E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: ভোটের ‘ফটাস’

ঠান্ডা পানীয় বড় ভাল লেগেছে ভোটারের। আওয়াজ করে ছিপি খোলা, পানীয়ের মধ্যে বুদবুদ। ভোট দিয়ে বেরেনোর পর সাধ হল আর এক বোতল পান করবেন। তিনি খোঁজ করতে লাগলেন প্রার্থীর।

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২২

বঙ্গদেশে ভোট-প্রচারে ‘মাছ কুটলে মুড়ো দিব’র মহিমা এখনও দিব্যি বজায় আছে। ডিজিটাল বিপ্লবের তেমন প্রভাব পড়েনি সেখানে। একুশ শতকের সিকিভাগ কেটে গেল, এখনও প্রচারে বেরিয়ে ভোটারের চিত্তজয়ের জন্য পুরুষ ভোটারের দাড়ি কামিয়ে দেওয়া, শিশুদের পড়া দেখিয়ে দেওয়ার কাজ করছেন ভোটপ্রার্থী। ছবিতে তার দেখা মিলল (২৪-৩)। প্রার্থীর মাছ কুটে দেওয়ার ছবিও ধরা পড়েছে।

প্রসঙ্গ ক্রমে মনে পড়ল এই বঙ্গের এক ভোটরঙ্গের গল্প। এক জন সহজ-সরল ভোটারকে পাকড়াও করে ভোটপ্রার্থী লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন। ভোটার বললেন, “জলতেষ্টা পেয়েছে বড্ড। কলে গিয়ে তেষ্টা মিটিয়ে আসছি।” প্রার্থী তো কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না ভোটারকে। পাশের দোকান থেকে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল খুলে ধরিয়ে দিলেন ভোটারের হাতে, “এই নিন। ভোট না দিয়ে লাইন থেকে নড়বেন না।”

ঠান্ডা পানীয় বড় ভাল লেগেছে ভোটারের। আওয়াজ করে ছিপি খোলা, পানীয়ের মধ্যে বুদবুদ। ভোট দিয়ে বেরেনোর পর সাধ হল আর এক বোতল পান করবেন। তিনি খোঁজ করতে লাগলেন প্রার্থীর। সে দিন প্রবল ব্যস্ত মানুষ তিনি, তবু অনেক কসরত করে তাঁকে পাকড়াও করা গেল। ভোটার বললেন, “আবার তেষ্টা পেয়েছে।” প্রার্থী-মশাই মানুষ ভাল। পাশের দোকান থেকে এক গেলাস জল দিতে বললেন সেই ভোটদাতাকে। প্রবল অসন্তোষের সঙ্গে সেই সাদা জল পান করে তিনি আবার ধরেছেন প্রার্থীকে। বললেন, “জল খেলাম। ‘ফটাস’ করল না যে।” তিতকুটে হেসে প্রার্থী বললেন, “দাদা গো, ‘ফটাস’ ভোটের আগেই করে!”

তফাত হয়তো হয়েছে কিছু। এখন দেশের ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন। তবে বঙ্গের নির্বাচন-পূর্বের পরিস্থিতি বিশেষ বদলায়নি। উল্লিখিত ছবিগুলি বলছে, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি

আদিখ্যেতা

ইতিপূর্বে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের আগে ভোটপ্রার্থীদের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যেত। তাঁরা আগে থাকতে বলে-কয়ে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কোনও একটি দরিদ্র পরিবারে কিংবা অনুন্নত সম্প্রদায়ের বাড়িতে মেঝেতে বসে মধ্যাহ্নভোজ সারতেন এবং একটি মহৎ কাজ করে ফেলেছেন ভেবে সেই ছবি সমাজমাধ্যমে দিতেন। এমনকি পত্র-পত্রিকাতেও সেই ছবি ছাপা হত। এ বার একটু অন্য ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। ভোটপ্রার্থীরা ভোট চাইতে গিয়ে কেউ সেলুনে ঢুকে ক্ষুর দিয়ে কারও দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার ভোটদাতার বাড়ি পৌঁছে শুকিয়ে যাওয়া ঘুঁটে তুলে দিচ্ছেন, কোথাও কলেজ শিক্ষিকা নিচু ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মেঝেতে বসে পড়াও বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বর্তমান রাজনীতির কারবারিদের কাছে বিনীত অনুরোধ: ভবিষ্যতে এক দিনের এই হাস্যকর প্রহসনগুলি, বা বলা ভাল— দেখানেপনাগুলি বন্ধ করুন। ভোটদাতা কোন রাজনীতিবিদকে ভোট দেবেন, সেটা ঠিক করবেন প্রার্থীর কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে, বিশেষ করে তাঁর সততা, দক্ষতা ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তির নিরিখে। তাঁদের লোকদেখানো আদিখ্যেতা দেখে নয়।

সমীর কুমার ঘোষ, কলকাতা-৬৫

মর্যাদাহানি

‘আর এক যুদ্ধক্ষেত্র’ (১৫-৩) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ভারতীয় সংসদ ভবনের মধ্যে স্বাধীনতা-উত্তর কালে শাসক দল ও বিরোধী সংসদদের আচার-আচরণে সংসদীয় নৈতিকতা যে দশকে দশকে বিপন্ন হয়েছে বা হচ্ছে, তা যথার্থ বলা হয়েছে। ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে জনমতের দ্বারা নির্বাচিত শাসক দল প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে অন্যায্য ভাবে সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সাংসদদের কেউ কুৎসিত ভাষা প্রয়োগ করছেন, হাতাহাতি করছেন, চেয়ার ছোড়াছুড়ি করছেন, বা অধিবেশনে অংশগ্রহণ না করে সম্মিলিত ভাবে ওয়াক আউট করছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভ করে সংসদে যাঁরা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা যদি সেখানে দেশের সমস্যা সমাধানে সুস্থ আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করার পরিবর্তে নীতি-বহির্ভূত আচার-আচরণ করেন, তা হলে সেটা সত্যিই আর সংসদ কক্ষ না থেকে ‘আর এক রণক্ষেত্র’-ই হয়ে ওঠে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদাহানি হয়, সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছয়।

সংসদ ভবন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভারতীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নিয়মনীতি ও প্রস্তাব নির্ধারণের জায়গা বলে দেশের সাধারণ মানুষ জানেন। লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করা সাংসদরা সংসদ ভবনে বিভিন্ন অধিবেশনে যোগদান করেন ও আলোচিত বিষয় বা প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে বক্তব্য পেশ করেন। লোকসভার অধিবেশন সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা করার জন্য স্পিকার নিযুক্ত করা হয়। তিনি অবশ্যই যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে সকলের মতামত শুনবেন এবং অধিবেশন চলাকালীন সুষ্ঠু ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সেটাই, যেখানে সরকার পক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় লোকসভার সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলবে, বিরোধীদের বক্তব্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে এবং শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে চরম মতবিরোধ হলেও বিরোধী দলের সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে মহার্ঘ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাংসদদের কাছ থেকে এমন আচরণ কি কাম্য? শাসক ও বিরোধী পক্ষের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের জায়গা ঠিক না থাকলে সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে সুখকর নয়।

স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০

নারীর শ্রম

শতাব্দী দাশের প্রবন্ধ ‘কষ্ট হলে কাজ পাব না?’ (২৪-৩) নারীবাদী ভাবনার ইতিবাচক দিক সঠিক ভাবে তুলে ধরেছে। নারীর কর্মসংস্থান, শ্রম-নীতি নিয়ে বিভিন্ন ভাবনা কাজ করে, যেখানে তাঁদের পুরুষদের সমতুল্য শ্রমমূল্য না দেওয়ার ধারণা পোষণ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। অথচ, নারীকে সমাজ ও সংসারে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি শ্রম দিতে হয়। নারীদের গৃহকর্ম ও বাড়ির বয়স্কদের পরিচর্যার দায়িত্ব-সহ এমন কিছু কাজ করতে হয়, যা পুরুষরা হামেশাই এড়িয়ে যান। দিন আর ঘণ্টার ভিত্তিতে নারীদের শ্রম মাপা যায় না কখনও। তদুপরি, ঋতুস্রাব নারী শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈব প্রক্রিয়া, যা কখনও কখনও তীব্র কষ্টদায়কও বটে। প্রজনন পর্বটিও নারীদেরই পার করতে হয়। তাই সমাজব্যবস্থায় বা কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের তুল্যমূল্য শ্রমের বিভাজনে না গিয়ে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নারীদের জন্য বরাদ্দ করা প্রয়োজন! মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটির নিদান সরকারি স্তরে থাকলেও অসংগঠিত ক্ষেত্রে বা ব্যক্তিমালিকাধীন পরিসরে কাজের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনও অনুপস্থিত। এগুলি কি সরকার বা শীর্ষ আদালতের বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত হতে পারে না? এমন একটি বিষয় নিয়ে সর্বস্তরে আলোচনা হতে অসুবিধে কোথায়! পক্ষপাতিত্ব নয়, পৃথক আইন হোক নারীদের কর্মনিযুক্তির প্রেক্ষিতে। কথার ফুলঝুরি না ছুটিয়ে পুরুষদের বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিষয়টি ভাবলে কাজের কাজ হবে।

সৌম্যেন্দ্রনাথ জানা, কলকাতা-১৫৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Campaigns candidates West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy