সম্প্রতি এ রাজ্যের শাসক দলের তরফে রাজ্যসভায় যে চার জন প্রার্থীকে মনোনীত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এক জন বাদে আর কেউই প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয়েছে সদ্য-অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশকর্তাকে প্রার্থী করায়। বিতর্কের মূলে আছে কর্মরত অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এ রাজ্যের এক চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির তথ্যপ্রমাণ লোপাট, এবং সেই দুর্নীতির তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে অসহযোগিতার অভিযোগ। আজও বিচারাধীন এই আর্থিক প্রতারণার ব্যাপ্তি ছিল সুদূরবিস্তৃত, রাজ্যের বহু দরিদ্র মানুষ সর্বস্বান্ত হন। নাম জড়ানোয় রাজ্যের শাসক দলের একাধিক জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীকে জেলেও যেতে হয়। সুতরাং এই মনোনয়ন ঘিরে বিরোধীদের কটাক্ষ প্রত্যাশিতই। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের তরফে একে ‘সারদার পুরস্কার’ দাগিয়ে দিতে সময় লাগেনি।
কোনটি কিসের পুরস্কার, কে জানে। একই রকম বিতর্ক হয় কলকাতা হাই কোর্টের এক বিচারপতিকে নিয়ে, যিনি তাঁর কার্যকাল শেষ হওয়ার আগে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে ওই বিরোধী দলেই যোগ দেন, দলীয় টিকিটে লোকসভা নির্বাচনে লড়েন। কর্মরত অবস্থায় তাঁর দেওয়া বিভিন্ন রায় নিয়ে তখন সঙ্গত কারণেই অনেক কাঁটাছেড়াও হয়।
এ-সব কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই প্রবণতা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই, এমনও নয়। ২০১৯-এর নভেম্বরে রামজন্মভূমি মামলায় শীর্ষ আদালতের যে বেঞ্চ রায় দেয়, তার এক বিচারপতি অবসর গ্রহণের ৪০ দিনের মাথায় অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। বেঞ্চের নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ আদালতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সে বছর নভেম্বরে অবসর গ্রহণের পর রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন। দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে; প্রশ্ন ওঠে ওই বেঞ্চের মসজিদস্থলের বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি রামলালার (হিন্দুপক্ষ) প্রাপ্য বলে রায় এবং সেখানে মন্দির নির্মাণের নির্দেশ নিয়েও।
এ-হেন ঘটনা যে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা স্পষ্ট হয় সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী এক প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে। গত বছর জুনে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ক এক আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বলেন, অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই যদি কোনও বিচারপতি সরকারি কাজে নিয়োগ গ্রহণ করেন বা নির্বাচনে লড়তে বেঞ্চ থেকে ইস্তফা দেন, সেটা উল্লেখযোগ্য নৈতিক উদ্বেগ তৈরি করে, এই বিষয়ে বৃহত্তর পরিসরে ভাবনা উস্কে দেয়।
শুধু বিচারপতি বা আমলারাই নন, কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যে অবসরের পরে অনেক সাধারণ কর্মীকেও চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি বা আবার নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি কাজে বহাল রাখা হয়। অবসরের পর এ ভাবে পুনর্নিযুক্তদের সংখ্যাটা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। তদুপরি সব সরকারি ক্ষেত্রে কর্মী-সঙ্কোচন ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী-নির্ভরতা বেড়ে চলেছে। ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারদের চাকরির সুযোগ ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকেছে। শিক্ষিত যুবসমাজের অবস্থার একটা আন্দাজ পাওয়া যায় সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষিত ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের দিকে তাকালে। ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ এবং ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বয়স, পশ্চিমবঙ্গের এমন প্রায় ৮৪ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী আগামী পাঁচ বছর মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাতা পাওয়ার জন্য ইতিমধ্যে নাম নথিভুক্ত করেছেন (ছবি)। জানা গেছে, এঁদের একটা বড় অংশ স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি পিএইচ ডি ডিগ্রিধারী।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরায় বেকারত্বের হার অনেক বেশি। সাড়ে দশ কোটি জনসংখ্যার এই রাজ্যে যদি এই বিপুল সংখ্যক ঘোষিত বেকার থাকেন, সারা দেশে তবে তাঁদের সংখ্যা কত, ভেবে আতঙ্ক জাগে। তবুও এই পরিস্থিতিতে রেল, প্রতিরক্ষা, ব্যাঙ্ক-সহ নানা কেন্দ্রীয় ও কেন্দ্র-অধিকৃত সংস্থা এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের পুনর্নিয়োগের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে চলেছে।
কর্মরত অবস্থায় প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্তদের পুনর্নিয়োগে যে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা নিহিত, তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে। অতীতে দেখা গেছে, পুনরায় সরকারি কাজে বা লাভজনক কোনও পদে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের সিংহভাগের বিরুদ্ধে কর্মরত অবস্থায় আইনের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে শাসকের প্রতি বেশি আনুগত্যের অভিযোগ উঠেছে। তবে শুধু পুনর্নিয়োগ বা মেয়াদ বৃদ্ধি নয়, পুরস্কারস্বরূপ কারও কারও ক্ষেত্রে আরও নানা সুবিধালাভের একাধিক নজির প্রকাশ্যে এসেছে।
উদাহরণ অগণিত। এ সব উদাহরণ কি ভবিষ্যতের আমলাদের জন্য শুভ-ইঙ্গিতবাহী? পরিস্থিতি যেমন, তাতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ প্রশাসনের অন্তর্জলি যাত্রার আশঙ্কা অমূলক নয়। রাজ্য তথা দেশের সার্বিক সুশাসন ও বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের স্বার্থে সরকারি কর্মী থেকে আমলা ও বিচারপতি, এক বার অবসর নেওয়ার পর এঁদের পুনর্নিয়োগ বা পুনর্বাসন বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)