Advertisement
E-Paper

সাধনা এবং পাণ্ডিত্য

গোপীনাথের প্রথম গবেষণা সন্দর্ভ ন্যায় বৈশেষিক দর্শনের ইতিহাস। প্রায় ১৫০০ পুঁথি ঘেঁটে লেখা ইতিহাস।

গৌতম চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২০ ০২:০৪

এমন কবিরাজ তিনি, যিনি জীবনেও কোনও দিন নাড়ি দেখেননি, নিদান হাঁকেননি। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় কাশীতে কাটিয়েও গঙ্গাস্নান এবং বিশ্বনাথ মন্দির নিয়ে আদিখ্যেতা করেননি। বরং ৫০ বছর আগে, ১৯৬৪ সালে হিন্দি ভাষায় লেখা তান্ত্রিক ভঙ্গিমা মে শাক্তদৃষ্টি বইটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ভারত সরকার সে বারই তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ দিয়ে সম্মানিত করে। শক্তি এবং তন্ত্র নিয়ে এত ভাল আকরগ্রন্থ আধুনিক ভারতে তখনও নেই। বাঙালি হিন্দি জানে না গোছের যে চিৎকার আজকাল চার দিকে চলছে, অধুনা বিস্মৃতপ্রায় গোপীনাথ কবিরাজই হতে পারেন তার যোগ্য প্রত্যুত্তর। কাশীতে তৎকালীন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ। আজ সেটি সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় নামে খ্যাত।

গোপীনাথ কবিরাজ এই সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। তাঁর সম্পাদনাতেই ১৯২৩ সাল থেকে ছেপে বেরোতে থাকে ‘সরস্বতী ভাবনা গ্রন্থমালা’। কলেজের পুরনো পুঁথিসম্ভার সম্পাদনা করে সেখান থেকে তন্ত্র, মীমাংসা, বৌদ্ধ ও শৈব দর্শনের ক্যাটালগিং। ভারতবিদ্যার গবেষক ও ছাত্রদের কাছে আজও এই সিরিজ়টির বিকল্প নেই। বস্তুত, সম্পাদনা ছাড়াও গোপীনাথ হিন্দি ও বাংলা দুই ভাষাতেই সব্যসাচীর মতো লিখেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৮ সালে ভারত সরকার ডাকটিকিটও বার করে।

প্রথমেই একটি চেতাবনি দেওয়া যাক। গোপীনাথ কবিরাজ আদৌ নাস্তিক নন। কাশীবাসী এই মানুষটি পণ্ডিত এবং সাধক। বিশুদ্ধানন্দ সরস্বতীর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। বাড়িতে অধ্যয়ন, অধ্যাপনার পাশাপাশি সাধনাও করতেন। সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ থেকে রাম ঠাকুর, আনন্দময়ী মা সকলের সঙ্গে ছিল সহজ সম্পর্ক। সাধনাই তাঁর দৃষ্টিকে এক অনন্য মুক্তদৃষ্টি দিয়েছিল। বৌদ্ধ তন্ত্র নিয়ে লিখছেন, “বহুর মধ্যে একের, বিভক্তদের মধ্যে অবিভক্তের এবং ভেদের মধ্যে অভেদের যে অস্তিত্ব রয়েছে, তা দেখতে হবে। এই ভাবেই ভেদাভেদের অতীত, বাক ও মনের অগোচর নির্বিকল্প পরম সত্যের দর্শন হয়। বিরোধ থেকে অবিরোধের দিকে গতিই সর্বত্র হওয়া উচিত।” আজকের পরিস্থিতিতে এই বাঙালিকে ফের মনে না করলে চলবে?

Advertisement

এই পণ্ডিত মানুষটির সঙ্গে প্রথম আলাপ করিয়ে দেন দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী। গত বছর কাশী যাচ্ছি শুনে তাঁর প্রথম পরামর্শ, “ও সব অলিগলিতে ঘুরে বেড়ালে হবে না। পারো তো গোপীনাথ কবিরাজকে জানার চেষ্টা করো, আনন্দ পাবে।”

তা জানব কী ভাবে? কবিরাজ মশাইয়ের জীবদ্দশাতেই তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও পুত্রবধূর মৃত্যু হয়। কাশীর সিগরা অঞ্চলে বাড়ি ছিল, পড়েছি। সে বাড়ি কোথায়, এখন কেউ থাকেন কি না, সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়েও কেউ বলতে পারল না। ফ্লিপকার্ট এবং অ্যামাজ়নে তাঁর লেখার কিছু সঙ্কলন খুঁজে পাওয়া গেল। সবচেয়ে উপকার করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতের অধ্যাপক মৌ দাশগুপ্ত। ১৯৮২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হেমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা মহামনীষী মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ নামে একটি জীবনী বেরিয়েছিল, সে বই এখন আর ছাপা হয় না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সেই দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, “যাঁহারা মনে করেন, সীমিতশক্তি বাংলা ভাষায় দার্শনিক, তাত্ত্বিক ও অধ্যাত্মমার্গীয় ব্যাপারসমূহ ব্যাখ্যা করা যায় না, তাঁহারা এই গ্রন্থপাঠে লক্ষ্য করিবেন বুদ্ধিগ্রাহ্য তত্ত্বকথাও কতটা রসসিক্ত হইতে পারে।”

খুঁজতে খুঁজতে বোঝা গেল, বাঙালি জীবনে সাধনা ও পাণ্ডিত্যের যুগল ধারা আজ ফল্গু নদীর চেয়েও শুষ্ক। গোপীনাথ কবিরাজ দূর অস্ত্, বাঙালি ভুলেছে অনন্তলাল ঠাকুর, ফণিভূষণ তর্কবাগীশ, কালীপদ তর্কাচার্যের মতো মহারথীদেরও।

অনন্তলাল ঠাকুর কর্মজীবনের বেশিটাই কাটিয়েছেন মিথিলা, দারভাঙা অঞ্চলে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের তিব্বত থেকে আনা বৌদ্ধ পুঁথিগুলিকে তিনিই হিন্দিতে তর্জমা করেন। প্রমথনাথ তর্কভূষণ কাশীতে থাকতে থাকতেই গীতার শাঙ্করভাষ্য বাংলায় অনুবাদ করতে থাকেন। ফণিভূষণও কাশীতে বসেই গোপীনাথের প্রেরণায় তাঁর তিন খণ্ডের ন্যায়দর্শন লিখতে শুরু করেন। কাশী মানে শুধু দশাশ্বমেধ ঘাট, রাবড়ি, ফেলুদা এবং নরেন্দ্র মোদী নয়। বাঙালির লুপ্ত সারস্বত ঐতিহ্য।

এই লুপ্ত ঐতিহ্যে সারস্বত সাধনা ও ভগবৎ প্রেম সমান্তরাল ও সমান বেগে ছোটে। ফণিভূষণ তর্কবাগীশ যেমন ভক্ত বৈষ্ণব ছিলেন। কাশীর অনঙ্গমোহন হরিসভা, হরিনাম প্রদায়িনী সভার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। তার সঙ্গে ন্যায়দর্শন রচনার বিরোধ নেই। কালীপদ তর্কাচার্য কলকাতার সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়ে পড়ান, কিন্তু কাশীর ভারত ধর্মমহামণ্ডল তাঁকে ‘বিদ্যাবারিধি’ উপাধি দেন।

সারস্বত সাধনা ও ভগবৎ প্রেমের এই যুগ্ম স্রোতেই ছিল বাঙালিয়ানা। সদানন্দ চক্রবর্তীর মতো ইংরেজি সাহিত্যে পণ্ডিত থেকে অরিন্দম চক্রবর্তী— অনেকেই সীতারামদাস ওঙ্কারনাথের শিষ্য ছিলেন, দিলীপকুমার রায় বারংবার কনখলে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে গিয়েছেন। ভাটপাড়ার বিশ্রুত পণ্ডিত শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের বাবা পঞ্চানন তর্করত্নও কাশীবাসী ছিলেন, সেখানে বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রের উপর শক্তিভাষ্য প্রণয়ন করেন। কাশী ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ছিল কি না, বড় কথা নয়। আসল কথা, বাংলার বিদ্বৎসমাজের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ তাকে দিয়েছিল অনন্য চেহারা। এখন দিন অন্য রকম, কাশী শুধুই হিন্দুত্বের হুঙ্কারময় টুরিস্ট স্পটে পর্যবসিত।

কাশীর এই অনন্যতার আর এক নাম গোপীনাথ কবিরাজ। ১৮৮৭ সালে ঢাকার কাছে ধামরাই গ্রামে জন্ম, জন্মের কয়েক মাস আগে মারা গিয়েছেন তাঁর বাবা। গ্রামবাংলার গরিব পিতৃহীন ছেলেটি ঢাকা জুবিলি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে।

কিন্তু কলেজে সে বারই ভর্তি হওয়া গেল না। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় সেই ছেলে। এই সময় বান্ধব পত্রিকায় রাজপুতানার জয়পুর নিয়ে একটি লেখা বেরোয়। বক্তব্য, সেখানকার দেওয়ান সংসারচন্দ্র সেন বাঙালি, কলেজের অধ্যক্ষ বাঙালি। এবং কলেজে পড়তে গেলে বেতন দিতে হয় না। মহারাজার নির্দেশে শিক্ষাবিভাগই ছাত্রদের সমস্ত ব্যয় বহন করে। জয়পুরের এই দেওয়ান সংসারচন্দ্র সেনকে বাঙালির অন্য কারণে মনে থাকতে পারে। পরিব্রাজক অবস্থায় জয়পুরে তাঁর বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।

মফস্‌সলের ছেলে গোপীনাথ ট্রেনের টিকিট কেটে একলাই পাড়ি দিলেন জয়পুর। বাঙালি ছাত্রেরা আজকাল যে কলকাতা ছেড়ে দিল্লি, মুম্বই ও নানা জায়গায় উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি দেয়, তার রক্তেই সেই উত্তরাধিকার।

গোপীনাথের জীবন এক অর্থে বাঙালির ভারতজয়ও বটে! জয়পুর কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল তখন মেঘনাদ ভট্টাচার্য। তিনি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ছোট ভাই। কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক নবকৃষ্ণ রায়। তিনি আবার আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের অন্যতম প্রিয় ছাত্র। জয়পুরের তখনকার পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে কবিরাজ মশাই লিখে গিয়েছেন, “ইংলিশ চ্যানেলের এ পারে ক্রিশ্চিয়ান থিওলজি নিয়ে এত বড় পুস্তকসংগ্রহ আর কোথাও নাই।… সর্বোপরি হস্তলিখিত পুঁথির যে বিরাট সংগ্রহ ছিল, তাহাও বিস্ময়কর।”

জয়পুর কলেজে স্নাতকোত্তর নেই, স্নাতক স্তরের পরীক্ষা তখন ইলাহাবাদে এসে দিতে হত। স্নাতকোত্তরে এসে গোপীনাথ ভর্তি হলেন বারাণসী সংস্কৃত কলেজে। এই কলেজটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মৃতিধন্য কলকাতার সংস্কৃত কলেজের চেয়েও প্রাচীন, কোম্পানির পৃষ্ঠপোষণে ১৭৯১ সালে গড়ে ওঠে। এখানকার অধ্যক্ষ তখন আর্থার ভেনিস। বেদান্ত সিদ্ধান্ত মুক্তাবলী নামে একটি বেদান্তগ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন।

১৯১০ সালে আর্থার ভেনিস গোপীনাথকে এম এ ক্লাসে ভর্তি করে নিলেন। এবং এম এ পরীক্ষায় প্রথম হন গোপীনাথ। সে বার এত নম্বর আর কেউ পাননি। লাহৌর ও জয়পুর কলেজ তাঁকে অধ্যাপনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আর্থার ভেনিসের চিন্তা অন্য— “গোপীনাথ, তুমি গবেষণা করো।” এ সব পড়লে এ যুগেও আর্থার ভেনিসের মতো শিক্ষককে ব্রাহ্মণ বলে মনে হয়। বারাণসীর হিন্দু সমাজ জানত, ব্রাহ্মণত্বের পরিচয় পৈতেয় লেখা থাকে না, যজন যাজন ও অধ্যাপনাই তার বৃত্তি।

গোপীনাথের প্রথম গবেষণা সন্দর্ভ ন্যায় বৈশেষিক দর্শনের ইতিহাস। প্রায় ১৫০০ পুঁথি ঘেঁটে লেখা ইতিহাস। সরস্বতী ভবনের দ্বিতীয় জার্নালে বেরোল কুসুমাঞ্জলি বোধনী। উদয়নাচার্যের ন্যায়শাস্ত্র জানতে এই বইয়ের আজও বিকল্প নেই।

অতঃপর এই সিরিজ়েই বেরোয় যোগিনীহৃদয় ও ত্রিপুরারহস্য। শাক্তসাধনার শূন্যস্থানটা এখানেই ধরে দিলেন সম্পাদক। জানালেন, মাধবাচার্য যে তাঁর সর্ব্বদর্শনসংগ্রহ-এ শাক্ত দর্শনের নাম করেননি, তার কারণ অজ্ঞতা নয়। এই দর্শন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। শক্তিপুজোর দর্শন এত দিনে পেল নিজস্ব তত্ত্বভূমি।

তারও পরে ষাটের দশকের শেষে শরীর খারাপ। গৌরীনাথ শাস্ত্রী ও গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের আগ্রহে লিখলেন মাতৃকারহস্য। আজকের হিন্দুত্ব অবশ্য রামমন্দির ছাড়া এই সব তত্ত্বে আগ্রহী নয়। আমবাঙালিও কালীপুজোয় বাজি ফাটানো উচিত না অনুচিত, তার বাইরে বেরোতে নারাজ।

১২ জুন, ১৯৭৬। দীর্ঘ রোগভোগের পর কাশীতে আনন্দময়ী মায়ের হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন বাঙালি সাধক। তার আগে, ১৯৪৭ থেকে ইলাহাবাদ, বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ডি লিট উপাধিতে সম্মানিত করেছে তাঁকে। ফেলোশিপ দিয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটি।

তার পর? মৃত্যুর পর ৪৫ বছরও কাটেনি, এই সাধক ও পণ্ডিত আজ প্রায় বিস্মরণে। নাগপুরি হিন্দুত্বের মোকাবিলা করতে গেলে এই মানুষগুলিকেই আজ প্রধান প্রয়োজন।

Gopinath Kabiraj Life story
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy