লজ্জার গ্রাস আরও এক বার। গ্রাসে গোটা একটা থানা। প্রশ্নের মুখে গোটা পুলিশ বিভাগের দার্ঢ্য। 

ফাইলের আড়ালে বা টেবিলের তলায় লুকিয়ে কলকাতা পুলিশের মাথা বাঁচানোর চেষ্টা কয়েক বছর আগেই ছিছিক্কার ফেলেছিল জনমানসে। দলদাসত্ব এবং মেরুদন্ডহীনতার আখ্যান পুলিশের ভাবমূর্তিকে অসীম অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল। সে ধারণা কখনও বদলাবে, পুলিশ কখনও নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সচেষ্ট হবে, এই রকম কিছু ভাবতেই হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিক। 

কিন্তু সম্প্রতি সে ধারণায় বদল আসতে শুরু করেছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই। কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে আসীন হয়েই অনুজ শর্মা বেশ কয়েকটা ক্ষেত্রে কাঠিন্যের পরিচয় দিতে শুরু করেছিলেন। উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের হাতে মধ্যরাতের রাজপথে কোনও মহিলার হেনস্থার ঘটনায় হোক, পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগে হোক, হেলমেট বিধির তোয়াক্কা না করা বাইকবাজদের শাসনে আনার প্রশ্নে হোক— বার বার স্বকীয়তার পরিচয় দিচ্ছিলেন অনুজ। চমকেও দিচ্ছিলেন অতএব।

নতুন কমিশনারের হাত ধরে ধারণাটা যখন পাল্টাতে শুরু করেছে সবে, ঠিক তখনই যেন গ্রহণ লাগল আবার। দুষ্কৃতী তাণ্ডব এবং চূড়ান্ত বেআইনি কার্যকলাপের মুখে চরম অপদার্থতার পরিচয় দিল টালিগঞ্জ থানার পুলিশ। প্রকাশ্যে মদ্যপানের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল কয়েকজনকে। খবর পেয়েই চেতলা এলাকা থেকে জনা চল্লিশেক হাজির হল থানায়। তুমুল তাণ্ডবের মুখে অভিযুক্তদের ছেড়ে দিল পুলিশ। তার পরেও আবার ফিরে এল হামলাকারীরা, এ বার আরও বড় সংখ্যায়। থানায় আরও বেশি তাণ্ডব চালিয়ে, পুলিশকর্মীদের বেপরোয়া মারধর করে প্রায় বিনা বাধায় আক্রোশ মেটাল। টালিগঞ্জ থানার পুলিশকর্মীরা ঠুঁটো হয়ে রইলেন, তাণ্ডব সইলেন, মারধর হজম করলেন।

ম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

কেন এই ভূমিকা পুলিশের? কেন তাণ্ডবকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ রবিবার রাতে করতে পারল না পুলিশ? কারণ হামলাকারীরা এ রাজ্যের শাসক দলের এক শীর্ষ নেতার ‘পাড়ার লোকজন’। না, পুলিশ এ কথা বলেনি। লজ্জাজনক ঘটনাটার কারণ খোঁজার চেষ্টা হতেই এই তত্ত্ব উঠে আসছে স্থানীয় সূত্রে। দলদাসত্ব কোন পর্যায়ে পৌঁছলে, গোটা বিভাগের মনোবল কতটা তলানিতে নামলে, মেরুদণ্ডটা কোন মাত্রায় চুরমার হয়ে গেলে একটা বাহিনীর শীর্ষপদাধিকারী পর্যাপ্ত দার্ঢ্য দেখানো সত্ত্বেও বাহিনীর নীচুতলার কর্মীরা এতখানি হীনবল এবং হতমান দশায় দিন কাটান, তা ভাবলে স্তম্ভিত হতে হয়।

রাত পোহাতেই আবার ছি-ছি রব উঠেছে শহর জুড়ে, রাজ্য জুড়ে। তৎক্ষণাৎ তার মোকাবিলার চেষ্টাও শুরু হয়েছে। পুলিশ কমিশনার আবার সক্রিয় হয়েছেন, গোটা বাহিনী নড়েচড়ে বসেছে, কঠোর পদক্ষেপ করা হচ্ছে। কমিশনারের এই ভূমিকা সংশাযোগ্য। কিন্তু কমিশনারকে এটাও বুঝতে হবে যে, নিজের বাহিনীর মনোবলকে এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারেননি তিনি। বছরের পর বছর ধরে যে কর্তব্যপরায়ণতার বিনির্মাণ ঘটানো হয়েছে, ক্ষমতাসীনের অযৌক্তিক দাপটের সামনে মিইয়ে থাকার অভ্যাস যে ভাবে মজ্জাগত হয়ে উঠেছে, তার নিরাময় মাত্র কয়েক মাসে ঘটানো খুব সহজ নয় ঠিকই। কিন্তু নাগরিকের প্রত্যাশা যখন বাড়িয়েছেন সামান্য হলেও, তখন আর পিছু হঠা উচিত হবে না। অবস্থানে অটল থেকে এই লজ্জাজনক ঘটনার বিহিত করা যে অত্যন্ত জরুরি, তা পুলিশ কমিশনার বুঝছেন আশা করি।

আরও পড়ুন: টালিগঞ্জ থানায় ঢুকে জনতার তাণ্ডব, আবারও জুজু পুলিশকে দেখল কলকাতা

লজ্জাটা যত না পুলিশের, তার চেয়ে বেশি হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের। সুশাসন বা ভাল কাজের যাবতীয় কৃতিত্ব যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুকুটে নতুন নতুন পালক হিসেবে শোভা পায়, তা হলে প্রশাসনের এই চরম অপদার্থতার লজ্জাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের লজ্জা হিসেবেই পরিগণিত হওয়া উচিত। আর পুলিশি ব্যবস্থার এই করুণ দশাটার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী যে আমাদের রাজনীতিকরাই, তা নিয়ে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যমত্য রয়েছে। লজ্জায় মুখ ছাকা উচিত কাদের আজ, তা তাঁরা নিজেরাই বুঝে নিন।