ইদানীং আমাদের চার পাশে বাচ্চাদের নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা চলছে। আমরা বড়রা আজকালকার কিশোরকিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যৎপরোনাস্তি উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ সব সময় অন্যায্যও নয়। আবেশ দাশগুপ্ত অথবা মন্দারমণির তটভূমিতে মোটর রেস করতে গিয়ে মৃত তিন সদ্য-যুবকের ঘটনা মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজকে খুব বিচলিত করেছে। সব সময় মৃত্যু পর্যন্ত না গড়ালেও, আজকের দিনের কিশোরকিশোরী কিংবা সদ্য যুবকযুবতীদের চালচলন নিয়ে বড়দের নানা রকম অস্বস্তি রয়েছে। আজকের মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে অভিযোগ, তারা অবাধ্য, অসভ্য, বেপরোয়া। তারা দু’হাতে নিজেদের ফুর্তির পিছনে টাকা খরচা করে। ছেলেমেয়েদের মেলামেশা লাগামছাড়া, মেয়েদের পোশাক নাকি এতই অশালীন যে চোখে দেখা যায় না! বাড়ির যথেষ্ট শাসনের অভাবেই নাকি বাচ্চারা বয়ে যায়, ইত্যাদি, প্রভৃতি। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? আহ্লাদে ছোটরা নষ্ট হয়, না কি বঞ্চনায়? নির্দিষ্ট ভাবে, মানবাধিকারের বঞ্চনায়?
ছোটদের মানবাধিকার? শিশু-কিশোরদের অধিকার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব আ চাইল্ড’ নামক মানবাধিকার চুক্তিটি কার্যকর হয় ১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত এই চুক্তি সই করে। এই চুক্তির ১২ এবং ১৩ নম্বর ধারা অনুসারে, ১৮ বছরের কমবয়সি মানুষজনের নিজের জীবনের যে-কোনও ব্যাপারে মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। এই চুক্তিতে পরিষ্কার বলা আছে যে, ১৮-র নীচে মানুষের মতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের বক্তব্য শুনতে হবে।
আমাদের সমাজে চালু শব্দ হল: ছোটরা দুধভাত, এলেবেলে। এলেবেলেদের কথা শোনার কোনও প্রয়োজন নেই। আমরা ছোটদের কথায় আমল দিই না। আমাদের সংস্কৃতি শেখায়, বাচ্চার কোনও মতামত থাকতে নেই। বাবা-মা’র মতই নাবালক সন্তানের মত। দুই দশক আগে পর্যন্ত আমরা বাচ্চাকে বড় করতাম সরাসরি নিষেধের বেড়াজালে। আমরা যারা ষাট বা সত্তরের দশকে জাত, এমনকী আশির দশকেও যাঁরা বড় হয়েছেন, সচরাচর তাঁদের বাল্য, কৈশোর, এমনকী যৌবন-শুরুর দিনগুলোও কেটেছে না-এর আবহে। হিন্দি সিনেমা? না! গরমের দুপুরে রাস্তার কুলপি মালাই? না! বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে রাত্রিযাপন? প্রশ্নই ওঠে না, বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে। আরও কত না, না, না! এ সব চোখরাঙানি না মানলেই প্রহারেণ ধনঞ্জয়। অনেকে এখন বলছেন, সে ব্যবস্থাই ভাল ছিল। ছেলেপুলেরা মাথা নিচু করে গুরুজনের কথা শিরোধার্য করত। কমবয়সিদের নাকি কোনও বেচাল দেখা যেত না!
মুশকিল হল, সব প্রজন্মের মানুষেরই প্রবণতা নিজের প্রজন্মকে ধোয়া তুলসীপাতা প্রতিপন্ন করা আর আধুনিক প্রজন্মকে যাচ্ছেতাই গালি পাড়া। এ অভ্যাস চিরকালীন। সে কালে সব ভাল আর এ কালে গেল-গেল! আসলে সে কালের বয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের কথা আমরা মনে করতে চাই না। গুরুজনসুলভ ক্ষমতার জোরে আমরা বলে চলি, কৈশোরকালীন সব বেয়াদবির শুরুয়াত এ কালেই। অথচ আমরাও মনে মনে জানি যে এ কথা সত্য নয়। কিন্তু আমরা বড়রা ক্ষমতাবান। শিশু-কিশোররা ক্ষমতার সোপানে প্রান্তবর্তী। আমরা জানি, আমরা যা-ই বলি না কেন, ও বেচারারা আমাদের মুখের ওপর কিছু বলতে পারবে না। বড় জোর একটু কান্নাকাটি করবে, তার পর নিরুপায় নাবালক আমাদের কথা শুনতে বাধ্য। আমরা ছোটদের নিরুপায়ত্বের সুযোগ নিই। আর সেই সুযোগ নিতে গিয়ে আমরা তাদের মানবাধিকার খর্ব করি।
নব্বইয়ের দশকে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে নানাবিধ পরিবর্তনের ঝড় আসা শুরু হল। আমরা নতুন বুলি শিখলাম, ‘ছেলেমেয়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে’। হ্যাঁ, বন্ধুর মতো। বন্ধু নয় কিন্তু! আসলে আমরা কতকগুলি লোকদেখানো ভদ্রতা শিখলাম আর কিছু কৌশল আয়ত্ত করলাম। আমরা লোকসমুখে বাচ্চাদের সঙ্গে অকারণ ইংরেজি বলতে শুরু করলাম। নব্বইয়ের দশক থেকে বেশির ভাগ বাচ্চারা কাকা-মামা-জ্যাঠা কিংবা মাসি-কাকি-পিসি ডাকতে ভুলে গেল। আমরা তাদের আন্টি আর আঙ্কেল শেখালাম, কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ভাল বই পড়তে উৎসাহ দিলাম না। বাংলা, ইংরেজি কোনও সাহিত্যেরই ধারেকাছে তাদের ঘেঁষতে দিলাম না। ভাল সিনেমা-থিয়েটার দেখার অথবা শিল্পকলার রসাস্বাদনের সময় নেই তাদের। এমনকী খেলাধুলারও কোনও অবসর নেই। তাদের আমরা খালি তাড়িয়ে নিয়ে চলেছি এই টিউশন থেকে ওই টিউশনে, খেলার কোচিং থেকে ড্রয়িং ক্লাস। সে কালের মতোই আজও শিশুদের পছন্দ, ইচ্ছে, বড়রাই নির্ধারণ করছে। তাদের কাছে জানতেও চাওয়া হয় না, এত পারফরমেন্সের চাপ তাদের ভাল লাগছে তো?
একটা কথা আজকাল শুনতে পাই। আমরা এ কালের বড়রা ছোটদের সঙ্গে আলোচনা করি। সে কালের বড়দের থেকে আমরা আলাদা, ঠিক। সে কালে বড়রা অত কৌশল জানতেন না। তাঁরা অত বুলি শেখেননি। তাঁরা ছোটদের পিঠে বেত্রাঘাত করতেন সরাসরি, আমরা তাদের আত্মাভিমানে বেত্রাঘাত করি আলোচনার মাধ্যমে। কারণ, এ কালের বড়দের ‘আলোচনা’ ছোটদের নিয়ন্ত্রণে আনার একটা কৌশল মাত্র। ‘বন্ধুর মতো আলোচনা’ আসলে তাদের মনের কথা বার করার একটি উপায়। মনিটরিং টুল। আমাদের ভিতরে আজও সেই সাবেক কালের গুরুজনরা বাস করেন। মারের পরিবর্তে আমরা কমবয়সির সঙ্গে আলোচনা করি তাকে ‘কনভিন্স’ করানোর জন্য। ছোটদের সঙ্গে ‘বন্ধুর মতো’ মেশার নামে তাদের সঙ্গে তঞ্চকতা করি। তাদের পেটের কথা বার করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি স্থির করি, ঠিক গোয়েন্দা টিকটিকির মতো। আসলে এই নাম-কা-ওয়াস্তে আলোচনায় আমরা ছোটদের মতামত প্রকাশের অধিকারকে অসম্মান করি, আর গোটা বড়দের সমাজের এই চালাকি ছোটরা বুঝতে পারে। দিনের পর দিন মনের কথা, স্বাধীন ইচ্ছা, মতামত প্রকাশ করতে না পারার ফলে তাদের মনে যন্ত্রণা দানা বাঁধতে থাকে। সেই ক্ষোভ-যন্ত্রণা তাদের কখনও কখনও বেসামাল করে তোলে, আর তখনই আমরা রে-রে করে তাদের দোষ ধরি। নিজেদের দিকে তাকানোর শিক্ষা যে আমাদের মোটে নেই!
একটা প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়। তা হলে কি বাচ্চা আগুনে হাত পোড়াচ্ছে দেখেও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব? তাকে নিজের ইচ্ছে উপভোগ করতে দেব? এর উত্তরে আর একটা প্রশ্ন মনে আসে। আমাদের সমবয়স্ক বন্ধু যদি কোনও বিপজ্জনক পথে পা বাড়ায়, আমরা কী ভাবে তাকে প্রতিহত করি? তার সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তার অসুবিধা, যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করি। আর যেহেতু সমান অবস্থান থেকে বন্ধুকে বোঝার চেষ্টা করি, সেহেতু তার সমস্যা বুঝতে পারি, সাহায্যের হাত বাড়াতে পারি। ঠিক এই একই পদ্ধতিতে কি আমরা ছোটদের সাহায্য করতে পারি না?
আলবাত পারি। কিন্তু তার জন্য প্রথমে আমাদের ছোটদের মতামতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণের অভ্যাস করতে হবে। বাচ্চাও একটি পূর্ণ মানুষ, শুধু জীবনের অভিজ্ঞতা কম, এ কথা অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে হবে। আলোচনার নামে তার ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। খোলা মনে এক স্তরে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথোপকথন চালাতে হবে। পরের প্রজন্মের কাছ থেকে শিখতে হবে। ছোটদের সঙ্গে ব্যবহারে সমানুভূতির অভ্যাস করতে হবে। বন্ধুর ‘মতো’ নয়, সত্যিকারের বন্ধু হয়ে উঠতে হবে। ছোটদের সঙ্গে সমানে সমানে ব্যবহার, সশ্রদ্ধ মতবিনিময়ের আচরণ শিখতে হবে। বাচ্চার ইচ্ছে-অনিচ্ছাকে মর্যাদা দিতে হবে। তাদের স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিসর দিতে হবে।
এ দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ভাবে সমাজের সব বড়দের। আর তখনই এ কাজ সম্ভব হবে, যখন আমাদের বিশ্বাসে, চিন্তায় পরিবর্তন আসবে। যে পরিবর্তন আমাদের ক্ষমতার উচ্চ চূড়া থেকে বাচ্চাদের দিকে তাকাতে শেখাবে না, বরং ক্ষমতার খোলস খসিয়ে আমাদেরও নিজেদের শৈশব-কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। নিজেদের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের অনুভবে ভর করে, সেই বঞ্চনার ব্যথায় ফিরে গিয়ে পরের প্রজন্মের সঙ্গে ভাব করতে হবে আমাদের। তাদের মনের কোণে কান পাততে হবে। নিঃশর্তে।