E-Paper

ভোটমুখী পরিযায়ী

একে তো কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি ইত্যাদি ছাড়াও এই মুহূর্তে ইরান-যুদ্ধহেতু শক্তিসঙ্কটের যুক্তিতে বহু যানবাহনেরই ভাড়া ঊর্ধ্বমুখী। ভিড়ের আতিশয্যও দাম বাড়ার কারণ। কিন্তু ভোটের তারিখ যে-হেতু স্থির, যাত্রীদের সামনে অন্য কোনও তারিখ বেছে নেওয়ার পথ খোলা নেই।

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩০

সব ভোট নয় সমান। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের ভোট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসআইআর-এর কারণে। কেবল বহু লক্ষ লোক বাদ পড়লেন ভোটদানের অধিকার থেকে, এটাই সেই গুরুত্বের পুরো কাহিনি নয়, যাঁরা ভোটার তালিকায় নাম ওঠাতে পারলেন, তাঁদের এক বড় অংশের কাছে এ এমনই এক বিশেষ অধিকার বলে পরিগণিত হচ্ছে, এবং রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই অধিকার ‘ব্যবহার’ করা এত‌ই জরুরি বলে প্রতিভাত হচ্ছে যে, এ বছর যেন ভোটদানের আগ্রহ তুলনামূলক ভাবে বেশি। এই পরিবর্তন বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় পশ্চিমবঙ্গের দরিদ্র, অসচ্ছল সমাজের মধ্যে— যার ইঙ্গিত পরিযায়ী বাঙালি ভোটারদের বাড়ি ফেরার তাড়ায়। বিভিন্ন সংবাদসূত্রে প্রকাশ, মুম্বইয়ের নির্মাণকর্মী থেকে শুরু করে বেঙ্গালুরুর রেস্তরাঁকর্মী, গুজরাতের গহনাশিল্পকর্মী, সকলেই এখন ‘দেশে ফেরা’র প্রচেষ্টায়। মুম্বইয়ের রেল স্টেশনের চেহারাই বলে দিতে পারে, এই বিভ্রান্ত বাড়িমুখী যাত্রার বিরাট ব্যাপ্তি। ভোটে বাড়ি ফেরার সাধারণ প্রথা এ বার যেন ভয় ও অনিশ্চিতের আশঙ্কায় এক অ-সাধারণ কর্তব্য, দায়িত্ব ও অধিকার-সুরক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী কর্মীদের মধ্যেই এই ব্যাকুলতা বিশেষ স্পষ্ট। কর্নাটক থেকে তিন লক্ষেরও বেশি শ্রমিক বাংলামুখী, গুজরাতেও একই ঘটনা।

অথচ টিকিটের লভ্যতা অনেকাংশে কম। একে তো কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি ইত্যাদি ছাড়াও এই মুহূর্তে ইরান-যুদ্ধহেতু শক্তিসঙ্কটের যুক্তিতে বহু যানবাহনেরই ভাড়া ঊর্ধ্বমুখী। ভিড়ের আতিশয্যও দাম বাড়ার কারণ। কিন্তু ভোটের তারিখ যে-হেতু স্থির, যাত্রীদের সামনে অন্য কোনও তারিখ বেছে নেওয়ার পথ খোলা নেই। ফলে গৃহমুখী মানুষের অধিকাংশই সঙ্কটাপন্ন অত্যধিক ভাড়ার কারণে, কিংবা টিকিট না-মেলার কারণে। শোনা যাচ্ছে, ভোট কাছে এলে বেশ কয়েকটি স্পেশাল ট্রেন চালানো হবে। বাস্তবিক, এ একটি গুরুতর ভাবনার বিষয়। ভোটদানেচ্ছু পরিযায়ীদের ফেরানোর কোনও দায়িত্ব সরকার নিতে পারে কি না, নিলে কতখানি, কিংবা নিলে কোন সরকার, রাজ্য না কেন্দ্র। বিধানসভা ভোট যখন, রাজ্যের দায়গ্রহণের পিছনে যুক্তি আছে। তবে রেলওয়ের ভাড়ার বিষয়টি যে-হেতু কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীন, উল্টো প্রশ্নও ওঠে। অথচ সাধারণত দেখা যায়, যতটুকু ব্যবস্থা করা হয়, সবটাই দলীয় ভিত্তিতে। এ বারেই যেমন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের জনৈক মুখপাত্রের মতে, তাঁরা শ্রমিকদের আনার চেষ্টা করছেন কিন্তু আশঙ্কা করছেন কেন্দ্রীয় শাসক দল তাতে বাধা দিতে পারে। বিহারের ভোটের ক্ষেত্রে এও শোনা গিয়েছে যে কোনও ‘সচ্ছল’ দল বিশেষ ব্যবস্থা করে পরিযায়ীদের বাইরে থেকে নিয়ে আসছে, এমনকি উৎসাহভাতাও দিচ্ছে, অন্য দিকে তুলনায় অ-সচ্ছল দলগুলি তা পারছে না।

এ সব রাজনৈতিক তরজা চিরবহমান। এ সবের উপরে একটিই কথা— রাষ্ট্রিক ব্যাপারে বাধ্যতার জন্য যে বিপুল খরচ এই স্বল্পসঙ্গতির মানুষদের পোহাতে হয়, নৈতিকতার দৃষ্টিতে তা সমগ্রত কিংবা অন্তত অংশত রাষ্ট্রেরই বহন করা উচিত। এ কোনও একটি রাজ্যের স্বার্থে নয়, কোনও বিশেষ দলের স্বার্থে তো নয়ই। ভারতের এক বিপুলায়তন পরিযায়ী সমাজের কথা ভেবে এই বিষয়টি রাজনৈতিক সমাজ যথাযোগ্য গুরুত্বে তুলে ধরবে, এই আশা রইল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election Migrant Workers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy