সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘ইনিভিজিব‌ল এনিমি’র কাছে আমরা অসহায়!

এই লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের থেকে তাঁদের অবস্থার কথা, তাঁদের চারপাশের অবস্থার কথা জানতে চাইছি আমরা। সেই সূত্রেই নানান ধরনের সমস্যা পাঠকরা লিখে জানাচ্ছেন। পাঠাচ্ছেন অন্যান্য খবরাখবরও। সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন, এবং অবশ্যই আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা ম‌নোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি।

main
সুনসান লস অ্যাঞ্জেলসের রাস্তাঘাট। ছবি-লেখিকা।

লস অ্যাঞ্জেলস দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সর্বাধিক জনবহুল এবং আকর্ষণীয় শহর। শহরটি হলিউড, ডিজনিল্যান্ড এবং মনোরম সমুদ্রসৈকতের জন্য একটি বিখ্যাত পর্যটনস্থান। আমার স্বামী ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার এক জন রিসার্চার এবং সেই সূত্রে আমরা ২০১৯ থেকে লস অ্যাঞ্জেলসে থাকি। আমার জন্ম বাঁকুড়ায়। বিয়ের পর ২০১৫-য় আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসি। লস অ্যাঞ্জেলসে আসার আগে আমরা নিউ ইয়র্কে থাকতাম।

গত ১৩ মার্চ থেকে, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর করোনাভাইরাস-ঘটিত অতিমারির কারণে এই রাজ্যে সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষণার পরে লোকজন আতঙ্কিত হয়ে এখানকার সুপারমার্কেটগুলিতে ভিড় করেন। আমরা সাধারণত আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য আর্টেসিয়া নামে একটি ছোট্ট শহরে যাই। শহরটি আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ২০ মাইল দূরে। এই শহরটি প্রচুর ভারতীয় মার্কেট এবং রেস্তোরাঁর জন্য খুব বিখ্যাত। কোভিড -১৯ সংক্রমণের কারণে, গত ২০ মার্চ একটি ভারতীয় সুপারমার্কেটে বাজার করে বেরতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লেগে গেল। ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে বোধহয় খুব গভীর খাদ্যসঙ্কট আসতে চলেছে। এক জন ভদ্রলোককে দেখলাম প্রায় ৬০০ ডলারের বাজার করলেন। ভাগ্যক্রমে, তার পর যা অবশিষ্ট ছিল, সেটাতেই আমাকে বাজার সারতে হল। যদিও আমরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত করে রেখেছি, তা-ও এখন ইনস্ট্যাকার্ট দিয়ে কিছু জিনিসপত্র অনলাইনে অর্ডার করছি। তবে, ইনস্ট্যাকার্টের ডেলিভারি ডেট পেতে একটু সময় লাগছে।

সাধারণ সময়ে, লস অ্যাঞ্জেলস অসম্ভব যানজটের জন্য খুব বিখ্যাত। এখানকার সিক্স-লেন ফ্রি-ওয়েগুলো সব সময় গাড়িতে ভর্তি থাকে। তবে এই সঙ্কটের সময়ে, সেই সুপরিচিত ট্র্যাফিক প্রায় অস্তিত্বহীন। স্বপ্নেও ভাবিনি এই দিনও দেখতে হবে কোনও কালে! তবে যানবাহন কম চলার কারণে এখন এখানে দূষণ অনেক কমে গিয়েছে, যদিও মেনে নিচ্ছি, সেটা সাময়িকই।

ক্যালিফোর্নিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক জনবহুল রাজ্য। সেই কারণে গভর্নর এখানে অনেক আগেই লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। গত ১৯ এপ্রিল যখন আমি এই লেখাটা লিখছি, তখন এই রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার, যার মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার জন। মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬০০। আমরা প্রায় এক মাস হল গৃহবন্দি আছি। সব স্কুল, অফিস, শপিং মল বন্ধ রয়েছে। আমার স্বামী এখন ‘ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম’ করছেন। সুপারমার্কেট, গ্রসারি স্টোর, মেডিকেল স্টোর এবং হাসপাতালগুলির মতো কেবল প্রয়োজনীয় স্থানগুলি খোলা রয়েছে। যদিও সুপারমার্কেটগুলিতে একসঙ্গে ১০ জনের বেশি প্রবেশের অনুমতি নেই এবং ফেস-মাস্ক কম্পালসরি হয়ে গিয়েছে।

এটাই কি ‘সিটি নেভার স্লিপ্‌স’ নিউ ইয়র্ক সিটি? ছবি-লেখিকা।

রেস্তোঁরাগুলি কেবলমাত্র ‘ড্রাইভ-থ্রু’ ওপেন রেখেছে। তবে স্টেট গভর্নমেন্ট অনেক আগেই তৎপর হয়ে ‘শেল্টার-ইন-প্লেস’ ঘোষণা করায় জনবহুল ক্যালিফোর্নিয়া এখনও এপিসেন্টারে পরিণত হয়নি।

সরকারি স্ট্যাটিসটিক্স অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলসে এপ্রিলের শেষে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হবে। তার পর হয়তো তা নিম্নগামী হবে। এমনিতে গভর্নমেন্ট ১৫ মে অবধি লকডাউন ঘোষণা করেছে। ভাবতেও অবাক লাগে, এখানকার বিখ্যাত স্থানগুলি যেমন হলিউড ওয়াক-অফ-ফেম, ডিজনিল্যান্ড, ইউনিভার্সাল ষ্টুডিও, ভেনিস বিচ, মালিবু বিচ আজ জনমানবশূন্য হওয়ার জন্য লস অ্যাঞ্জেলসের পর্যটন-ব্যবসা বিপর্যস্ত।

ক্যালিফোর্নিয়া আসার আগে আমরা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বাসিন্দা ছিলাম। কয়েক বছর ওখানে থাকার জন্য নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন স্থান আমাদের খুবই পরিচিত। বছরখানেক আগেই, আমরা কুইন্স আর ব্রুকলিনের যে সব জায়গায় নিয়মিত বেড়াতে যেতাম, আজকে সেখানে করোনা-আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় চোখ পড়লে গা শিউরে ওঠে। স্বপ্নেও ভাবিনি, এক দিন এই জায়গাগুলো এক অতিমারির এপিসেন্টারে পরিণত হবে, যেখানে শ’য়ে শ’য়ে অসহায় মানুষ মারা যাবেন। নিউ ইয়র্ক সিটি এমনিতে ‘সিটি নেভার স্লিপ্‌স’ নামে পরিচিত। কিন্তু টাইমস স্কোয়ার, রোকেফেলার সেন্টার, ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ আজ একেবারেই নিঃস্তব্ধ।

আমাদের ভারতে জনসংখ্যার তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তবে, মানুষকে সামাজিক দূরত্বের জন্য সরকারি নির্দেশিকাগুলি অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায়, এই অতিমারির প্রভাব ভারতের মতো জনবহুল দেশে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। দুশ্চিন্তার কারণ, ভারতবর্ষে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কিন্তু মনে হয়, ভারত সরকার লকডাউনের সময়সীমা বাড়িয়ে ভালই করেছে। আশা করি, এর ফলাফল ভালই হবে।

আজ, এই গভীর সঙ্কটের মুহূর্তে মানুষকে যেন একটা ‘ইনভিজিবল এনিমি’-র কাছে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। আশা করি, বিজ্ঞান খুব শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে। জনমানবহীন উন্মুক্ত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে সেই বিখ্যাত – ‘এক দিন এই ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে...’

গার্গী চট্টোপাধ্যায়, লস অ্যাঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়া।

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন