তাপস সিংহ লিখিত ‘‘সবাই যেখানে ‘অপরাধী’’ (২২-৬) শীর্ষক নিবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তথ্যনিষ্ঠ। আমি কিছু সংযোজন করতে চাই। লেখক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত যে রিপোর্টটির কথা উল্লেখ করেছেন সেটির নাম: Tyranny of a Lawless Law: Detention without charge or trial under the Jammu Kashmir Public Safety Act. এ ছাড়াও সম্প্রতি শ্রীনগরের ‘অ্যাসোসিয়েশন অব পেরেন্টস অব ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পার্সনস’ এবং ‘কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি’ নামক দু’টি সংগঠন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যার নাম— Torture Indian States Instrument of control in Indian Administered Jammu and Kashmir. এই দু’টি রিপোর্ট আমাদের জানাচ্ছে, ভারতরাষ্ট্র দমনপীড়নের মাধ্যমেই ভূস্বর্গকে ‘অবিচ্ছেদ্য’ করে রাখতে চায়। রিপোর্ট দু’টিতে উঠে এসেছে বেশ কিছু বিনা বিচারে আটক রাখা এবং পুলিশ বা সেনা হেফাজতে হত্যা করার ঘটনা, এবং অন্য বেশ কয়েকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

১৪ বছরের কাশ্মীরি কিশোর মহম্মদ ইব্রাহিম দারকে পাঁচ মাস জম্মু-কাশ্মীর জনসুরক্ষা আইনে জেলবন্দি করে রাখা হয়েছিল। আদালতে পুলিশ জানিয়েছিল ইব্রাহিমের বয়স ২২ বছর। কিন্তু আদালত তাঁর স্কুল-সার্টিফিকেট পরীক্ষা করার পর ইব্রাহিমকে বেকসুর খালাস করে দেয়। সেটা ২০১৬ সালের ঘটনা। ওই বছরই একই ঘটনা ঘটে জুবেইর আহমেদ শাহ-এর ক্ষেত্রে। আদালত তাঁকেও মুক্তি দেয়।

তবে সব কাশ্মীরির ভাগ্য এঁদের মতো সুপ্রসন্ন নয়। যেমন শ্রীনগরের বাসিন্দা উমের কাইয়ুম ভাই, যাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে তুলে নিয়ে গিয়ে দু’দিন ধরে অকথ্য অত্যাচার চালায়। দু’দিন পরে আদালত তরুণ উমেরকে মুক্তি দিলে, আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তাররা প্রাথমিক চিকিৎসা করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পর দিন উমেরের রক্তবমি শুরু হলে, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সিটি স্ক্যান করানো হয়। জানা যায়, উমেরের ফুসফুস দু’টি কাজ করছে না। ভেন্টিলেশনে দেওয়ার দু’ঘণ্টা পর ফুসফুস ফেটে মারা যান তিনি। ডাক্তাররা জানান, বুকে প্রচণ্ড আঘাতের ফলে উমেরের ফুসফুস দু’টি দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিল এবং প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে তিনি মারা গিয়েছেন। ঠিক একই ভাবে ফুসফুস ফেটে মারা যান ত্রাল এলাকার বাসিন্দা মুজাফ্ফর আহমেদ মির্জা। তাঁকেও গ্রেফতার করার পর লোহার রড দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছিল।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মাসারাত আলমকে গত ২০ বছরে ৩৭ বার জনসুরক্ষা আইন প্রয়োগ করে বন্দি রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকটি এফআইআর-এ তাঁর নাম থাকলেও এখনও পর্যন্ত একটি অপরাধও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু বার বার জনসুরক্ষা আইন প্রয়োগ করে তাঁকে হেফাজতে রেখে দেওয়া হচ্ছে। রিপোর্টটিতে ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত জনসুরক্ষা আইনে আটক ২১০ জনের উপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে। এই রিপোর্ট দেশের জনগণের সামনে দিতে চায়নি রাজ্যপাল সত্যপাল মালিকের প্রশাসন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইমেল করে সংবাদমাধ্যমের কাছে রিপোর্টটি পাঠিয়েছে।

১৯৭৮ সালে চালু হওয়া জম্মু-কাশ্মীর জনসুরক্ষা আইনে, যে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে ২ বছর পর্যন্ত বন্দি রাখা যায়। কোনও ব্যক্তি কাশ্মীরি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বললেই এই আইন প্রয়োগ করে গ্রেফতার করা হয়। আদালতের নির্দেশে কোনও ব্যক্তি ছাড়া পেলে তৎক্ষণাৎ জনসুরক্ষা আইনের ৯(৫) ধারা প্রয়োগ করে আবার গ্রেফতার করা হয়। ওই ধারায় বলা আছে, যে কোনও ব্যক্তি ‘জনসুরক্ষা’ রক্ষার ব্যাপারে ‘বিপজ্জনক’ কি না, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্র বা সরকারের আছে।

পূর্বোল্লিখিত অপর রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, কাশ্মীর উপত্যকার বন্দিদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তার মধ্যে ওয়াটার বোর্ডিং (হাত-পা মুখ বেঁধে জলের তলায় বসিয়ে রাখা), ঘুমোতে না দেওয়া, ধর্ষণ, পায়ুসঙ্গম, বিদ্যুতের শক দেওয়া, লঙ্কাগোলা জলে মুখ চুবিয়ে দেওয়া, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা, ছেঁকা দেওয়া নানা ধরনের পদ্ধতি আছে। কোনও ক্ষেত্রেই পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর কোনও শাস্তি হয় না, কারণ জনসুরক্ষা আইন ছাড়াও ১৯৯০ সাল থেকে কাশ্মীরে চালু আছে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বা আফস্পা, যা সেনাবাহিনীকে গ্রেফতার ও হত্যা করার অবাধ স্বাধীনতা দেয়।

এই আইনের ৪-এ ধারা অনুযায়ী, কোনও ফৌজি জওয়ান স্রেফ সন্দেহের বশে যে কোনও ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করার অধিকারী। ৪-বি ধারা অনুযায়ী, সেনাবাহিনী জনগণের সম্পত্তি ধ্বংসের অধিকারী। ৪-ডি ধারা অনুযায়ী, সেনাবাহিনী ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা ছাড়াই যখন খুশি কোনও নাগরিকের বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালাতে পারেন। এই আইনের ৬নং ধারা বলছে, এক জন সেনা জওয়ান যতই মানবাধিকার লঙ্ঘন করার অপরাধ করুন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা যাবে না।

স্বভাবতই, আফস্পা আইনের রক্ষাকবচের ফলেই সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিরীহ কাশ্মীরি যুবকদের উপর অবাধে যথেচ্ছ অত্যাচার চালানো যায়। আফস্পা এবং জনসুরক্ষা আইন ছাড়াও জম্মু ও কাশ্মীরে চালু আছে উপদ্রুত এলাকা আইন। এই তিনটি আইন ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’র স্বার্থে পুলিশ, সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে যে কোনও পদক্ষেপ করার ছাড়পত্র দেয়। সে ক্ষেত্রে তাঁদের দ্বারা সাধারণ নাগরিকের উপর অন্যায় নিপীড়ন হলেও, বিচার বিভাগীয় পুনর্নিরীক্ষণের (জুডিশিয়াল রিভিউ) কোনও ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ ওই তিনটি আইন কাশ্মীরবাসীদের ভারতীয় সংবিধানের ৩২ নং ধারা অনুযায়ী সাংবিধানিক প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে।

কাশ্মীরিদের উপর নৃশংস অত্যাচার যেন মনে করিয়ে দেয় কুখ্যাত দুই আমেরিকান ডিটেনশন ক্যাম্প— গুয়ান্তানামো বে এবং আবু ঘ্রাইবের নৃশংসতার কথা, ৯/১১-এর ঘটনার পর যে দু’টি কারাগারে নিরীহ মুসলিম যুবকদের অত্যাচার করা হত ঠিক একই ভাবে, ‘আমি আল কায়দার সঙ্গে যুক্ত’ এই স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য। গোটা ভূস্বর্গই আজ এক ডিটেনশন ক্যাম্প, ভারতীয় উপমহাদেশের এক ‘আবু ঘ্রাইব’।

অজেয় পাঠক

হরিণডাঙা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

মহিলা স্কুল

‘মহিলা স্কুল আগেও’ (২৯-৬) শীর্ষক চিঠি সম্পর্কিত কয়েকটি তথ্য জরুরি। এটা ঠিক, বেথুন স্কুলের আগে বেশ কিছু মহিলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮১৯-১৮২৫ পর্যন্ত মাত্র ৭ বছরের মধ্যেই ৯৩টি মহিলা বিদ্যালয়ে প্রায় ১৭৪৮ জন ছাত্রী পাঠরতা ছিলেন। এখানে শ্রীরামপুর মিশনের মহিলা মিশনারি (যাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা মিশনারি বলা হয়) হানা মার্শম্যান-এর (১৭৬৭-১৮৪৯) নাম আসবে। ‘জেনানা মিশন’-এর কথাও প্রাসঙ্গিক।

মিশনারি ডাফ (১৮০৬-১৮৭৮) ১৮৩০-এ কলকাতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন রামমোহনের সহায়তায়। আলেকজ়ান্ডার ডাফ ‘জেনানা মিশন’-এর (অন্তঃপুরে শিক্ষা) পত্তন করেন।

কিন্তু বেথুন সাহেবের মহিলা বিদ্যালয় ছিল ভারতের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ মহিলা বিদ্যালয়। এখানে বাইবেল বা ধর্ম নয়, মানবতাবাদই ছিল শিক্ষার প্রধান বিষয়।

সরকারি উদ্যোগের এবং এই নিরপেক্ষতার কারণে, বেথুন স্কুলকে সাধারণত ভারতের প্রথম মহিলা বিদ্যালয় বলা হয়।

সুরঞ্জন মিদ্দে

কলকাতা-৮২

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,

কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

 

ভ্রম সংশোধন

‘সিম্বা আর বশ্যতার রূপকথা’ (পৃ ৪, ২৯-৭) নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’ লাইনটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। আসলে এটি কবি গোলাম মোস্তফার লেখা। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।