• স্নেহাশিস সুর
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘বুকের পাঁজর পুড়িয়ে দিলে’

Tagore

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রভৃতি নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে। কিন্তু দেশের আন্দোলনে কবির প্রত্যক্ষ যোগদানের কথা যদি বলতে হয় তা হলে দুটি বিষয়ের উল্লেখ করতেই হবে— বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তাঁর যোগদান, এবং জালিওয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড পরিত্যাগ। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কবি গান রচনা করেন, পথে নামেন, প্রত্যক্ষ প্রতিবাদে সামিল হন। আর জালিওয়ানওয়ালা বাগে নিরস্ত্র, নিরীহ মানুষের ওপর ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর নির্বিচার গুলিচালনার প্রতিবাদে তিনি নাইটহুড পরিত্যাগ করেন। জালিয়ানওয়ালা বাগের ভয়াবহ ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়েছিলেন এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের ক্ষেত্রে একেবারে একা হয়ে পড়েছিলেন। নাইটহুড পরিত্যাগ ও তার আগে-পরে যে সব ঘটনা ঘটে, তার শতবর্ষ পূর্তিতে (৩১ মে, ১৯১৯ তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ) তা ফিরে দেখা প্রয়োজন।

১৯১৯ সালের ২১ মার্চ দেশে রাওলাট আইন পাশ হয়। এই দমনমূলক আইনের প্রতিবাদে মহাত্মা গাঁধী সত্যাগ্রহ শুরু করেন। ৫ এপ্রিল গাঁধী গুরুদেবের সমর্থন চেয়ে একটি চিঠি দেন। ১২ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ তার উত্তরে সত্যাগ্রহের সমর্থনে চিঠি লেখেন। অন্য দিকে গাঁধী রাওলাট সত্যাগ্রহ প্রত্যাহার করেন এবং এ সময়ে সত্যাগ্রহের ডাক দেওয়াকে ‘হিমালয় প্রমাণ ভুল’ বলে ঘোষণা করেন।

জালিওয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। অমৃতসরের এই বাগানে সেই বৈশাখী উৎসবের দিন প্রায় বারো হাজার নাগরিক  এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভায় যোগ দেন। সেখানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার পঞ্চাশ জন সৈন্যকে দিয়ে নির্বিচারে সেই নিরস্ত্র মানুষদের ওপর গুলি বর্ষণ করেন। 

রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে। দমনমূলক আইনের জন্য কোনও খবরাখবর আসছিল না। কবি কিন্তু নানা লোকের মাধ্যমে কিছু কিছু খবর পাচ্ছিলেন। ২২ মে, ১৯১৯— কবি তাঁর স্নেহের রাণুকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘‘আকাশের এই প্রতাপ আমি এক রকম সইতে পারি কিন্তু মর্ত্ত্যের প্রতাপ আর সহ্য হয় না। তোমরা তো পাঞ্জাবেই আছ, পাঞ্জাবের দুঃখের খবর বোধহয় পাও। এই দুঃখের তাপ আমার বুকের পাঁজর পুড়িয়ে দিলে।” জালিওয়ানওয়ালা বাগের ঘটনায় কবি যে কতটা ব্যথিত হয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরে কবি বলেছেন, ‘‘শুনে যে কি প্রবল কষ্ট, অসহ্য কষ্ট হয়েছিল, তা আজও মনে করতে পারি। কেবল মনে হতে লাগল এর কোন উপায় নেই? কোন প্রতিকার নেই? কোন উত্তর দিতে পারব না? কিছুই করতে পারব না? এও যদি নীরবে সইতে হয়, তাহলে জীবনধারণ যে অসম্ভব হয়ে উঠবে।” (মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, মৈত্রেয়ী দেবী)

গুরুদেব চাইলেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক প্রতিবাদ হোক। তিনি প্রস্তাব করলেন গাঁধীজি আর গুরুদেব একসঙ্গে পাঞ্জাবে যাবার চেষ্টা করবেন। এই প্রস্তাব করে কবি দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ়কে গাঁধীর কাছে পাঠালেন। নিজে গেলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে একটি বড় প্রতিবাদ সভা ডাকার প্রস্তাব নিয়ে। দেশবন্ধু রাজি হলেন না। অন্য দিকে অ্যান্ড্রুজ় ফিরে এসে জানালেন যে গাঁধীজি পঞ্জাবে যেতে আগ্রহী নন। কবি অত্যন্ত ভেঙে পড়লেন। এ সময়ে তাঁর প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে পরের দিন জোড়াসাঁকো আসতে কবি নিষেধ করলেন। তবে এতে মহলানবিশ এতটাই অবাক হলেন যে পর দিন ৩১ মে ভোরবেলাই জোড়াসাঁকো পৌঁছে গেলেন।

গিয়ে দেখলেন, কবি বসার ঘরে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তখনও লিখে চলেছেন। বুঝতে অসুবিধে হল না যে কবি সারা রাত জেগেই লিখছিলেন। লেখা শেষ করে একখানি কাগজ মহলানবিশকে দিলেন। সেটাই নাইটহুড পরিত্যাগ করে ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠি। এমন সময় এলেন দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ়। কবি তাঁকে নির্দেশ দিলেন চিঠিটি টেলিগ্রাম করে তৎক্ষণাৎ ভাইসরয়কে পাঠাতে আর চিঠির প্রতিলিপি খবরের কাগজগুলিতে পাঠাতে। অ্যান্ড্রুজ় চিঠিটা পড়ে গুরুদেবকে এক বার বললেন, ভাষাটা একটু হালকা করা যায় না? পরে অ্যান্ড্রুজ় বলেছেন, এ কথা শুনে গুরুদেব এমন কড়া চোখে তাকালেন যে সে ভাবে আর কখনও তাকাননি। অ্যান্ড্রুজ় সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়লেন।

গাঁধীজি রাওলাট আইনের বিরোধিতা করলেও গুরুদেবের নাইটহুড পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেননি। একে ‘সময়ের আগে নেওয়া’ (প্রিম্যাচিওর) বলে মন্তব্য করেন। ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে অমৃতসরে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির যে অধিবেশন বসে, তাতে রবীন্দ্রনাথের এই কাজের জন্য তাঁকে অভিনন্দিত করে কোনও প্রস্তাব গ্রহণ করানো যায়নি। তবে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় দলের আর একটি অধিবেশনে সভাপতি লালা লাজপত রায় তাঁর ভাষণে গুরুদেবের ওই চিঠিকে সমস্ত ভারতীয়ের আত্মমর্যাদার প্রতীক বলে বর্ণনা করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের বর্ষপূর্তিতে মহম্মদ আলি জিন্নার সভাপতিত্বে বম্বেতে অনুষ্ঠিত সভায় রবীন্দ্রনাথের লিখিত ভাষণে প্রতিবাদের ভাষা মূল চিঠির চেয়ে কিছু কম জোরােলা ছিল না। ১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন ইউরোপ ও আমেরিকা যান, তখন ব্রিটেনের রাজকবি রবার্ট ব্রিজেস-সহ কবির বহু বিশিষ্ট পরিচিত ব্যক্তি তাঁর সভা বয়কট করেন। জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের বিচার-বিভাগীয় তদন্তে যে হান্টার কমিশন ব্রিটিশ সরকার গঠন করে, তার বিচারপদ্ধতিও কবি মেনে নিতে পারেননি। শুধু নাইটহুড বর্জনেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ শেষ হয়নি। জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড তাঁকে গভীর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পরও দীর্ঘ সময় ধরে রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে থাকে, নানা ভাবে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন