E-Paper

জলবৃদ্ধি

গঙ্গার উৎপত্তি হিমবাহ থেকে হলেও আড়াই হাজার কিলোমিটারেরও অধিক বিস্তৃত গতিপথটিকে পুষ্ট রাখার গুরুদায়িত্ব মূলত ভূগর্ভস্থ জলের। কয়েক মাস পূর্বে আইআইটি রুড়কি-র গবেষকদের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছিল, ভূগর্ভস্থ জলভান্ডার গঙ্গার মধ্যপথে জলের পরিমাণ প্রায় ১২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে।

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৬:১০

ঘোর অন্ধকারে এক চিলতে আলোর রেখা। ‘জীবনরেখা’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। কারণ, তা ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার জলস্তর বিষয়ক। উষ্ণায়নের ধাক্কায় যখন বিশ্বের প্রধান নদীগুলির স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ক্রমশ কমে আসছে, উৎস থেকে মোহনায় মেশার পরিচিত পথটি মাঝপথেই খেই হারাচ্ছে, তখন গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধির খবর মিলেছে। এবং এই জলস্তর বৃদ্ধির হিসাব-খাতাটি আলো করে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ জল পর্ষদের পেশ করা রিপোর্ট বলছে, পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় অংশে ভূগর্ভস্থ জলস্তরের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার অপর গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য বিহারও জলস্তর বৃদ্ধির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ৬৪২টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৪৭১টি কেন্দ্রেরই জলস্তরের বৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ৭৩.৪ শতাংশ। বিহারে এই হার ৫৫.৭ শতাংশ।

গঙ্গার উৎপত্তি হিমবাহ থেকে হলেও আড়াই হাজার কিলোমিটারেরও অধিক বিস্তৃত গতিপথটিকে পুষ্ট রাখার গুরুদায়িত্ব মূলত ভূগর্ভস্থ জলের। কয়েক মাস পূর্বে আইআইটি রুড়কি-র গবেষকদের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছিল, ভূগর্ভস্থ জলভান্ডার গঙ্গার মধ্যপথে জলের পরিমাণ প্রায় ১২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে। ভূগর্ভস্থ জলভান্ডারের এই অকুণ্ঠ সাহায্য ছাড়া গ্রীষ্মের দিনগুলিতে গঙ্গার জলপ্রবাহ ধরে রাখা কঠিন হত। উল্লেখ্য, নদীর এই মধ্য এবং নিম্ন অববাহিকা অঞ্চল ভারতের কৃষি ও শিল্প মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত। সুতরাং, নদীর স্বার্থে, নদী সংলগ্ন বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, এবং অন্তত ৪০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে গঙ্গা এবং ভূগর্ভস্থ জলের আদানপ্রদান প্রক্রিয়াকে অটুট রাখা জরুরি। স্বস্তি এটাই যে, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ২০০৪ সাল এবং ২০২৪ সালের মানচিত্র বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কর্তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, গত দুই দশকে এই আদানপ্রদানে কোনও বিরাট নেতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে স্বস্তি আরও এক দিকে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট, রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলই জল উত্তোলনের ক্ষেত্রে ‘নিরাপদ’। কৃষিকাজ ও পানীয় জলের জন্য গঙ্গা ও ভূগর্ভস্থ জলভান্ডারের উপর নির্ভরশীল রাজ্যবাসীদের এই তথ্য খানিক আশ্বস্ত করে।

কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। কারণ, প্রকৃতি যে নদীকে পরিপুষ্ট করেছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় বার করেছে, মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ তাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত। দুই পাড়ের জমি দখল করে বেআইনি নির্মাণ, অবৈধ বালি খাদান, অবাধে বর্জ্য জলের নদীতে এসে মেশা— তার সামান্য কিছু নিদর্শন। তদুপরি, নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যে হারে ভূগর্ভস্থ জলের উত্তোলন বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে নদী ও ভূগর্ভস্থ জলের আদানপ্রদানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ধরে রাখার বিষয়টি অনেক কিছুর উপর নির্ভরশীল। এবং প্রত্যেকটি কোনও না কোনও ভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। একটি বিপন্ন হলে তার ধাক্কায় সমগ্র প্রক্রিয়াটি বিপর্যস্ত হতে পারে। সেই বিপদ যাতে ঘনিয়ে না আসে, তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় এবং নাগরিক দায়িত্বটিও এই রিপোর্ট মনে করিয়ে দিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ground Water Water Level Central Ground Water Board

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy