নিদর্শন প্রায় নেই। বিক্ষিপ্ত দু’একটি খুঁজেপেতে মেলে। জেলার সাংসদেরা খেলার পরিকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করেছেন, এমন উদাহরণ খুব একটা নেই। অথচ বারবারই বলা হয়, জেলা থেকে খেলোয়াড় তুলতে না পারলে খেলাধুলোর উন্নয়ন করা খুবই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম জেলায় একই ছবি।
ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স যেদিকে তাকানো যায়, ঘাটতি চোখ এড়ায় না। তাহলে কি জেলার ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়াকর্তারা যা আছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট? পরিকাঠামো উন্নয়নে তাঁদের কোনও চাহিদাও নেই? লোকসভা ভোটের ভরা মরসুমে উত্তর খুঁজতে মাঠে মাঠে ঘোরা যেতে পারে।
নির্বাচনের কথা যখন উঠল তখন প্রচারের ভরা মরসুমে প্রতিশ্রুতির দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। তিন জেলায় প্রচারে কোনও দলের প্রার্থীই খেলায় উন্নয়ন নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি। প্রচারে ক্রীড়ার কোনও নামগন্ধ নেই। তবে মাত্র দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রচারের অনুষঙ্গ হিসেবে খেলা এসেছে। এঁদের একজন ঘাটাল কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী মহম্মদ সইফুল। অন্যজন মেদিনীপুরের সিপিআই প্রার্থী বিপ্লব ভট্ট। প্রচারে বেরিয়ে এঁদের মাঠে কিছুটা সময় কাটাতে দেখা গিয়েছে। তবে এই দুই প্রার্থী খেলোয়াড় ছিলেন। একসময় মাঠ দাপিয়ে বেড়াতেন। কিন্তু খেলার পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে কোনও কথা তাঁরা বলেননি।
দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯
অথচ জেলার খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তারা চান, সাংসদেরা সাহায্যের হাত বাড়ান খেলার দিকে। সে কথাই বলছিলেন, ঝাড়গ্রাম মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক অমিত হাজরা জানান, নতুন জেলা হয়েছে ঝাড়গ্রাম। এখানে জঙ্গলমহলের অনেক ছেলে মেয়ে অ্যাথলেটিক্স, ফুটবল ও ক্রিকেটে রাজ্য স্তরে ভাল ফল করেছে। কিন্তু পরিকাঠামো ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অমিতবাবু বলেন, ‘‘আমাদের জেলায় কোনও সুইমিং পুল নেই। সাঁতার শেখার জন্য মেদিনীপুর যেতে হয় ইচ্ছুকদের। রোজ মেদিনীপুরে গিয়ে সাঁতার শেখা সম্ভব নয়।’’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়াম থাকলেও জেলায় কোনও ইন্ডোর স্টেডিয়াম নেই। টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দরকার আছে। জঙ্গলমহলে ছেলে মেয়েদের মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। প্রতি ব্লকে একটি ভাল খেলার মাঠ প্রয়োজন। ব্লকে অ্যাথলেটিক্স ও ফুটবলের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এই জেলা থেকে অনেক ছেলে মেয়ে উঠে আসতে পারবে। অমিতবাবু জানান, ঝাড়গ্রাম জেলা শহরে একমাত্র স্টেডিয়ামটি খেলার প্রাণকেন্দ্র। সেই মাঠেই এর আগে কয়েকবার মুখ্যমন্ত্রীর সভা হয়েছে। মাঠ সংস্কার করার জন্য জেলা প্রসাশনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়ে কয়েক মাস পর মাঠ সংস্কার হয়েছিল। মাঠের দুরবস্থার জন্য মহকুমা ফুটবল লিগ পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সভার কয়েকদিন পরেও মাঠে ব্যারিকেড খোলা হয়নি। মাঠে বাঁশ পড়ে রয়েছে। গোলপোস্ট কেটে সরানো হয়। পরে ঝালাই করে লাগানো হয়। তাতে গোলপোস্টের উচ্চতাও কমে যাচ্ছে। পোস্ট বাঁকা ভাবে ঝালাই করা হয়েছে।
মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক বিনয় দাস মালের অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভাল নয়। বিনয়বাবু জানান, অরবিন্দ স্টেডিয়ামের মাঠ সংস্কারের জন্য মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূলের বিদায়ী সাংসদ সন্ধ্যা রায়ের কাছে আবেদন করেছিলেন। মাঠ সংস্কারের কাজ কে করবে জানতে চাওয়ায় বিনয়বাবু জানিয়েছিলেন পূর্ত দফতরের মাধ্যমে কাজ করা হবে। এর পর অজানা কারণে সাংসদের থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এবারের তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া রাজ্যসভার সাংসদ। জেলা ক্রীড়া সংস্থার অনুষ্ঠানে মেদিনীপুর অরবিন্দ স্টেডিয়ামে মানসবাবু এসেছিলেন। মানসবাবুর কাছে মাঠ সংস্কারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যে চেয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন বিনয়বাবু।
আবার ভোট এল। এবার কী? বিনয়বাবু বলেন, ‘‘জেলার বিভিন্ন মাঠ সংস্কার করার প্রয়োজন। জেলা শহরে একটি মাত্র স্টেডিয়াম হওয়ায় খুবই অসুবিধে হয়। একই মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স মিট করতে সমস্যা হয়। আরেকটি মাঠের প্রয়োজন। মেদিনীপুর শহর লাগোয়া খাস জঙ্গলে ৫ একর ১৪ ডেসিমাল একটি জায়গা ক্রিকেট মাঠ করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই জায়গাটিও পড়ে রয়েছে। জমি হস্তান্তরের কাজ এগোয়নি।’’ তিনি জানান, ঘাটাল স্টেডিয়ামে মিটিং আর মেলার ফলে খেলাটাই বন্ধ হতে বসেছে। মহকুমাগুলোতে আলাদা মাঠ তৈরি হোক, চান তিনি। যেখানে মিটিং, মেলা হবে। তাতে মাঠ অক্ষত থাকবে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সম্পাদক বিপ্লব চক্রবর্তী জানান, পূর্ব মেদিনীপুরে খেলার মাঠে সভা করার প্রবণতা কম। কারণ এখানে সভা করার জন্য অনেক জায়গায় মাঠ নির্দিষ্ট করা আছে। বিপ্লববাবু বলেন, ‘‘খেলার মাঠগুলো সংস্কারের প্রয়োজন আছে। আমাদের জেলায় আরও নতুন মাঠের প্রয়োজন। এ ছাড়া বড় মাঠগুলোতে ডরমেটরির প্রয়োজন আছে। বিভিন্ন খেলার সময় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেলে মেয়েরা খেলতে আসে। তাঁদের থাকার জায়গার প্রয়োজন।’’ তিনি জানান, মাঝে মধ্যে অন্য জেলার দল এই জেলায় খেলতে আসেন। খেলোয়াড়দের হোটেলে রাখতে হয়। ডরমেটরি হলে অনেক সুবিধে হবে। মাঠের ঘাস ভাল রাখার জন্য মাঠে জল দিতে হয়। মাঠের চারপাশে জলের ব্যবস্থা করার জন্য ওয়াটার সিস্টেম প্রয়োজন।
শুধু ক্রীড়া সংগঠকরাই নয়, খেলায় কৃতি ছেলে মেয়েরাও সাংসদদের কাছ থেকে মাঠের জন্য কিছু করার আশা রাখে। মেদিনীপুর সদর ব্লকের চাঁদড়ার বাসিন্দা পিন্টু মাহাতো গত মরসুমে মোহনবাগান ক্লাবে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন। পিন্টু বলেন, ‘‘শুধুমাত্র ফুটবল নয় অন্য খেলাগুলোর জন্য যে ন্যূনতম পরিকাঠামো দরকার, তা নেই। সাংসদের কাছে এটাই অনুরোধ, প্রতিটি খেলার জন্য দাবি অনুযায়ী পরিকাঠামোর পৌঁছে দেওয়া চাই। আমার মনে হয়, এটা করতে পারলে খেলার উন্নতি হবে।’’ ন্যাশনাল ইন্টার ডিস্ট্রিক্ট জুনিয়র অ্যাথলেটিক্স মিটে মেয়েদের লং জাম্প ইভেন্টে সফল হয়েছে গোয়ালতোড়ের হামারগোড়ার মেয়ে দীপশ্রী মুদি। দীপশ্রী বলেন, ‘‘জেলায় মাঠের সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাথলেটিক্সের জন্য। বিভিন্ন দূরত্বের দৌড়ের জন্য সমতল মাঠে অনুশীলন করার প্রয়োজন। উঁচু নিচু মাঠে অনুশীলন করলে চোট লাগার ভয় থাকে। তাই জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধ করব আমাদের জন্য ভাল মাঠের ব্যবস্থা করে দিন। ভাল মাঠে অনুশীলনের জন্য গোয়ালতোড় থেকে মেদিনীপুরে আসতে হয়।’’ অনূর্ধ্ব ১৯ ভারতীয় ক্রিকেট দলে জায়গা পেয়েছে খড়গপুরের করণ লাল। তাঁর মতে, ‘‘খেলার মাঠের অবস্থা একই থেকে যায়। এবারের ভোটে যিনি জিতবেন সেই সাংসদদের উপর অনেক আশা মাঠের লোকেরদের।’’
প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে কী! হিসেব মেলাতে লাগবে পাঁচ বছর।