে ও জেনে এসেছি ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ রূপে, তিনি হঠাৎ কী করে পাল্টে গিয়ে হয়ে উঠলেন এক আগ্রাসী দেবতা! বাল্মীকির প্রজাবৎসল রাম, কৃত্তিবাস আর তুলসীদাসের মানবিক রামও হারিয়ে গেলেন কোথায়! যে রাম পত্নীবিরহে হাউহাউ কাঁদেন, জাতপাত ভুলে গুহক চণ্ডালের সঙ্গে মিলিত হয়ে মৃগমাংস খান, গল্প করেন, যে রাম ভরদ্বাজের আশ্রমে সুরাপান করেন— সেই রাম কী ভাবে পাল্টে যান এমন, যেমনটা চান কেন্দ্রীয় শাসক ও তাঁদের দল? সে জন্যই একটা ভয়, আশঙ্কা আমাদের মনের গভীরে চারিয়ে যায় আরও— যে রাজনৈতিক দল মাত্র কয়েক বছরেই পাল্টে দিতে পারে নরচন্দ্রমা রামের মতো এক অতুল চরিত্রকেও, তারা ক্ষমতায় এলে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে কী-ই না করতে পারে অবলীলায়!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Ram Navami

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy