E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বাঁচার আশাটুকু

একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে নিয়ে লেপ্টে বেঁচে থাকার সুখ দুঃখ ছিল আনন্দের উৎস। পয়লা জানুয়ারি দুপুরে পৌষের মিঠে রোদের ওম সহযোগে খিচুড়ি আর ডিমভাজা। কলাপাতায় সে খাবার ছিল অমৃত।

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৯

‘সীমান্তের এ পারে-ও পারে যেমন কাঁটাতার ভিন্ন কোনও বৈসাদৃশ্য থাকে না, একত্রিশে ডিসেম্বর আর পয়লা জানুয়ারির কাঁপুনিতে তফাত থাকে না কোনও’— সেবন্তী ঘোষের প্রবন্ধ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ (রবিবাসরীয়, ২৮-১২)-তে উল্লিখিত কথাগুলি ভাল লাগল। সত্যিই তো, মুহূর্তের এ-পার আর ও-পারে তফাত কিসের হয়? ৩১ ডিসেম্বর রাতে ঘড়ির কাঁটা দুটো বারোটার ঘর ছুঁলেই আতশবাজির আলোকছটা ঘটা করে জানিয়ে দেয় নতুনের আগমন বার্তা। এক মুহূর্তে বর্তমান হয়ে উঠবে অতীত। সেটাই তো স্বাভাবিক, এটাই সময়ের খেলা।

ভাল লাগল শৈশবের ফেলে আসা সে সব দিনের আলতো ছোঁয়া পেয়ে। সে সব দিনে ছিল না আতশবাজির জৌলুস। কিন্তু যা ছিল, সে সব আজও বড় নিজের। একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে নিয়ে লেপ্টে বেঁচে থাকার সুখ দুঃখ ছিল আনন্দের উৎস। পয়লা জানুয়ারি দুপুরে পৌষের মিঠে রোদের ওম সহযোগে খিচুড়ি আর ডিমভাজা। কলাপাতায় সে খাবার ছিল অমৃত। ছিল ঢেঁকিতে পালা করে চাল কোটা, কেকের আড়ম্বর নয়, বাটা চাল আর কোটা চালের আস্কে, সরুচাকলি, পাটিসাপ্টা, দুধ পুলি এ বাড়ি, ও বাড়ি পিঠে আদান প্রদান। শুধু পৌষ পার্বণে নয়, শীত সন্ধ্যায় প্রায়শই নতুন গুড়, নতুন চালের গন্ধ ভেসে বেড়াত গ্রামের বাতাসে।

তবু পরিবর্তন এসেছে গ্রাম্য দিনরাতেও। মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছে সে সব অনাবিল আনন্দ। বাচ্চাদের খেলার মাঠ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, বড়রাও অধিকাংশ সময় মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন। এক্কা দোক্কা খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মায়েদের হাতে উলের গোলা-কাঁটা, গরুর গাড়িতে ধানের বোঝা, মাটির রাস্তা— একটা একটা বছর পার হয় আর সবই একটু একটু করে বদলাতে থাকে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না যাঁরা এই শীতে পড়ে আছেন ফুটপাতে, তাঁদের উপর। তাঁদের দিন-রাত একই রয়ে গিয়েছে। ওঁদের থাকে না কোনও নববর্ষ, থাকে না কোনও নতুন আশা। কনকনে শীতে ফুটপাতে জেগে থাকা শিশুর দু’টি চোখ বর্ণাঢ্য আতশবাজির রঙের কোনও অর্থ খুঁজে পায় কি? অকালে চলে যাওয়া আর জি করের সেই চিকিৎসক মেয়েটির মতো আরও কত পরিবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আরও একটা বছর চলে গেল, মেয়েটা বিচার পেল না।

সময় বড় ক্ষণস্থায়ী। তবু কিছু ভুল শুধরে নিতে হবে, কিছু না-পাওয়া হয়তো আবার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে, হয়তো নারী হিংসা কমবে, হয়তো বিচার পাবে বৃদ্ধ পিতা-মাতার হারিয়ে যাওয়া কন্যাটি। হয়তো সবার মাথায় জুটবে একটু ছাদ। আশাই তো বেঁচে থাকার অক্সিজেন।

কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি

নিরাপত্তাহীন

রোহন ইসলামের ‘নিরাপদ থাকার নীরবতা’ (১-১) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। বর্তমান সময়ের শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষের মানসিক অবস্থার কথা তিনি যথাযথ ভাবে তুলে ধরেছেন। শিরোনামের মধ্যেই মূল বক্তব্যের আঁচ পাওয়া যায়। নিজের কাজের সূত্রে গ্রাম এবং শহরের মানুষের সংস্পর্শে এসে অনেক অভিজ্ঞতা থেকে এটাই উপলব্ধি করেছি। মেপে কথা বলা এবং পথ চলাই হল বর্তমান মানুষের নিরাপদে থাকার পন্থা।

যে কোনও প্রকার প্রতিবাদ এবং প্রশ্ন করলেই বাড়ে জীবনের ঝুঁকি। নিরাপদ জীবনযাপন করার জন্য মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা সমস্ত কিছুকে মানিয়ে নেওয়ার। প্রবন্ধের শেষের দিকে তিনি দ্বিধা প্রকাশ করলেও সব কিছুকে মানিয়ে নিয়ে সব সময় সুখ এবং শান্তিতে বাঁচা যায় না। ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে, আশা আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হয়।

সঞ্জিত কুমার মণ্ডল, বড়গাছিয়া, হাওড়া

নাগরিক কে?

শীত যখন জাঁকিয়ে নেমেছে তখন জমিয়ে এসআইআর-এর শুনানি শুরু হয়েছে এই বঙ্গে। শুনানিতে ছুটছেন কেউ চাষ ফেলে, কেউ বা অসুস্থ শরীরে, প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে। বয়সের ভারে ন্যুব্জদেরও রেহাই নেই। রেহাই নেই যাঁরা দিন আনেন দিন খান, দিনমজুরিতে সংসার চালান। প্রবল ঠান্ডায় অসুস্থ নবতিপর বৃদ্ধকে অ্যাম্বুল্যান্সে যেতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে, পক্ষাঘাতগ্রস্তকে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীকে টেনে আনতে হচ্ছে, ক্যাথিটার লাগানো অবস্থায় হাজির হতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। পরিযায়ী শ্রমিকরা বুঝতে পারছেন না কী করে শুনানির ডাকে তাঁরা সাড়া দেবেন। শুনানির নামে এই হয়রানি তীব্র অত্যাচারের রূপ ধারণ করেছে।

এন্যুমারেশন ফর্ম নিয়ে বিএলও’রা বাড়ি বাড়ি গেলেন। অথচ, এ ক্ষেত্রে যেখানে সংখ্যাটা অনেক কম সেখানে কাউকে বা কোনও দলকে নিয়োগ করা হল না কেন, যাঁরা এঁদের কাছে গিয়ে সঠিক তথ্য যাচাই করবেন? তা ছাড়া সশরীরে উপস্থিতিকেই বা কেন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে? প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে অন্য কেউও তো শুনানিতে যেতে পারেন। নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার বিষময় পরিণাম অল্পবিস্তর সবাই জানেন বিগত দিনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা নির্বাচন কমিশনকে বস্তুত তাঁদের শাখা সংগঠন হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন। তাঁদের আস্ফালন মতুয়া সম্প্রদায়-সহ সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সেটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নাগরিকদের উপর। যিনি ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন, ভোটার কার্ড বা এপিক নম্বরের মালিক হয়েছেন, তাঁকেই বলা হচ্ছে ‘প্রমাণ করো, তুমি এ দেশের নাগরিক’।

‘দ্য রিপ্রেজ়েন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, এক জন ব্যক্তি যদি ভারতের নাগরিক না-হন, তা হলে তাঁর নাম ভোটার তালিকায় উঠবে না। অথচ, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সব ভোটারকে নাগরিক হিসাবে গণ্য করা যাবে না। তাঁর মতে, ‘পকেটে ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড যা-ই থাকুক তা প্রমাণ করবে না আপনি আমি এ দেশের নাগরিক’ (নাগরিকত্ব দেবে শুধু এনআরসি, ১৮-১২-২০১৯)। দেশের প্রচলিত আইন কিন্তু এই বক্তব্যের পক্ষে দাঁড়ায় না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা যদি সঠিক হয়, তা হলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, নাগরিক এবং অনাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত এই সরকার। সে ক্ষেত্রে এ সরকারও এক অবৈধ সরকার। সংবিধান অনুযায়ী, নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই দেশ চালাবে, আইন প্রণয়ন করবে। এখানে কিন্তু তা হচ্ছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুসলিম বিদ্বেষ তৈরি করতে গিয়ে শাসকরা বোধ হয় তাঁদের সাধারণ বিচারবোধও হারিয়ে ফেলেছেন। সেই কারণেই তাঁরা অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতুনকে অনাগরিকের তকমা দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অসীম দুর্ভোগ সয়ে অনেকগুলি মাস জেলে কাটিয়ে অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দেশের মাটিতে পা রাখতে পেরেছেন তিনি। সরকার তার পরাজয়কে আড়াল করতে বলছে মানবিকতার কারণে সুনালীদের ফিরিয়ে আনা হবে। সুপ্রিম কোর্ট বলার আগে কোথায় ছিল এই মানবিকতা?

গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

শব্দ দৌরাত্ম্য

‘উৎসবের বিষ’ (২-১) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি যথাযথ। যে কোনও ধরনের ধর্মীয় উৎসবে শব্দবাজির লাগামছাড়া দাপট— উৎসবের বিষে আক্রান্ত হওয়াটা আমাদের বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন উচ্ছৃঙ্খলতা অনেক সময় আইনরক্ষকগণের নাকের ডগাতেই উপস্থাপিত হয়। তা সত্ত্বেও কোনও পদক্ষেপ করা হয় কই? বরং উল্টে তাঁরা বলেন, জনগণের তরফ থেকেই তো কোনও অভিযোগ পেশ করা হয় না। যদিও তাঁরা বিলক্ষণ জানেন প্রতিবাদ করলে অনেক সময়েই জুটবে হেনস্থা। তাই জনগণ সব কিছু সহ্য করে, বিরোধিতার সাহস পায় না। এ ভাবে আর কত দিন?

বিশ্বজিৎ কর, কলকাতা-১০৩

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nostalgia Good Old Days

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy