শর্মিলা মল্লিকের ‘চৈতন্যে জারিত মানবতাবোধ’ (১১-১২) শীর্ষক প্রবন্ধটি মনে করিয়ে দেয় শ্রীমা সারদা দেবীর অসীম স্নেহ, সেবা, বিনয়, ঔদার্য ও সহনশীলতার কথা। ঠাকুরের মতো তিনিও লোকশিক্ষা দিয়েছিলেন। রাজরাজেশ্বরী হয়েও তিনি ঘর নিকিয়ে, বাসন মেজে, এঁটো-নোংরা পরিষ্কার করে গৃহীদের শিখিয়েছিলেন গার্হস্থ ধর্ম। সুখে-দৈন্যে, সম্পদে-বিপদে, যুদ্ধে-বিগ্রহে, সব ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অপার করুণা, সকলের প্রতি। তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন সবাইকে। তাঁর মধ্যে ছিল না ঐশ্বর্যের লেশমাত্র। ধর্মজগতে তিনি মেনে চলতেন সাম্য।
ঠাকুরের বাণী, ‘ভক্তের জাতি নাই’— আক্ষরিক অর্থেই মা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ‘ঠাকুর’ কখনও আলাদা নন, সবই এক। জাতপাতের ঠুনকো ভাবনার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ প্রয়োজনে গর্জে উঠত। কথা ও কাজে প্রকাশ পেত সর্বধর্ম সমন্বয়ের ভাবনা। জগদ্ধাত্রী পুজোর পর তিনি গৃহস্থ, সাধু, ব্রহ্মচারী— সকলকেই একই পাত্র থেকে মুড়ি-জিলিপি খেতে দিয়ে তার পরিচয় দিয়েছিলেন। সমাজে ব্রাত্য ডোম, গোয়ালা, পাল্কিবাহকদের সামাজিক মর্যাদা দিয়েছিলেন কাছে ডেকে। বিজয়াদশমীর দিন ভিন্নগ্রামীয় প্রতিমাশিল্পী ‘কুঞ্জ-কাকা’র খোঁজ নিতে ও তাঁকে ডেকে আদর-যত্ন করতে ভুলতেন না। কথিত আছে, এক বার দু’জন ব্রাহ্মণকন্যা ভানু-পিসিকে প্রণাম করলে গোলাপ-মা প্রচণ্ড রেগে যান এবং বলেন যে, ব্রাহ্মণদের গোয়ালার মেয়েকে প্রণাম করা ঠিক নয়। এ সবের মধ্যে গোলাপ-মায়ের ‘দোষ’ দেখে সে দিন মা বলেছিলেন, ভক্তি ভাবে সকলকেই প্রণাম করা চলে। শ্রীমা মনে করতেন, মনেতেই সব; মনেতেই শুদ্ধ, মনেতেই অশুদ্ধ। আসলে শ্রীমার উদার মনের কাছেই হার মেনেছিল জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতার বেড়া। সেই সঙ্গে তাঁর অকৃত্রিম মাতৃত্বের প্রভাবে দস্যুও ভক্তে পরিণত হত। এক মুসলমান তুঁতচাষি ঠাকুরের জন্য কয়েকটি কলা নিয়ে শ্রীমাকে দিতে গেলে জনৈক স্ত্রীভক্ত সেই চাষিকে উদ্দেশ করে বলেন, ওরা চোর, আমরা জানি। ওর জিনিস ঠাকুরকে দেওয়া কেন? মা কলাগুলি নিয়ে মুসলমানকে মুড়ি-মিষ্টি খাইয়ে ছেড়ে দেন এবং ভক্তকে তিরস্কার করে বলেন, কে ভাল, কে মন্দ— আমি জানি। দোষ তো মানুষের লেগেই আছে। কী করে যে ভাল করতে হবে, তা ক’জন জানে? (তথ্যসূত্র: স্বামী গম্ভীরানন্দ, শ্রীমা সারদা দেবী)
আসলে মন্দকে ভাল করতেই যেন তাঁর জগতে আবির্ভাব। পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে থাকা মানবসত্যের কথাই তিনি আজীবন শুনিয়েছেন। আর এখানেই তিনি সাধারণ হয়েও অসাধারণ। সত্যিই তিনি সমদর্শী, মানবতাবাদের এক অনন্য শিক্ষিকা। তাঁর শিক্ষা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার, মানবিক মূল্যবোধের সেই শিক্ষাই শিক্ষার্থীর যথার্থ শিক্ষা, যার আজ সত্যিই অভাব।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
ক্ষতি ছাত্রদের
আগামী শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তামগ্ন প্রধানশিক্ষক থেকে শুরু করে পরিচালন কমিটি। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে তাঁরা জেরবার। কম আয়ে ভাল পরিষেবা কী ভাবে সম্ভব? গত দেড় দশকে পেরেক থেকে পোশাক— সব কিছুরই দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। থেমে আছে কেবল স্কুলের ভর্তি ফি। তখন ছিল ২৪০ টাকা, এখনও তাই। কড়া নির্দেশ, ভর্তি ফি বেশি নেওয়া চলবে না। তা হলে স্কুলের খরচ চলবে কী ভাবে?
সরকার থেকে স্কুলগুলিকে যৌথ অনুদান দেওয়া হয়, যা দিয়ে বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক খরচ চালানো হয়। তাতেও এখন ভাটার টান। বর্তমানে প্রায় সমস্ত সরকারপোষিত স্কুলেই শিক্ষকের অভাব প্রকট। ফলে কাজ চালাতে নিয়োগ করতে হচ্ছে একাধিক অস্থায়ী শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী। কিন্তু তাঁদের বেতন দেওয়া হবে কী ভাবে? স্কুলের তিন পর্বের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র কিনতে খরচ বাড়ছে দিন দিন। মাধ্যমিকের টেস্ট পেপার জেলা সদর থেকে স্কুলে বয়ে আনতে গাড়িভাড়া লাগে বিপুল অঙ্কের। সেই অর্থই বা আসবে কোথা থেকে? বিদ্যুতের বিল, নিয়মিত মেরামতি, বই বহনের খরচ, শৌচাগার ও স্কুল চত্বর পরিষ্কারের ব্যয়— সব কিছুরই তো সংস্থান প্রয়োজন। বাৎসরিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, অভিভাবক সভার খরচও কম নয়। তার উৎস কোথায়?
খানিক দরদ ও দুর্নীতিমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিই এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে পারে। অন্য ভান্ডারে টাকা ঢালতে গিয়ে শিক্ষার ভান্ডারে টানাটানি কাম্য নয়। গত এক বছরে শিক্ষকদের চাকরি বাতিল, যোগ্য-অযোগ্য বিতর্ক, শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়দান— এই সব কিছুর অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি বিদ্যালয়ের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা। যাঁদের তারা এত দিন নিয়মিত পাঠদান করতে দেখেছে, তাঁরাই হঠাৎ হয়েছেন ‘অযোগ্য’ শিক্ষক। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি বাতিল না-হওয়ায় আরও বড় ডামাডোলের হাত থেকে আপাতত রক্ষা পাওয়া গিয়েছে। তবে শিক্ষক সমাজের সম্মান যে গভীর ভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না।
নতুন বছর সবে শুরু হয়েছে, নতুন শিক্ষাবর্ষও। সরকারি যত্ন ও দায়িত্বশীলতার স্পর্শে, দুর্নীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে স্কুলশিক্ষার অঙ্গনগুলি আবারও হয়ে উঠুক আলোময়, আনন্দনিকেতন।
পার্থ পাল, মৌবেশিয়া, হুগলি
দর্পণে আঁচড়
ইংরেজি বছরের শেষ লগ্নে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ‘বিপন্ন চতুর্থ স্তম্ভ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় (২৫-১২) প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ। ভারতীয় সংবিধানেরও চারটি মূল স্তম্ভ রয়েছে— আইনসভা, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম। আইনসভা (সংসদ ও রাজ্য বিধানসভা) দেশ ও রাজ্যের জন্য আইন প্রণয়ন করে; শাসন বিভাগ (মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী) প্রণীত আইনগুলি কার্যকর করে; বিচার বিভাগ নিশ্চিত করে আইনগুলি যথাযথ ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না। চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে পরিচিত গণমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখে এবং জনগণকে প্রকৃত তথ্য সরবরাহ করে।
সংবাদমাধ্যম দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পরিবেশ, নাগরিক অধিকার, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থী-সহ সাধারণ মানুষকে অবহিত রাখে। গণতন্ত্রের এই চতুর্থ স্তম্ভ সমাজের দর্পণ। তাদের ভূমিকা ‘খবর’ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি সুস্থ, সচেতন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে অপরিহার্য দায়িত্ব পালন করাও তাদের কর্তব্য।
দুর্ভাগ্যবশত ভারত-সহ বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকারগুলি এই চতুর্থ স্তম্ভের স্বাধীনতা খর্ব করার পথে হাঁটছে। দেশ জুড়ে যে কোনও শাসকের ক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম কৌশল হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমকে ‘কব্জা’ করা। অন্যান্য পেশার মতো সাংবাদিকরাও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার অধীনে কাজ করেন। দু’-একটি ব্যতিক্রমী সংবাদমাধ্যম বাদ দিলে বহু সংবাদমাধ্যম আজ ‘শাসকজীবী’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। এর ফলস্বরূপ ভুল তথ্য, মিথ্যা প্রচার, ভুয়ো খবরের অবাধ কারবার চলছেই।
তথ্যনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ও তাঁদের সাংবাদিকদের উপর শাসকের আক্রমণের দায় কিছুটা হলেও বর্তায় সেই সব সংবাদমাধ্যমের উপরই, যারা নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে।
নিকুঞ্জবিহারী ঘোড়াই, পাঁশকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর
বাঙালির জয়
‘লন্ডনে জয় বঙ্গসন্তানের’ (২৬-১২) প্রতিবেদনে নাগেরবাজারের ভূমিপুত্র পৃথ্বীশ রায়ের লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স-এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ের বিষয়টি পড়ে বেশ আহ্লাদিত হলাম। বাঙালির জয়গান আজকাল ফুটবল মাঠ বা রসগোল্লার হাঁড়ি ছাড়িয়ে যে টেমস নদীর পাড়ে গিয়েও সগৌরবে আছড়ে পড়ছে, তা দেখে বুকটা চওড়া হয়েই যায়।
পৃথ্বীশ রায় প্রমাণ করলেন, বিদেশে গিয়ে ব্রিটিশদের শিখিয়েও আসা যায় যে ভোটটা ঠিক কী ভাবে জিততে হয়! ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যদি কোনও দিন এই বাঙালিকে তর্ক করতে দেখা যায়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
দ্যুতিমান ভট্টাচার্য, কলকাতা-৪০
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)