ছোট্ট ছেলেটির ধারণা ছিল, তার বাড়ি থেকে ডান দিকে কয়েক পা গেলে যে খাল, সেটাই পৃথিবীর শেষ সীমানা। সে খালের ও-পারে যে কিছু থাকতে পারে, এ-পারের মতোই ধুলো-কাদা, গাছগাছালি, ছোট ছেলেটির কাছে তা তখন ছিল অবিশ্বাস্য। অনেক পরে সে জেনেছিল, সেই খালটা এক লাফে পেরিয়ে যাওয়া যায়। মিশরের প্রত্যন্ত এক গ্রামে, স্বল্পবিত্ত এক পরিবারের অনেকগুলি ভাই-বোনের সে এক জন। টের পেত, তার প্রতি তার বাবা-মা যেন একটু বেশি সদয়, ভাই-বোনরা একটু সংযত। কিন্তু এই নরম মনোভাবের পাশাপাশি সে অনুভব করত বাবা-মায়ের অবহেলা। সে দেখত, তার ভাই-বোনদের এমন সব কাজ করতে দিচ্ছেন মা, যা তার জন্য নিষিদ্ধ। এ নিয়ে ছোট ছেলেটির আক্ষেপ ক্রমে পরিণত হল এক গভীর, গোপন দুঃখে, যখন সে তার ভাই-বোনদের এমন অনেক কিছু বর্ণনা করতে শুনত, যার কিছুই সে জানত না। ক্রমে সেই বালক বুঝতে পারল, তার ভাই-বোনরা দেখতে পায়, সে পায় না।
এ ভাবেই তাঁর জীবনকথা শুরু করেছেন তাহা হুসেন (১৮৮৯-১৯৭৩)। এক দৃষ্টিহীন মানুষ যিনি নিজের দেশকে নতুন দৃষ্টিতে ইতিহাস, সাহিত্য, শিক্ষাকে দেখতে শিখিয়েছিলেন। আরবি ভাষার পণ্ডিতরা মনে করেন, সে ভাষায় আধুনিক রীতিতে লেখা প্রথম আত্মজীবনী তাহা হুসেনের আল-আইয়াম (দিনগুলি), যা ধারাবাহিক হিসেবে পত্রিকায় ছাপা শুরু হয় একশো বছর আগে— ১৯২৬ সালে। আরবিতে জীবনী লেখার ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন, কিন্তু পাশ্চাত্য রীতিতে লেখা জীবনীতে যে ঘনিষ্ঠ কথনভঙ্গি, মনোজগতের উন্মোচন, সাহিত্যের প্রসাদগুণ পাওয়া যায়, আরবিতে তা প্রথম পাওয়া গেল তাহা হুসেনের আত্মজীবনীতে। প্রথম দু’টি খণ্ড বই হয়ে বেরোতে (১৯২৯) ঘরে ঘরে ঠাঁই পেল, ঢুকল স্কুলের পাঠক্রমেও। এ যে চিরকালের স্বপ্নকথা— কেবল মেধা আর পরিশ্রমের জোরে এক দরিদ্র বালকের বিখ্যাত পণ্ডিত, প্রভাবশালী নাগরিক হয়ে ওঠার কাহিনি। এর ইংরেজি অনুবাদ (অ্যান ইজিপশিয়ান চাইল্ডহুড, ১৯৩২) তেমনই চাঞ্চল্য ফেলেছিল ইউরোপ-আমেরিকায়। বিশ্বের কাছে তাহা হুসেন হয়ে ওঠেন আধুনিক আরবের কণ্ঠ। তৃতীয় এবং শেষ খণ্ডটি (ইউরোপে তাঁর ছাত্রজীবন নিয়ে) তাহা লেখেন দীর্ঘ ব্যবধানের পরে, যখন তাঁর বয়স চুরাশি বছর। লেখেন ছেলের উদ্দেশে, যে তখন দেশ ছেড়ে চলেছে প্যারিসে— “যখন ল্যাটিন আর গ্রিক পড়তে পড়তে তুমি ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন হয়তো এই বই একটু আরাম দেবে।” তিন খণ্ড একত্রে দ্য ডেজ় নামে প্রকাশ করে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো প্রেস (১৯৯৭)। আক্ষেপ, বইটির ভারতীয় সংস্করণ নেই, ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ হয়নি।
আজ বইটি হাতে নিলে একই সঙ্গে অপরিচিত সমাজ-সংস্কৃতির ঘ্রাণ-স্পর্শ যেমন পাওয়া যায়, তেমনই ছোঁয়া যায় নিজের শৈশব-কৈশোরকে। গ্রামের বাড়ির আঙিনায় রোজ রাতে বড়দের বৈঠকি আড্ডা, কিংবা কায়রোর অলিগলি, যেখানে কাবাবের গন্ধ আর গুড়গুড়ির শব্দ দিয়ে এক বালক বুঝত, সে চৌমাথায় পৌঁছে গিয়েছে। আবার, কে না নিজের মধ্যে খুঁজে পায় সেই ছেলেকে, যে সর্দার পড়ুয়াকে নিজের টিফিন ঘুষ দিয়ে ক্লাস ফাঁকি দেয়? গ্রাম ছেড়ে বড় শহরে পড়তে গিয়ে যে নিজেকে খুঁজে পেতে কাটিয়ে ফেলে অনেক দিন, বিদ্রুপের ভয়ে কাউকে জানতে দেয় না নিজের ভয়, খিদে, একাকিত্বের কষ্ট। বিভূতিভূষণের অপু কলকাতায় এসে বুঝেছিল, সে দরিদ্র। কায়রোতে এসে যেমন বুঝেছিলেন তেরো বছরের তাহা। ক্রমে বন্ধু তৈরি হয়। পড়ার প্রবল চাপের মধ্যে একটু হাসি-ঠাট্টার বাতাস বয় যখন বন্ধুরা শিক্ষকদের মুদ্রাদোষ নকল করে আমোদ করে। এ সব আল-আজ়ারের গল্প, আবার লন্ডনের পাবলিক স্কুল থেকে কলকাতার স্কুল-হস্টেলেরও গল্প। সব কথার নীচে চোরাস্রোতের মতো বয় দৃষ্টিহীনতা, আর তার জন্য পরনির্ভরতার বেদনা। কানে শুনে বই রপ্ত করতেন তাহা।
কেন মাত্র ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছর বয়সে নিজের শৈশবের কথা লিখতে গেলেন তাহা হুসেন? স্মৃতি-সুখ লেহন করতে নয়, বিরোধিতার তীব্র কশাঘাত সহ্য করতে। ১৯২৬ সালেই বেরিয়েছে তাঁর প্রথম বই, ইসলাম-পূর্ব সময়ের আরবি কবিতা নিয়ে। তাঁর দাবিটি ছিল চমকপ্রদ— প্রাক্-ইসলামিক কবিতা বলে যা দাবি করা হয়, তার অধিকাংশই আদতে পরবর্তী সময়ে মুসলিম লেখকদের কীর্তি। প্রাচীনত্বের দাবির পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক স্বার্থ। তত দিনে ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হয়েছেন তাহা হুসেন। সাহিত্য বিশ্লেষণের পাশ্চাত্য রীতি রপ্ত করেছেন। তাকেই তিনি প্রয়োগ করেছেন আরব সাহিত্যের ব্যাখ্যায়। তাতে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। ক্ষুব্ধ প্রশ্ন ওঠে— তবে কি কোরানে বর্ণিত কোনও কোনও কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাহা? ধর্মবিরোধী কথার জন্য মামলা হল, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দিল, বইটাও নিষিদ্ধ হল। বিতর্কিত অংশগুলিকে সরিয়ে পরের বছর ফের প্রকাশিত হয় বইটি। সেই আক্রমণের মুখে, হয়তো সান্ত্বনার জন্য, শৈশবের কথা লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন তাহা।
তাহা হুসেন ছিলেন মিশরে রেনেসাঁসের এক প্রধান পুরুষ। উনিশ শতকের নবজাগরণের পুরোধা মানব-মানবীদের জীবনী, তাঁদের লেখালিখি পড়তে পড়তে আমাদের মধ্যে যে শ্রদ্ধা-মিশ্রিত বিস্ময় জেগে ওঠে, তেমন অনুভূতি হয় তাহা হুসেনের জীবন পড়লেও। তেমনই বিপুল পড়াশোনা, অক্লান্ত পরিশ্রমক্ষমতা, সত্যনিষ্ঠা আর সাহস। তাহা-র জীবনীর প্রায় ৮০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে পড়াশোনার কথা— তিনি কী বই পড়ছেন, শিক্ষকদের থেকে কী শুনছেন, তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে কী কথা হচ্ছে, তার বিবরণ। যে সব বই আমাদের অপরিচিত। কিন্তু দেখা যায়, ঠিক যেমন অনন্ত নরকবাসের ভয় দেখিয়ে অসার, অমানবিক আচার-আচরণ করার দাবি বাংলার নবীন প্রজন্মকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল, তারা ঝুঁকেছিল যুক্তিনিষ্ঠ, মানবিক চিন্তার দিকে, তেমনই ঘটেছিল মিশরেও। আল-আজ়ার এক সুবিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়, দশম শতাব্দীর শেষে তার প্রতিষ্ঠার পরবর্তী কয়েক শতক তা ছিল বিশ্বের জ্ঞানচর্চার এক প্রধান কেন্দ্র। ক্রমে সংরক্ষণশীলতা গ্রাস করেছিল প্রতিষ্ঠানটিকে। পরিণত বয়সে তাহা লিখছেন, আল-আজ়ারে তাঁর চার বছর যেন ছিল চল্লিশ বছর। বিরামহীন পুনরাবৃত্তি তাঁর হৃদয়ের তন্ত্রীতে ঘা দিত না। প্রশ্ন করলে শিক্ষকরা কেউ জুতো ছুড়ে মারতেন, কেউ বলতেন, “কেয়ামতের দিন আল্লা ঠিক করবেন, তুমি ঠিক না আমি ঠিক।” ক্ষুব্ধ, বিরক্ত তাহা সকালে আল-আজ়ারে ক্লাস করে বিকেলে যেতেন নবগঠিত ইজিপশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। ব্যাকরণ আর তর্কশাস্ত্রের ফাঁস থেকে বেরিয়ে সেই প্রথম তিনি পড়লেন ইতিহাস, সাহিত্য। তার পর ফ্রান্সে যাত্রা, সেখানে দ্বিতীয় ডক্টরেট পেলেন, পেলেন জীবনসঙ্গিনীকে। আত্মজীবনীতে যাঁকে উল্লেখ করেছেন কেবল ‘মধুর কণ্ঠ’ বলে। সুজ়েন ছিলেন ক্যাথলিক, বিয়ের পরেও ধর্মান্তরিত হননি।
তাহা হুসেন।
হলিউডের হিরোর মতো সুপুরুষ এই মানুষটি আজও মিশরের ‘হার্ট থ্রব’। অজস্র লিখেছেন, শিক্ষকতা করেছেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদপত্র সম্পাদনা করেছেন, দু’বছর শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। প্রাণের ঝুঁকি, পরীক্ষায় ফেল করা বা কাজ খোয়ানোর সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনও দিন আপস করেননি। আগাগোড়া লড়াই করে গিয়েছেন বিদ্বিষ্ট, সঙ্কীর্ণমনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে। গড়তে চেয়েছেন এমন মিশর, যা কেবল প্রথার পালন না-করে নির্মাণ করবে এক বহুমাত্রিক পরিচয় — প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, আরব সংস্কৃতি, ইউরোপীয় প্রভাবের গুণগুলি সমন্বিত করে নিয়ে। মিশর আর ফ্রান্স, দু’দেশই আজও তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সামনে আনছে। তাহা হুসেন— প্রশ্নহীনতাকে যিনি সতত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)