Advertisement
E-Paper

নয়পল যেন স্বয়ম্ভূ

মৃত্যু এই প্রশ্নটাকেই সামনে এনে দিল। আর সাক্ষাৎকার হবে না। আর বইয়ের বাইরের কথা শুনতে হবে না। আর আফ্রিকা-বিদ্বেষ, ইসলাম-বিদ্বেষ ওগরানো হবে না। ঔপনিবেশিক মানসিকতার শিকার বলে ভারতীয়দের বকুনি খেতে হবে না। তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের ‘সীমাবদ্ধ’ বলে হেয় করা হবে না। বাঙালিকে অহংসর্বস্ব বলে ঠাট্টা করা হবে না। ‘‘আমার সময় দেওয়ার মতো যোগ্য নয়’’ বলে মহিলাদের অবজ্ঞা করা হবে না।— কী পড়ে রইল?

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৪ অগস্ট ২০১৮ ০০:০০
বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নয়পল।

বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নয়পল।

চলে গেলেন ভি এস নয়পল। বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নয়পল লেখা যেত, কিন্তু লিখতে সাহস হয় না। ভয়ানক রেগে যেতেন বৃদ্ধ। স্যর ভিদিয়া বললে অবশ্য ততটা বিরক্ত হতেন না। মোট কথা, গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালি ঠিক যে রকম মেজাজ অপছন্দ করে, সেই রকম একটা মেজাজ ছিল তাঁর। আপাদমস্তক ঠোঁটকাটা মানুষ যিনি নীরদ চৌধুরীর আত্মজীবনীর প্রশংসায় ভাষা খুঁজে পান না। পূর্ব-পশ্চিমের মোলাকাতের অমন একখানা মরমি আখ্যান আর না কি কেউ লিখতে পারবে না। ষাটের দশকের কলকাতা দেখতে গিয়ে দেখেন কেবল বক্সওয়ালা সংস্কৃতি, শহরটা আর তার মানুষগুলোর অসহায় এবং ফাঁপা অতীত গৌরবচর্চা। অথচ সত্যজিৎ রায়ের কাজের বড়সড় গুণগ্রাহী। অর্থাৎ নয়পল বিস্ফোরক। মানুষটাকে ভালবাসা সহজ নয় একেবারেই। কিন্তু তাঁঁর লেখা?

মৃত্যু এই প্রশ্নটাকেই সামনে এনে দিল। আর সাক্ষাৎকার হবে না। আর বইয়ের বাইরের কথা শুনতে হবে না। আর আফ্রিকা-বিদ্বেষ, ইসলাম-বিদ্বেষ ওগরানো হবে না। ঔপনিবেশিক মানসিকতার শিকার বলে ভারতীয়দের বকুনি খেতে হবে না। তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের ‘সীমাবদ্ধ’ বলে হেয় করা হবে না। বাঙালিকে অহংসর্বস্ব বলে ঠাট্টা করা হবে না। ‘‘আমার সময় দেওয়ার মতো যোগ্য নয়’’ বলে মহিলাদের অবজ্ঞা করা হবে না।— কী পড়ে রইল?

আমরা এ বারে কিসের সঙ্গে ছায়া যুদ্ধ করব? কেবল মানুষটার প্রকাশিত লেখা, না কি মুখের কথাগুলো? মেধা, না কি আত্মম্ভরিতা? মনন না মেজাজ? দেখার চোখ, না কি বেপরোয়া আত্মবিশ্বাস? সাহিত্যে নোবেল না কি স্ববিরোধিতা? আরও একটা বড় প্রশ্ন রয়েছে। এক জন গুণী লেখককে কি সর্বগ্রাহ্য এবং সর্বপ্রিয় হতেই হবে? কেন? নইলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়?

মৃত্যু এই রূঢ় প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সময়। মৃত্যু ‘লেগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকারের কথা আনে। একটা মানুষ কী রেখে গেল? উত্তরাধিকার অনেক সময় এমন একটা অধিকারের কথা বলে যেটা বংশধররা এমনি এমনি পায়। কিন্তু ‘লেগ্যাসি’ বলতে আরও বড় একটা উত্তরাধিকার বোঝায়, বোঝায় একটা মানুষের সারা জীবনের অর্জনের উত্তরাধিকার। সেই দিক দিয়ে ভাবলে, কী ‘লেগ্যাসি’ রেখে গেলেন নয়পল?

জন্ম ১৯৩২। বাবা ছোটখাটো সাংবাদিক ছিলেন, প্রায় পুরোটাই স্বশিক্ষিত। ইনিই ১৯৬১ সালের মিস্টার বিশ্বাস। কাল্পনিকতায় মুড়ে বাবার কথাই লিখেছেন আ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস-এ। সে বই এক মস্ত ইতিহাস। ছোট ছোট বাক্য, বড় বড় উপলব্ধি। বার বার পড়লেও তার ব্যাপ্তি এতটুকু কমে না। প্রতিটি পাঠে নতুন নতুন অন্তর্দৃষ্টি। পূর্ব-ইতিহাস ভারতের। দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিক ভাবে অবলুপ্তির পরে সৃষ্ট এক মেকি স্বাধীন দাসত্বের তাড়নে বিহার থেকে পূর্বপুরুষের ত্রিনিদাদ অভিবাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরাশ্রয় শেকড়ের খোঁজ। বাবার দুঃসাহসী স্ব-সন্ধান। বাড়ি তো কেবল ইটকাঠপাথরের একটা কাঠামোই নয়। বাড়ি একটা নিশ্চিত আশ্রয়। একটা আত্ম-র অর্জন। একটা আত্মীয়তা। এক এক করে ছোট ছোট উত্তরণের আখ্যান। লোকটাকে সকলে অবজ্ঞা করে, খেয়ালি পাগল ভাবে। পরিবার পরিজন হাসে। কিন্তু বাড়ি তার সন্ধান। বাড়ি তাকে বানাতেই হবে। বাড়িটা আসল নয়। বাড়ি বানানোর গল্পটাই আসল।

ছোটবেলা থেকেই বই বিদ্যাধরের চিরসঙ্গী। বিদ্যাধরকে স্মৃতিধরও হতে হবে। নিজেকেই নিজে হোমওয়ার্ক দিত সেই বালক। যেখানে যখন যার সঙ্গে দেখা হবে সেই দেখার সবটুকু মনে রেখে লিখে ফেলতে হবে। এত ছোট ছেলে এতটা কি করতে পারে? এমনই অসম্ভব সব লক্ষ্য উদ্ধত, আত্মগর্বী ছোট ছেলেটির। পুঁচকে ত্রিনিদাদের মাঝারি গোছের সাংবাদিকের ছেলে বিশ্ববিখ্যাত লেখক হবে। হতেই হবে তাকে। নয়পল এক অর্থে স্বয়ম্ভূ। তবে তিনি একাই এমন নন। সি এল আর জেমস-এর বিয়ন্ড আ বাউন্ডারি আর নীরদবাবুর আত্মজীবনীতেও এমনটা পাই। পাই ভীমরাও অম্বেডকরের জীবনেও। উদ্ধত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আধুনিক উদারবাদী মননের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। এ যেন একটা দুর্ঘটনা। কোটিতে একটা ঘটে।

এমনই কি চলতে পারে? না। তাই অক্সফোর্ডে বিপর্যয়। বছর দেড়েক টানা অবসাদ। দ্বিতীয় শ্রেণির সাহিত্যের ডিগ্রি। এক জন টিউটর পরে বলেছিলেন যে ‘‘আমরা যে ওকে দ্বিতীয় শ্রেণির ডিগ্রি দিয়েছিলাম তার জন্য বোধ হয় ও আমাদের কখনও ক্ষমা করেনি।’’ পরে বহু সাক্ষাৎকারে বড়াই করে বলতেন, একটা দ্বিতীয় শ্রেণির ডিগ্রি, বুঝলে ভায়া? অক্সফোর্ড কী করে চিনবে অসম্ভব সেই স্ব-সন্ধান?

তার পর খানিক সংগ্রাম। দুটো আশ্চর্য উপন্যাস। এক বন্ধু ইতিহাসবিদ বলছিলেন ওই দুটো উপন্যাস তাঁর দেখার চোখ বদলে দেয়। তবে সমালোচক তথা পাঠকের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি ওই মিস্টার বিশ্বাসেই প্রথম। ১৯৬১। ইভলিন ওয় প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দু’দিন আগে এডিনবরা ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপক ফেসবুকে লিখেছেন যে নয়পলের আ বেন্ড ইন দ্য রিভার ওঁর ভাল লাগে না। তবে কিনা, নয়পল পড়ার আগে ইংরেজি ভাষাটা যে কতখানি বহুভাষী, সেটা উনি বুঝতে পারেননি। রুশদির ‘চাটনিফিকেশন’ নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নেই। কিন্তু ত্রিনিদাদের অভিবাসী ভারতীয় তথা কালো মানুষগুলোর মেঠো এবং ঘরোয়া বুলি নয়পল যে ভাবে ইংরেজিতে ধরেছেন, তার যথেষ্ট গুণগ্রহণ আমরা কতটা করলাম? ১৯৫৭ বা ১৯৬১ মানে ১৯৮১-র এক প্রজন্ম আগে। তখন নয়পলের ত্রিশও হয়নি।

ত্রিশেই খ্যাতি এল। কিন্তু স্বাধীনতা কই? সেই সশরীরী উদারবাদী সবিশ্ব ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কী ভাবে পরিণতি পাবে? তাই সত্তরের দশকে এক সাক্ষাৎকারীকে বললেন যে আমি ঠিক করেছি কারও জন্য কাজ করব না, ওটা দাসত্ব। আবার দেখি সেই নীরদবাবু, সিএলআর এবং অম্বেডকরের ভূত ঘাড়ে। জেদি, একরোখা, নিজের ভগবত্ত্বে অটল আস্থা। ইতিমধ্যে ভারতে আসা, শেকড়ের সন্ধানে।

ভারত নিয়ে সব মিলিয়ে তিনটে বই, অনেকে তাকে ট্রিলজি বা তিনগ্রন্থি বলেন। অন্ধকার এক দেশ, আহত এক সভ্যতা এবং এক অযুত বিদ্রোহ; এই তাদের নামের আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ। মনে হয়, হয়তো প্রথমেই তিনটে বই লেখার ইচ্ছে বা পরিকল্পনা ছিল না। তবে তিনগ্রন্থি হিসেবে পাঠ একটা করাই যায়। সেটা সহজ, সরলও। তবে গবেষকরা সে ভাবে পুরোটা পড়েন না। তিনটে বই একটা তত্ত্বের ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে বিচার করে না। করলেও সেটা একটা উত্তরণের সন্ধানে হতাশার আখ্যান, নিজেদের অবিশ্বাস করতে থাকা বিরাট বড় একটা স্থান আর তার মানুষের নির্বিচার স্বসঙ্কোচন। আগে ভারত দেখেননি, সেখানে থাকেননি। কল্পনায় ছিল, একটা হাজার বছরের বিমূর্ত সভ্যতা। ক’মাস ভারতে ঘুরে বেড়িয়ে সেই বিমূর্ত কল্পনা হতাশায় ভাঙে। তার পর এক রাশ রাগ আর অভিমানে তার প্রকাশ হয়।

কিন্তু নিজের কল্পনায় অটল বিশ্বাস। ভুল দেখলেন এমন কি হতে পারে? তাই আরও দু’বার ফেরা, আরও গাড়ি করে গ্রাম শহর ঘোরা। উত্তরণের একটা সূত্র খোঁজা। এ বার ঠিক পেয়েছেন। ভারত নিয়ে ষাটের দশকের লেখা আর ২০০২-এর লেখার মধ্যে অনেক তফাত। বিরাট একটা শিল্পবিপ্লব চলছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইংরেজের নকলনবিশিতে নেশাখোর। এই তাঁর অভিমান।

খামতি অনেক। ভারতীয় কোনও ভাষা শেখার চেষ্টা কখনও করেছেন বলে জানা নেই। দীর্ঘ দিন বাসও করেননি। মনে করতেন, উনিশ শতকের উদারবাদী চিন্তার মহত্ত্ব হচ্ছে— একটা সবিশ্ব দেখার দূরবিন-চোখ দিয়ে ব্যক্তিমানুষকে একটা অতিব্যক্তিক সত্তা দিতে পারা। পর্যবেক্ষকের লেখনী হচ্ছে সেই সত্যান্বেষী সত্তা তথা স্বত্ব। আজ এই একুশ শতকের উত্তর-উপনিবেশী চিন্তাধারাদৃত বাংলায় দাঁড়িয়ে বলাই যায়, সেটা ছিল অসম্ভব এক কষ্টকল্পনা। আজকে দাঁড়িয়ে চিরন্তনের বিচার। আর এই ঔদ্ধত্যই হচ্ছে উনিশ শতকের উদারবাদী সবিশ্ব পর্যবেক্ষক সমীক্ষকের সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকল্প।

এটাই নয়পল। নিজের দেবমানবত্বে অটল বিশ্বাসী। শেষ কথা এটাই— যে যতই শিক্ষার বড়াই করুন, নয়পল না পড়লে শিক্ষা শেষ হয়নি। যদি তাতে আপনার কিছু এসে না যায়, জানবেন সেটাই নয়পলের ‘লেগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার। তবে কাজটা জেনেবুঝে করলেন, না কি দম্ভের অসার দাসত্বে করলেন, সেটা পরিষ্কার হলেই হল।

কর্ণাবতী ইউনিভার্সিটি,

আমদাবাদে ইতিহাসের শিক্ষক

Death V.S. Naipaul ভি এস নয়পল
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy