Advertisement
E-Paper

ঘরেও নহে, পারেও নহে!

শেষযাত্রায় মুকুল কার রইলেন? তৃণমূলের? না কি বিজেপির? না কি কারওরই নয়? তিনি ঘরে রইলেন? না পারে? শেষবেলায় তাঁর কোনও নির্দিষ্ট উপাস্য দেবতা রইলেন কি?

অনিন্দ্য জানা

অনিন্দ্য জানা

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৬
The rise and fall of Mukul Roy: a close view

কোন্দলে নেই। কোন দলে আছি? ফাইল ছবি।

সোমবার কোকিলডাকা ভোরে টং করে মেসেজটা ঢুকল, ‘দাদা, কাকু (মুকুল রায়) মারা গিয়েছেন রাত ১.৩০ নাগাদ’।

যে যুবক মোবাইলে বার্তা পাঠিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সদ্যপ্রয়াত মুকুল রায়ের কোনও রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তিনি একদা মুকুলের ফাইফরমাশ খাটতেন মাত্র। সেই সূত্রেই আমার সঙ্গে আলাপ। দ্রুত ফোন করে জানলাম, বর্ধমান থেকে কলকাতার পথে রওনা দিয়েছেন। শেষ দেখাটা দেখতে।

ফোনটা রেখে মনে হল, শেষ দেখা? তা-ই কি? ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিই কি মুকুলের আসল মৃত্যুদিন? না কি তাঁর জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগেই? মুকুলকে শেষ দেখা কি তখনই হয়ে যায়নি যখন তাঁর মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছিল। মুকুল মানে তো ধুরন্ধর চাণক্য-মস্তিষ্ক। মুকুল মানে সেই মস্তিষ্কে নানা প্যাঁচ-পয়জার। বিবিধ কূটকৌশল। এমন মানুষের মস্তিষ্ক বেভুল হয়ে গেলে তো তাঁর অস্তিত্বই সঙ্কটাপন্ন। সে বাঁচা কি সত্যিই বেঁচে থাকা?

আসলে মুকুলের প্রয়াণ সেইদিনই হয়ে গিয়েছিল, যখন তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। টানা ৬০০ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শেষদিকে কোমাচ্ছন্ন অবস্থায় তাঁর ক্ষীণকায় এবং গুটিয়ে-যাওয়া শরীরটা বিছানায় কোনওমতে পড়েছিল। ধুকপুক করে বইতে থাকা প্রাণবায়ুটুকু ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর সেই কঙ্কালসার শরীর ছেড়ে গেল শুধু।

মুকুলের সঙ্গে আলাপ ১৯৯৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে। তখন আমি আনন্দবাজার পত্রিকার দিল্লি ব্যুরোয় কর্মরত। পেশাগত ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বামপন্থী দলের কভারেজের। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কাগজের সাংবাদিকেরই ছিল। যোগাযোগটা বেড়ে গেল কারণ, সঙ্কেত আসতে শুরু করল, মমতা কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল গড়তে চলেছেন। সেই সঙ্কেত যখন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে, তখনই রঙ্গমঞ্চে মুকুলের আবির্ভাব। সঙ্গে জুড়িদার বালু (জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক)। মমতার মুখে তখন বাঁধা লব্জ, ‘বালু-মুকুল, বালু-মুকুল’। হুবহু সেলিম-জাভেদ, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল, কল্যাণজি-আনন্দজি বা যতীন-ললিত জুটির মতো।

কালক্রমে অবশ্য সেই জুটির নামের ক্রমপর্যায় বদলে গিয়েছিল। প্রথমে ‘বালু-মুকুল’ থেকে ‘মুকুল-বালু’। তার পরে শুধুই ‘মুকুল’। কারণ, দু’জনের আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন। বালু বরাবর চেয়েছিলেন পরিষদীয় রাজনীতিতে এসে মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন। মুকুল তার থেকে সহস্র যোজন দূরে। তিনি কখনও ‘কিং’ হতে চাননি। ‘কিংমেকার’ হতে চেয়েছিলেন।

মুকুলের নাম শুনলেই বরাবর কল্পনায় একটা ছবি ভেসে আসত। তিনি একটা সোফায় বসে আছেন। মুখে মুচকি হাসি। হাতের দশ আঙুলে দশটা সুতো বাঁধা। সেই সুতোর অপরপ্রান্তে দশটা লোক পুতুলের মতো ঝুলছে। মুকুল একটা আঙুল তুলছেন, একটা লোক উঠছে। অন্য একটা আঙুল নামাচ্ছেন, একটা লোক পড়ছে। ওই ক্ষমতাটা মুকুল চিরকাল অনেক বেশি উপভোগ করেছেন। বিচক্ষণ মুকুল জানতেন, তিনি জননেতা নন। ভোট-টোট জেতা তাঁর দ্বারা হবে না। ২০০৬ সালে জগদ্দল বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। ফরওয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বি‌শ্বাসের কাছে হেরে যান। এবং আবার বুঝে যান, তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ পর্দার পিছনে। সংগঠনে। দলের রান্নাঘরে। রাজনীতির পরিভাষায় যাকে বলে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’। তফাত একটাই, এ ক্যাবিনেটে সদস্য মাত্র দু’জন। মমতা এবং তিনি।

তৃণমূল গঠনের সময় সেই রান্নাঘর ছিল নয়াদিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের উল্টোদিকে সাংসদদের থাকার এমএস ফ্ল্যাটের তিনতলায় মমতার ঘরে। সেই সূতিকাগৃহে অবাধ গতিবিধি ছিল মুকুলের। একদা সোমেন মিত্রের ‘একান্ত অনুগামী’ মুকুল বুঝতে ভুল করেননি যে, অদূর ভবিষ্যতে মমতাই পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী শক্তির রাশ হাতে রাখবেন। কালক্ষেপ না করে মুকুল শিবির বদল করে ঢুকে পড়েন ভবিষ্যতের নেত্রীর ঘনিষ্ঠতম বৃত্তে। সে কারণেই ইতিহাস সুব্রত বক্সীর মতো তাঁকেও মনে রাখবে মমতার নেতৃত্বে তৃণমূলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন দল গড়ে সিপিএমকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে দীর্ঘ এবং বন্ধুর রাজনৈতিক যাত্রা মমতা শুরু করেছিলেন, তাতে দলনেত্রীর রথের সারথি ছিলেন মুকুল। আশ্চর্য নয় যে, মমতা তাঁকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়োগ করেছিলেন। তৃণমূলের অঘোষিত ‘দু’নম্বর’ হওয়া তাঁর ভবিতব্যই ছিল।

তৃণমূলে মমতার পরেই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন মুকুল। সে অধিকার মমতাই তাঁকে দিয়েছিলেন। তখন দশটার মধ্যে অন্তত আটটা বিষয়েই মমতার নির্ভরশীলতা ছিল মুকুলের প্রতি। যে কোনও ঘটনা বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মমতা বলতেন, ‘‘মুকুল, দেখে নিয়ো।’’ অনুগত বশংবদের মতো মুকুল ঘাড় নাড়তেন। নিয়মিত তৃণমূল ভবনে যেতেন। মন দিয়ে সংগঠন করতেন। কখনও কোনও সংসদীয় বা পরিষদীয় পদ চেয়েছেন বলে শুনিনি। দূরদূরান্ত থেকে আগত সমস্ত কর্মীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। তাঁদের কথা বিশদে শুনতেন। অনেককে নামেও চিনতেন। সময়-অসময়ে ফোন করলে নিজেই ধরতেন। কোনওদিন এক ছটাকও বিরক্ত হতে দেখিনি। একদিন ছাড়া প্রকাশ্যে আবেগতাড়িতও হতে দেখিনি। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর মমতার চিলতে অফিসঘরে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদেই ফেলেছিলেন মুকুল। সেই অশ্রুর মধ্যে আনন্দের চেয়েও বেশি মিশে ছিল অবিশ্বাস। চোখের জল মুছতে মুছতে স্বগতোক্তি করছিলেন, ‘‘সিপিএম তা হলে সত্যিই গেল?’’

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের যে পর্ব থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে মমতার ক্রম-উত্থান, সেই পর্ব থেকেই মুকুল আরও বেশি উদ্ভাসিত। এবং সেই সময় থেকে তিনি দলের অন্দরে মমতার আস্থাভাজন তো বটেই, কার্যত মমতার একমাত্র মুখপাত্র। মুকুল বলছেন মানেই মমতা বলছেন।

মুকুলের প্রতি মমতার আস্থা যে কী পর্যায়ের ছিল, তার উদাহরণ নিজের চোখে দেখা। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। কয়েকমাস আগে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা। ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে তাঁর মা গায়ত্রীদেবী প্রয়াত হয়েছেন। খবর পেয়েই তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-নেত্রীরা কেওড়াতলা শ্মশানে ভিড় করেছেন। কিন্তু দলনেত্রী শ্মশানে যাননি। ভারাক্রান্ত মনে তিনি বাড়িতে। চারদিক দেখে কে জানে কেন, আমি শ্মশান থেকে সটান মুখ্যমন্ত্রীর টালির চালের বাড়িতে। দুপুরের মধ্যে দাহসংস্কার হয়ে গেল। মমতা তখন অনেকটা ধাতস্থ করেছেন নিজেকে। তাঁর মনে পড়েছে, বিকালে একটি সভায় যাবেন বলে তৃণমূলের এক নেতাকে কথা দিয়ে রেখেছেন। সেখানে যাবেন বলে তৈরি হতে যাবেন সবে, বাড়িতে মুকুলের প্রবেশ।

মমতা তাঁকে জানালেন, তিনি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুরে আসছেন। স্পষ্ট মনে আছে, হিতৈষীর সুরে মুকুল তাঁকে বললেন, ‘‘দিদি, মাসিমা আজ চলে গিয়েছেন। এখন তোমার গুরুদশা শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় তোমার বাড়ি থেকে বেরোনো উচিত নয়। ঠিক দেখায় না।’’ মমতা বললেন, তিনি কথা দিয়েছেন এবং তিনি যে কথা দেন, তা তিনি রাখেন। কিন্তু মুকুল তাঁর যুক্তি ছেড়ে নড়বেন না। খুবই সংযত, ধীর এবং অনুনয়ের গলায় তিনি কথাটা বলেই যেতে লাগলেন। আমি বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে শুনছি। শেষপর্যন্ত মমতা নিমরাজি হলেন। তৃণমূলের নেতাকে ফোন করে মুকুলের যুক্তির কথা জানালেন এবং বললেন, তিনি মোবাইলে ভাষণ দেবেন।

সঙ্গত কারণেই উল্টোদিক থেকে প্রভূত অনুরোধ এল। কিন্তু ততক্ষণে মুকুল নেত্রীকে তাঁর যুক্তি বুঝিয়ে ফেলেছেন। দুধের বদলে ঘোলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল সেই নেতাকে। যতদূর জানি, তিনি মুকুলকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারেননি। সোমবার সন্ধ্যায় যখন মুকুলের নশ্বর, রোগজর্জর এবং শীর্ণকায় শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল, তখনও নয়।

তখন থেকেই কি মুকুলের মধ্যে একটা বদল এসেছিল? তিনি কি মমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা শুরু করেছিলেন? সাধারণত অবামপন্থী দলে নিরন্তর ক্ষমতার বৃত্তে থাকার জন্য একটা রেষারেষি চলে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার জন্য প্রাণান্তকর ফিল্ডিং খাটা শুরু হয়। স্বাভাবিক। ক্ষমতাসীনের ক্ষমতা যখন বাড়তে বাড়তে উপচে পড়বে, তখন যে লোকটা সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবে, সে-ই তো বাড়তি ক্ষমতাটা আঁজলা ভরে নিয়ে নিতে পারবে এবং সুযোগ বুঝে যত্রতত্র প্রয়োগ করতে পারবে। যুগে-যুগে, কালে-কালে এই প্রথা চলে এসেছে। তৃণমূল তার ব্যতিক্রম হতে যাবে কোন দুঃখে! সেই প্রতিযোগিতায় মুকুল একটা সময়ে বাকি সকলকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন। দলের নিচুতলায় বার্তা চলে গিয়েছিল, মারলে মুকুলই মারবেন। রাখলেও মুকুলই রাখবেন।

তার জন্য তাঁকে পরিশ্রমও করতে হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু ‘অনুগামী রাজনীতি’ করতে অভ্যস্ত (মনে রাখুন, তাঁর রাজনীতি শুরু সোমেন-অনুগামী হিসাবে) মুকুলের তাতে সমস্যা হয়নি। এমনিতেই তিনি উচ্চকিত নন। ধীরগলায় কথা বলেন। অযথা উত্তেজিত হন না। ঈর্ষণীয় ধৈর্য। ঠোঁটে সর্বদা একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখেন। কোনও কথায় ‘না’ বলেন না। ‘অনুগামী’ হিসাবে এমন লোকের মার নেই। আমরা রসিকতা করে বলতাম, তৃণমূলে সবসময় একটা সাপ-সিঁড়ির লুডো খেলা চলে। কে যে কখন সিঁড়িতে উঠে ১০০-র কাছাকাছি পৌঁছে যাবে আবার পরের চালেই সাপের মুখে পড়ে সোঁ করে ১০-এ নেমে আসবে বোঝা দায়! কোনও নেতা বা নেত্রী প্রবল ঝাড়ে থাকলে তাঁর সম্পর্কে বলতাম, কালীঘাটের বাড়ির বাইরে লুডোর বোর্ড বগলদাবা করে ঘুরছেন। দান ফেলা তো দূরের কথা, লুডো পাতারই জায়গা পাচ্ছেন না! শুধু মুকুলের জন্য সেই লুডোয় অনন্ত সিঁড়ি পাতা ছিল।

সেই সিঁড়ি বেয়েই তৃণমূলের অন্দরে উল্কাসদৃশ তাঁর উত্থান। প্রায় সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায়, কারণ বিচক্ষণ এবং বুদ্ধিমান মুকুল সীমা লঙ্ঘন করতে যাননি। কিন্তু দলটা নিজের মতো করে চালাতেন। যেমন বিশ্বাস করতেন, দল একটাই থাকবে— তৃণমূল। ক্ষমতায় যেতে হলে সেই ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ তৈরি করতে হবে। কোনও বিরোধী রাখা চলবে না। অতএব, সমস্ত দলের ‘বিক্ষুব্ধ এবং বঞ্চিত’ লোকেদের জন্য তৃণমূলের দরজা হাট করে খুলে দাও। প্রাক্তন সিপিএম হলে তো কথাই নেই। আরও বেশি খাতির। মুকুলের লাইন ছিল একটাই, দলকে বাড়াও। আরও বাড়াও। রাজ্যে বাড়াও। রাজ্যের বাইরে বাড়াও। সর্বত্র হাত বাড়িয়ে খপাখপ লোক দখল করো।

আশ্চর্য নয় যে, দলের অন্দরে মুকুলের প্রচুর বিরোধী তৈরি হয়েছিল। এক তো তাঁর এই নিজস্ব স্টাইলে দল চালানো। ঘোষিত শত্রুদের জামাইআদর করে ডেকে আনা। দ্বিতীয়ত, মমতার অন্যান্য সহযোদ্ধার সামনে তিনি বার্লিনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মমতার ঘনিষ্ঠ নেতাদের কেউ আবডালে তাঁকে ডাকতেন ‘পাঁচিল’ বলে। কেউ ব্যঙ্গের সুরে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে শুধু ‘সর্বভারতীয়’ বলতেন! তবে সবই আড়ালে। সেই মুকুলের ১০ ফুটের মধ্যে দাঁড়িয়ে কারও সে সব লুল্লুভুল্লু করার সাহস ছিল না। কারণ, সেই মুকুল তখন সোনার কেল্লায় থাকেন। রতনের সঙ্গে হিরে-জহরত নিয়ে রান্নাবাটি খেলেন।

এমন লোকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যে কোনও সাংবাদিকেরই অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল। ততদিনে মুকুলকে ঘিরে আলোকবৃত্ত তৈরি হয়ে গিয়েছে। ক্ষমতার চিটেগুড়ের আশপাশে মাছি ভনভন করছে। তাঁকে একা পাওয়া মুশকিল!

তবু ঘটনাচক্রেই একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে গেল। সিঙ্গুর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, মমতা মেট্রো সিনেমার উল্টোদিকে ধর্মতলায় আমরণ অনশনে বসলেন। সারাদিন লোকে লোকারণ্য। আমিও যেতাম নিয়ম করে। তৃণমূলের বড়-মেজো-সেজো নেতাদের সঙ্গে একটু গাবগুবাগুব করে অফিসে এসে খবর লিখতাম। রাত ৯টার পরে অনশন মঞ্চের পর্দা পড়ে যেত। বাইরে ভিড়-টিড় ততক্ষণে সব পাতলা। রাত ১০টা নাগাদ চাঁদনি চকের কাছে আনন্দবাজার অফিস থেকে বেরিয়ে গুটগুট করে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম মঞ্চের সামনে। প্রথম দিন নেহাতই কৌতূহলে গিয়েছিলাম। দেখলাম, চারদিক শুনশান। পুলিশ ছাড়া জেগে আছেন শুধু মুকুল। একটা চেয়ারে বসে সামনে রাখা অন্য চেয়ারে পা তুলে লম্বা সিগারেট টানছেন। আমি যেতে ধীরেসুস্থে ধোঁয়া ছেড়ে, পা-টা নামিয়ে বললেন, ‘‘বোসো।’’

ধর্মতলায় ২৬ দিন টানা অনশন করেছিলেন মমতা। দৈনিক সেই ‘বসা’ চলেছিল অন্তত কুড়িটি রাত। আমি এবং মুকুল। জনতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মোক্ষম হলেও ধর্মতলার অনশন মঞ্চের আশপাশের এলাকাটা খুব স্বাস্থ্যকর ছিল না। পিছনে একটি গণ প্রস্রাবাগার। বাউন্ডুলে, ভিখিরি এবং রাতজাগা নেই-আঁকড়া লোকজনের ইতস্তত ঘোরাফেরা। আর চড়ুইপাখির সাইজের মশা! সারা রাত মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসে মশার কামড় খেতে খেতে (এবং চটাপট করে মশা মারতে মারতে) আমরা বিভিন্ন বিষয়ে হাবিজাবি আলোচনা করতাম। ভোরের আলো ফুটলে আমি বাস বা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরতাম। মুকুলের ডিউটি শুরু হত অনশন মঞ্চে।

আলোচনার বেশিটাই রাজনীতি। আর বেশ খানিকটা ক্রিকেট। মুকুল ক্রিকেটটা সত্যিই বুঝতেন। উটকো বা উগ্র ভক্ত নয়, সত্যিকারের বুঝদার। এক রাতে প্রবল অবাক হয়েছিলাম, যখন মুকুল রাজনীতিতে সাবধানতার কথা বলতে গিয়ে ক্রিকেট পাঠশালার একটি প্রবাদপ্রতিম বাক্য বলেছিলেন, ‘‘নেভার রান এ মিসফিল্ড!’’ অর্থাৎ, ফিল্ডার বল মিস্ করলে কখনও রান নিতে নেই। তালেগোলে রান আউট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

তবে ওই কুড়িটি রাতের ‘বিনিয়োগ’ বৃথা গিয়েছিল। মুকুল জীবনে একটি খবরও দেননি। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে খবর পেলাম, মমতার সঙ্গে গভীর রাতে আসন সমঝোতা নিয়ে বৈঠক করতে যাবেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। কালীঘাটের বাড়ির চত্বরে ইটের পাঁজার পাশে গিয়ে ঘাপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রণব আসার খানিক আগে ট্যাক্সি করে (মনে রাখুন, গাড়ি নয়। ভাড়া করা ট্যাক্সি। যাতে নিজের চালকও জানতে না-পারে) এলেন মুকুল। নেমেই আমার মুখোমুখি! কিন্তু মুখের একটি রেখাও বাঁকল না। বেবাক না-চিনতে পারার ভান করে ভাবুক রবীন্দ্রনাথের মতো পিছনে দু’হাত দিয়ে সটান আদিগঙ্গার দিকে রওনা দিলেন তিনি। ‘মুকুলদা-মুকুলদা’ আকুল ডাকও তিনি কানে নেননি! পরে জিজ্ঞাসা করায় শুধু হেসেছিলেন।

তবে ক্রিকেট নিয়ে মুকুলের সঙ্গে জোরালো আলোচনা জারি থেকেছে। আবেগতাড়িত হয়ে বিরাট কোহলিকে (কেন যে পদবিটা ‘কুহেলি’ উচ্চারণ করতেন কে জানে) আমার সামনেই মোবাইল থেকে ফোন করে ভারতের জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশের রেলমন্ত্রী। পরে মুকুলের আমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে ক্লাব হাউসের লোয়ার টিয়ারে (মনে রাখুন, আরামদায়ক বক্সে নয়, খোলা গ্যালারিতে, সাইট স্ক্রিনের ঠিক সোজাসুজি) ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ় টেস্ট দেখতে গিয়েও মনে হয়েছে, ধ্রুপদী ক্রিকেটের সূক্ষ্ম দিকগুলো তাঁর আয়ত্তে আছে। তবে ঘণ্টাদেড়েকের বেশি থাকতে পারেননি। কারণ, মমতার জরুরি ফোন এসেছে। তখন মুকুল মন্ত্রী না-হয়েও প্রশাসনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। মূলত পুলিশ-প্রশাসনে। এই গুরুদায়িত্ব নিয়ে কি আর ইডেনে নিরুপদ্রবে বসে টেস্ট ম্যাচ দেখা যায়? তবে তিনি যাওয়ায় আমি বেঁচেছিলাম! ওই দেড় ঘণ্টার মতো বিরক্তিকর এবং অস্বস্তিজনক সময় খেলা দেখতে গিয়ে জীবনে কখনও কাটেনি। গোটা ক্লাব হাউস জুড়ে হিল্লোল উঠেছে, মুকুল রায় এসেছেন! বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন মেধার, বিচিত্র ধান্দার, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের এবং বিবিধ পোশাক-পরিচ্ছদের লোক (নামান্তরে ফড়ে) ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা করতে চলে আসছে। ক্ষমতার গন্ধে গন্ধে যেমন জোটে।

কিন্তু কে না জানে, ক্রিকেটের মতোই জীবনও তার দাঁড়িপাল্লায় হরেদরে দু’দিক সমান রাখে। কাঁচরাপাড়ার মতো এক আধা মফস্‌সল শহর থেকে আসা মুকুল পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে সংসদের উচ্চকক্ষে পরপর মেয়াদে সদস্য থেকেছেন। দেশের জাহাজ পরিবহণ মন্ত্রী হয়েছেন (রসিকতা করে বলতাম, জাহাজের টিকিট কনফার্ম করতে পারবেন?)। তালেগোলে দেশের রেলমন্ত্রীও হয়ে গিয়েছিলেন। তালেগোলে, কারণ রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী ভাড়া বাড়ানোয় পত্রপাঠ তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করিয়ে সেই দফতরে মুকুলকে পাঠিয়েছিলেন মমতা। যদিও রেলমন্ত্রিত্ব নিয়ে মুকুল খুব আল্লাদিত বা পুলকিত ছিলেন বলে আমার মনে হয়নি। বরং একটু জড়সড় এবং আড়ষ্টই ছিলেন।

হওয়ারই কথা। মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর অধীনে তিনি রেলমন্ত্রী, যত বড়ই সংগঠক হোন, এটা মুকুলের হজমশক্তির অতীত। তিনি এমনিতেই অন্তরালের মানুষ। চিরকাল পিছন থেকে পরিচালনা করতেই বেশি পছন্দ করেছেন। যেমন, আবডাল থেকে ভোট করানো। তৃণমূলে সকলে জানতেন, নির্বাচন কমিশনটা মুকুলের মতো কেউ বোঝেন না। কমিশন তো বটেই, মুকুল জানতেন কী ভাবে ‘ভোট করাতে’ হয়। কমিশনের কোন কোন পর্যবেক্ষক রাজ্যে আসছেন, লখিন্দরের লৌহবাসরে কোথায় কোথায় ছিদ্র আছে এবং সেখান দিয়ে কোন কালনাগিনীকে প্রবেশ করালে সে দংশন করতে পারবে, সে সব কূট পরিকল্পনায় মুকুলের কোনও জুড়ি ছিল না। সমস্ত দলই এই ধরনের ফিকির তৈরি রাখে। কিন্তু কখনও সামনে না থেকেও মুকুল ছিলেন এই খেলার প্রায় ঘোষিত চ্যাম্পিয়ন। সেই প্রায়ান্ধকার উপত্যকা থেকে তাঁকে গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বের চড়া আলোর মধ্যে। প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ারই কথা। সে বিড়ম্বনায় অবশ্য তাঁকে বেশিদিন থাকতে হয়নি। মমতা ইউপিএ ছেড়ে চলে এসেছিলেন। মুকুলও রেলমন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন।

কিন্তু সে সমস্ত বাদ দিয়েও যদি শুধুমাত্র রাজনীতিক হিসাবে তাঁর সরণটা দেখা যায়, সেটাও বিস্মিত হওয়ার মতো বইকি! যেমন বিস্ময়কর তাঁর দ্রুত পতনের বিবরণী।

তৃণমূলে মুকুলের সুদিন শেষের শুরু ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে। সেই প্রথম লোকসভা ভোটে মনোনয়ন পেয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রার্থিতালিকা নিয়ে দলনেত্রীর সঙ্গে একান্ত আলোচনায় মুকুল জানিয়েছিলেন, অভিষেকের সামনে এখনও অনেক সময় আছে। একেবারে প্রথমেই লোকসভা ভোটের টিকিট দেওয়া কি ঠিক হবে?

সম্ভবত সেই প্রথম মুকুল তাঁর অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করে বসেছিলেন। তবে কিনা, এটাই পৃথিবীর নিয়ম। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে থাকতে আমরা ভুলে যাই, আসলে আমরা এক প্রতিফলিত গরিমায় মহিমান্বিত হচ্ছি। আলোর মধ্যে থাকতে থাকতে এক বিভ্রম তৈরি হয়, যা আমাদের ভাবতে শেখায় যে, আসলে আমিই আলো। মুকুল সম্ভবত নিজের অজান্তেই সেই মায়াজগতে ঢুকে পড়েছিলেন।

বলা বাহুল্য মুকুলের আপত্তি টেকেনি। ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ হন অভিষেক। সেই বছর অক্টোবরে তাঁকে দলের যুব সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দেন মমতা। যা আসলে ছিল মুকুলের প্রতি ‘বার্তা’। তৃণমূলে তাঁর লেখচিত্র পড়তে শুরু করে ক্রমশ। ২০১৫ সালে দল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন মুকুল। তাঁকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও সরিয়ে দেন মমতা। ততদিনে মুকুল সারদা মামলা থেকে বাঁচতে যোগাযোগ শুরু করেছেন বিজেপির শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে। এক ধরনের আতঙ্কগ্রস্ততাই গ্রাস করেছিল তাঁকে। ব্যক্তিগত আলোচনায় বহুবার বলতেন, যে কোনও ভাবে জেলে যাওয়া থেকে বাঁচতে চান! তাঁর শঙ্কিত এবং ঘোর উদ্বেগমাখা বাক্যটা এখনও মনে পড়ে, ‘‘আমার নাতনিকে যদি ইস্কুলে গিয়ে শুনতে হয়, তোমার দাদু তো জেল খাটছে!’’

জেলে যাওয়া থেকে বাঁচতে বিজেপিতে পাকাপাকি ভাবে যোগ দিতেও রাজি ছিলেন মুকুল। বলা ভাল, যে কোনও উপায়ে তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে মরিয়া ছিলেন। দরকার হলে নতুন দল গড়েও। কিন্তু যিনি তাঁকে কারান্তরীণ হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই অরুণ জেটলির পরামর্শেই মমতার সঙ্গে দূরত্বমোচন করেন মুকুল। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের কয়েকমাস আগে তাঁকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে বিশ্বাসের কাচে চিড় ধরে গিয়েছে। মমতা-মুকুল সমীকরণ আর কখনও আগের জায়গায় ফেরেনি।

শেষপর্যন্ত ২০১৭ সালে দিল্লি গিয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল। তাঁর হাতে রাজ্য বিজেপির সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মুকুলের যোগদানের পরে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গে আশাতীত ফল করেছিল, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। সেই সাফল্যের আলো যতদূর যায়, সেই গন্ডির বাইরেই ওত পেতে ছিল অন্ধকার।

লোকসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশের দিন দুপুরে স্রেফ কৌতূহলবশত এলগিন রোডের ফ্ল্যাটে মুকুলের তৎকালীন ‘ডেরা’য় গিয়েছিলাম। ভিড়ে ভিড়াক্কার। গোছা গোছা লোক। গাদা গাদা ক্যামেরা। বিদ্যুৎচমকের মতো ঝলসাচ্ছে ফ্ল্যাশগান। সোফায় মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন মুকুল। তাঁকে দেখতে দেখতেই আবার তাঁর ওই ছবিটা মাথায় ভেসে এল। দু’হাতের দশটা আঙুলে দশটা সুতোর আগায় দশটা লোক। তিনি তাদের নিয়ে নাড়ছেন-চাড়ছেন। ওঠাচ্ছেন-নামাচ্ছেন। সেদিনই খেতাবটা মনে এসেছিল— রায়সাহেব! পরবর্তীকালে অনেক শিরোনামে শব্দটা ব্যবহার করেছি।

খাতির করে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন মুকুল। অভ্যস্ত হাতে পেটে ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিলেন। তার পরে আবেগতাড়িত গলায় তাঁর যে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা বললেন, তা এখানে লেখা অন্যায় হবে। যা না-লিখলে অন্যায় হবে, বিজেপিতে গিয়েও মুকুল আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। লম্বা সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘‘মুসলিমদের বাদ দিয়ে কি ভোট হয় নাকি? ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৩০ নম্বর বাদ দিয়ে উত্তর লেখা যায়?’’ এবং যা লেখা অন্যায় হবে না, মনে হয়েছিল, আবার নিজেকে আলোকবর্তিকা ভাবতে শুরু করেছেন মুকুল। বুঝতে পারছেন না, বিজেপি আর তৃণমূলে মৌলিক ফারাক রয়েছে। এই আলো সরে যেতে সময় লাগবে না।

লাগেওনি। ততদিনে তাঁকে আর সরাসরি ফোনে পাওয়া যায় না। কোনও না কোনও ‘টেনিয়া’ ফোন ধরে। নাম জেনে অনুমতি নিয়ে ফোন চালান করে মুকুলের হাতে। কখনও কখনও বলে, ‘‘দাদা বিজি আছে। পরে ধরিয়ে দিচ্ছি।’’ সেই ‘পরে’ আর আসে না। মুকুলের চারদিকে তখন স্তাবকের ভিড়। তারা অবিরাম রাজা-উজির মারে। ভেবেছিলাম একবার বলব, স্তাবকেরা শুধু নিজের ভাল চায়। যার স্তাবকতা করে, তার ভাল চায় না। নেভার রান আ মিসফিল্ড! মিসফিল্ড হচ্ছে। রান নেবেন না। উইকেট চলে যাবে। কিন্তু মুকুল তখন সেসব শোনার পরিস্থিতিতে ছিলেন না। তিনি তখন স্বপ্নের পোলাও খাচ্ছেন। ঘি কম দেবেন কেন?

২০২১ সালের ভোটের আগেই মোহভঙ্গ হল মুকুলের। বিজেপিতে হতে চেয়েছিলেন পুতুলনাচের কারিগর। ভেবেছিলেন, তৃণমূলে যেমন একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করে এসেছেন, কলমের খোঁচায় যাকে খুশি প্রার্থিতালিকা থেকে ছেঁটে ফেলেছেন, একে তুলেছেন, ওকে ফেলেছেন, বিজেপিতেও তেমনই পারবেন। হয়নি। উল্টে তাঁকেই সাধারণ এক প্রার্থী করে পাঠিয়ে দেওয়া হল কৃষ্ণনগরে! সেই প্রথম মুকুল জনতার রায়ে ভোট জিতলেন। কিন্তু বিজেপির টিকিটে হারলেন তাঁর পুত্র শুভ্রাংশু।

এরপরে মুকুলের তৃণমূলে ফেরাটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা ছিল। ভোটের দেড়মাসের মধ্যেই সেটা ঘটে যায়। উত্তরীয় পরিয়ে তাঁকে তৃণমূলে শামিল করেন, আপনার স্মৃতি ঠিকই বলছে, অভিষেক। তার কয়েকমাসের মধ্যেই যাঁকে মমতা নিয়োগ করবেন মুকুলের পুরনো দায়িত্ব ‘সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক’-এর পদে।

ক্রিকেটের মতো জীবনও তার দাঁড়িপাল্লায় সমান-সমান বাটখারা চাপিয়ে রাখে।

বিধায়ক হয়ে কোনওদিন বিধানসভায় গিয়েছিলেন বলে মনে করতে পারছি না। হয়তো গিয়েছিলেন। হয়তো যাননি। কিন্তু এটা মনে আছে যে, বিধানসভায় গিয়ে একদিন মমতার সঙ্গে দেখা করেছিলেন শুভ্রাংশু। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সর্বসমক্ষে মুখ্যমন্ত্রীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সর্বত্র ছড়িয়ে গেল সেই ছবি, মমতার পায়ে নতজানু মুকুল-তনয়। পিতাকে প্রশ্ন করলাম, আইডিয়াটা আপনার তো? খবর না দেওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন তিনি। তবে সটান ‘না-না’ বলেননি। শুধু হেসেছিলেন। রাজনীতির বিভিন্ন ঢেউয়ে হাবুডুবু খেতে খেতে ওটুকু ‘উন্নতি’ হয়েছিল তাঁর। তৃণমূলে যোগ দিলেন। কিন্তু খাতায়কলমে বিজেপির বিধায়ক থাকলেন। মুকুলের শেষজীবনটা অনাথ অবস্থায় কাটল। তাঁর প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেমন শোকজ্ঞাপন করলেন, তেমনই আবেগতাড়িত বিবৃতি দিলেন মমতা। বিধানসভায় তৃণমূলের সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর মরদেহে মালা দিল বিজেপি পরিষদীয় দলও। শোক জানালেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভা ভবন থেকে তাঁর কাঁচরাপাড়ার বাড়ি হয়ে শ্মশান পর্যন্ত অন্তিমযাত্রায় হাঁটলেন অভিষেক। মুকুল-অভিষেকের সম্পর্কে বরাবর একটা শৈত্য থেকেছে। চিতার আগুনে তা বিলীন হল।

মোদী শোক জানালেন ‘প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী’ হিসাবে। শুভেন্দুর শোকবার্তায় মুকুলের পরিচয় থাকল ‘প্রবীণ রাজনীতিক’। মমতার শোকপ্রকাশে ‘সহযোদ্ধা’। অভিষেকের শোকবার্তায় ‘অধ্যায়ের অবসান’।

শেষযাত্রায় মুকুল কার রইলেন? তৃণমূলের? না কি বিজেপির? তিনি কি ‘ঘরে’ রইলেন? নাকি ‘পারে’? না কি কারওরই নয়? বিভিন্ন স্রোতে লাট খেতে খেতে যে আঘাটায় গিয়ে তাঁর নৌকা ভিড়ল, সেখানেই কি জলের তলার লতাগুল্মে জড়িয়ে গেল তাঁর রাজনীতির লগি? শেষবেলায় তাঁর কোনও নির্দিষ্ট উপাস্য দেবতা রইলেন কি?

কথায় বলে, শেষ ভাল যার, সব ভাল তার। মুকুলের কি এই দীনহীন মৃত্যু প্রাপ্য ছিল? কে জানে! তবে তাঁর এমন প্রস্থান অভাবনীয় ছিল।

না কি ভুল ভাবছি? রায়সাহেব কি এখনও সেই সোফায় বসে আছেন? দু’হাতের দশ আঙুলের সুতোয় বাঁধা গুচ্ছ শোকবার্তা। মোদী থেকে মমতা। অভিষেক থেকে শুভেন্দু। সেগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির ফাঁকে কি এখনও মুচকি হাসছেন তিনি?

Mukul Roy
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy