‘ঐতিহ্য, না অধিকার’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে (১০-১০) যথার্থই লেখা হয়েছে, ‘‘বিচারবিভাগ এবং প্রশাসন তাহাদের বঞ্চনার অবসান ঘটাইতে চাহিলেও মহিলারা এই ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যকেই আঁকড়াইয়া ধরিতে চান।’’ শুধুমাত্র শবরীমালা মন্দিরেই নয়, দেশের নানা প্রান্তে আরও নানা বিখ্যাত মন্দিরেই ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশ না করার রীতি সর্বোচ্চ আদালতের ভাষায় ‘অস্পৃশ্যতা’ বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এ বাবদ একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করব।

গত বছরের অক্টোবরে রাজস্থান ভ্রমণে গিয়েছিলাম সপরিবারে। দিল্লি বা ইউপি ভ্রমণে গিয়ে তাজমহল না দেখে ফিরে এলে যে ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায়, রাজস্থান ভ্রমণে গিয়ে প্রাচীন দিলওয়াড়া জৈন মন্দিরটি না দেখলেও ঘটবে ঠিক তেমনটাই। বস্তুত মার্বল পাথরে খোদিত সূক্ষ্ম কারুকার্যময় এই স্থাপত্যটির স্থান তাজমহলের ঠিক পরেই, এমনটাই দাবি করেন শিল্পরসিকেরা। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এই মন্দিরকে ভারতের সুন্দরতম স্থাপত্যগুলির অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটি আসলে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন সময়ে নির্মিত পাঁচটি পৃথক মন্দিরের সমাহার। পাঁচটি মন্দিরের নামকরণ এই রকম— ভীমল ভাসি, লুন ভাসি, শ্রীঋষভ দেউজি, শ্রীপার্শ্বনাথজি ও মহাবীর স্বামীজি। সর্বপ্রথম ১০৩১ খ্রিস্টাব্দে গুজরাতের সোলাঙ্কি রাজার মন্ত্রী ভীমল শাহ প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথজির নামে ভীমল ভাসি মন্দিরটি স্থাপন করেন। খরচ হয় ১৮ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। ১৫০০ ভাস্কর এবং ১২০০ শ্রমিক টানা ১৪ বছরের শ্রমে অনন্য ওই স্থাপত্যটি সম্পন্ন করেন। বাকি চারটি মন্দিরও একই ভাবে প্রচুর অর্থ ও শ্রমের বিনিময়ে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়।

স্বাভাবিক ভাবেই এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মন্দির দেখার জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল চরমে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে এক দিন দুপুর নাগাদ সেখানে পৌঁছলাম। আমাদের সঙ্গে ছিল আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন অনাত্মীয়া এক আপন জন। ভ্রমণপিপাসু সেই তরুণী নিজেও দিলওয়াড়া সম্পর্কে পড়াশোনা করে গিয়েছিল। ফলে সারা রাস্তায় তাকেও বেশ উত্তেজিত ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিন্তু মূল প্রবেশপথে পৌঁছে একটি নোটিস বোর্ডে তার চোখ আটকে গেল (ছবিতে দেখুন)। তার চোখেমুখে নেমে এল অকাল মেঘ! মনমরা হয়ে সে বলল, ‘‘আপনারা যান, আমি এখানে বসে থাকছি।’’ এত ক্ষণ আমরা কেউ তাকে দেখে কিচ্ছুটি না বুঝলেও এ বার বুঝলাম সে ‘অশুচি’ হয়েছে! কন্যাসম সেই মেয়েটি কেবল উচ্চশিক্ষিতাই নয়, একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকাও। ঘটনাচক্রে তার জায়গায় আমার স্ত্রী বা আমাদের সঙ্গী হবু বৌমা ‘অশুচি’ হলেও একই রকমের বিড়ম্বনা ঘটত।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে আমাদের দেশের মেয়েরা এখনও পুরুষতন্ত্রের নিগড়ে নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দি করে রেখেছেন। হাজার বছর ধরে অদ্ভুত এই অশুচিতার বোধ তাঁরা বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্ত্রী-আচারের নামে স্বেচ্ছায় লালন করছেন নানা রকম লিঙ্গবৈষম্যের অনাচার। সুতরাং সুপ্রিম-রায়ে প্রাপ্ত শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশাধিকার কত জন ভারতীয় নারী গ্রহণ করতে প্রস্তুত সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে! কেরলবাসীর অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন আরও, বহু বছরের ‘বামপন্থী’ শাসনে সমাজমানসে কী পরিবর্তন ঘটল?

চন্দ্র প্রকাশ সরকার

বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

কিছু অসঙ্গতি

উত্তর দিনাজপুরের দাড়িভিট হাইস্কুলে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে দুই তরুণের অকাল প্রয়াণে আমরা বেদনার্ত। লজ্জিত, পঠনপাঠনের মতো একটি জরুরি চাহিদার পরিণতি হল এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনায়; শঙ্কিত মৃত্যুপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে। শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি নয়, শিক্ষায় দরকার রাজনীতিকদের দৃষ্টির স্বচ্ছতা, মনন ও চিন্তনের উদারতা যা হবে আরও আলোর অভিসারী। পরিকাঠামোর চাকচিক্য, উপকরণের প্রাচুর্য, পাঠসহায়ক বৃত্তির ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি নানাবিধ আয়োজনে আমরা ছাড়িয়ে গিয়েছি অতীতের রেকর্ড, কিন্তু তবুও কত রকমের অসঙ্গতি এগিয়ে যাওয়ার পথের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমন, গত সাত বছরে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি আইনি জটিলতায়; অধিকন্তু বদলি প্রক্রিয়ায় গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলি থেকে প্রচুর শিক্ষকের চলে যাওয়াতে পঠনপাঠনের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, যা ছাত্র, অভিভাবকদের হতাশা ও অসন্তোষ বৃদ্ধি করছে। সুযোগসন্ধানীরা এই অসন্তোষকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। আমরা মনে করি নিয়োগ নিয়ে আইনি জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতায়, যা সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়েছে। এ বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। 

দুই, শিক্ষা বিভাগের নির্দেশিকাগুলির অসম্পূর্ণতা প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করছে। ২০১৭ সালে শিক্ষা দফতর মাধ্যমিক স্তরে স্নাতক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পি জি শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই বিষয়ে সেই সময়ে কোনও  জি ও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) প্রকাশ করা হয়নি। অথচ চালু থাকা ৬৭০ এসইএস তাং ৪-৯-৯৮ যেখানে ভাষা বিভাগে ৫০ শতাংশ, অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিভাগে ৬৬ শতাংশ সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ৫০ শতাংশ অনার্স/এমএ শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশ আছে তা বাতিল করা হল না। ওই নির্দেশিকা মতে স্কুলগুলিকে অনার্স/পি জি শিক্ষক নিয়োগের বহু পি পি (প্রাক অনুমোদন) দেওয়া হয়েছে এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনেও সেগুলি পাঠানো হয়েছে। ওই সব পি পি স্কুল থেকে ফেরত নিয়ে সংশোধন করা হল। সার্ভিস কমিশন থেকে ফেরত আসা পি পি সংশোধিত হল। এই প্রক্রিয়ায় ডিআই অফিস ও কমিশন অফিসের মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের অভাবই বর্তমান নিয়োগ জটিলতার একটি অন্যতম কারণ। 

তিন, দাড়িভিট হাইস্কুলের গোলমাল প্রসঙ্গে সহ-শিক্ষক পদ কনভার্শন প্রশ্নটি উঠেছে। বিদ্যালয় শিক্ষাদফতরের নির্দেশনামা ৮৬৫ এসই (মাধ্যমিক) তাং ৬-১২-৯৪ অনুযায়ী ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষক ঘাটতি পূরণের জন্য মাধ্যমিক বিভাগের অনার্স/পি জি শিক্ষকদের উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয় শিক্ষক-সংখ্যা সমান রেখে, পঠনপাঠনের স্বার্থে। এটি এখনও বাতিল করা হয়নি। তবে দিনাজপুরের ডিআই-এর অতি সক্রিয়তা ও আইনি প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি রহস্যাবৃত।

চার, চাপমুক্ত প্রশাসন কাজের গতি, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ায়। আমাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনে আসীন যোগ্য ব্যক্তিরা নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করবেন, সরকারি সদিচ্ছা অনুসারে।

পাঁচ, গঠনশীল সমালোচনা শিক্ষাভাবনাকে ঋদ্ধ করে, পরিকল্পনা রূপায়ণের সহায়ক। সংগঠনগুলির অভিজ্ঞতা, পরামর্শ শিক্ষাভাবনার সঠিক রূপায়ণে জরুরি। বিশ্বাস রাখি, অতীতের ধারাকে বজায় রেখে বিভিন্ন বিষয়ে স্বীকৃত জাতীয়তাবাদী 

শিক্ষক সংগঠনগুলি উন্নয়নের সঙ্গী হয়ে উঠবে। 

দাড়িভিট হাইস্কুলের ঘটনা একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতার ইঙ্গিতবাহী— তা হল স্কুল পরিচালনার মধ্যে ছাত্রদের অবাঞ্ছিত সংযুক্তি। এটি কোনও মতেই কাম্য নয়। শিক্ষক নিয়োগের মতো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যুক্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি বিভাগ, ছাত্রছাত্রীরা নয়। উন্নত পঠনপাঠনের চাহিদাও সঙ্গত। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের পথের সঙ্গী হতে পারে অভিভাবক ও আমাদের মতো বড়রা।

শ্রীদামচন্দ্র জানা

রাজ্য সাধারণ সম্পাদক প. ব. প্রধানশিক্ষক সমিতি

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

ভ্রম সংশোধন

 ‘রাফার সেরা লেভার ও ফেডেরার’ (খেলা, পৃ ২০, ১০-১০) প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে প্রথম টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে রড লেভার একই মরসুমে চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন। আসলে এই নজির গড়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড বাজ, ১৯৩৮ সালে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।