Advertisement
E-Paper

ক্ষমার শক্তি

অপমান ভাগ করিলে কি কষ্ট লাঘব হয়? বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত কী উত্তর দিবেন, জানা নাই। কিন্তু এক রাজনীতিকের হাতে তাঁহার অবমাননার প্রতিবাদে তাঁহার দেশ যে ভাবে আগাইয়া আসিয়াছে, তাহা দৃষ্টান্ত স্থাপন করিল।

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০১৬ ০০:০০

অপমান ভাগ করিলে কি কষ্ট লাঘব হয়? বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত কী উত্তর দিবেন, জানা নাই। কিন্তু এক রাজনীতিকের হাতে তাঁহার অবমাননার প্রতিবাদে তাঁহার দেশ যে ভাবে আগাইয়া আসিয়াছে, তাহা দৃষ্টান্ত স্থাপন করিল। অবমাননার প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়াতে বাংলাদেশের ছাত্র ও যুবসমাজ যে ছবি ও বার্তাগুলি ‘পোস্ট’ করিয়াছে তাহাতে গোটা বিশ্বের সম্মুখে বলদর্পী নেতাদের মাথা নত হইয়াছে। জাতীয় পার্টির এক সাংসদ সংখ্যালঘু প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তিবাবুকে ‘ধর্মবিরোধী মন্তব্য’-এর অভিযোগে ভয়াবহ ভাবে লাঞ্ছনা করাইয়াছেন। লাঞ্ছিত ও অসুস্থ শিক্ষককে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশ, চাকরি হইতে তাঁহাকে বরখাস্তও করা হইয়াছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার সুযোগ লইয়া এক শিক্ষকের উপর এই নির্যাতনের প্রতিবাদে ছাত্ররা নিজেদের কান ধরিয়া থাকিবার ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলিয়া দেয়। শিক্ষকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া লক্ষাধিক বার্তা টুইটারে উঠিয়াছে। ‘সরিস্যার’ নামে এই বার্তাগুলি কার্যত একটি আন্দোলনের সূচনা করিয়াছে। জনমতের এই বিস্ফোরণের সম্মুখে দাঁড়াইয়া জাতীয় পার্টি, তথা সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের নূতন করিয়া চিন্তা করিতে হইবে। জনপ্রতিনিধির কর্তব্য কী, অধিকারই বা কতটুকু, গণতন্ত্রে মানুষই তাহার সীমা ঠিক করিয়া দেয়। সেই সীমা লঙ্ঘন করিলে তাহার ফল ভুগিতে হইবে, ‘সরিস্যার’ আন্দোলন তাহা বুঝাইয়া দিল।

ধর্মীয় আবেগের সুযোগ লইয়া অপরাধ করিবার প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দেখা যাইতেছে। নানা ভাবে তাহার প্রতিবাদ করিয়াছে নাগরিক সমাজ। ভারতে সম্প্রতি লেখক-শিল্পীরা সরকারি সম্মান, পদ, পরিত্যাগ করিয়া হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতনের প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের আপত্তিকর মন্তব্য লইয়া সোশ্যাল মিডিয়াতে রঙ্গরসিকতাও প্রতিবাদের একটি নতুন ধারা তৈরি করিয়াছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার তরুণ প্রজন্ম নানা ধরনের আন্দোলনের সংগঠন ও প্রচারও করিয়া থাকে। কয়েক বৎসর পূর্বে আরব দেশগুলিতে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়া একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা লইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিত সমাজ কার্যত সোশ্যাল মিডিয়াকেই প্রতিবাদের মঞ্চ করিয়া তুলিয়াছেন। ইহা প্রতিবাদের সহজ এবং কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশের তরুণতরুণীরাও ইহাও বুঝাইলেন যে নির্যাতন প্রতিরোধের পথ পাল্টা-হিংসার পথ নহে। ক্ষমা চাহিবার মতো নির্বিরোধী, নিরীহ কাজ করিয়াও অতি কঠিন বিরক্তি প্রকাশ করা সম্ভব। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ করিবার ইহাই ঠিক পথ। যাঁহারা নির্যাতন করেন, তাঁহারা অপরের মধ্যেও নির্যাতনের বাসনাকে খুঁচাইয়া তুলিতে চাহেন। যুক্তির জোর, নৈতিকতার শক্তি তাহাদের নাই, তাই গায়ের জোরই তাঁহাদের ভরসা। অপমানের বিরুদ্ধে অপমান, মারের বদলে মার, ইহাই তাঁহাদের কাম্য। অপমানিত শিক্ষকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া নেতাদের সেই লড়াইতে নামিবার সুযোগই দিলেন না বাংলাদেশের তরুণতরুণীরা। পশ্চিমবঙ্গেও শিক্ষক নিগ্রহ কম হয় নাই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের তাণ্ডবে বিহ্বল, অপমানিত শিক্ষকের মুখ সংবাদমাধ্যমে বার বার আসিয়াছে। তাঁহাদের নিকট ক্ষমা চাহিয়া শিক্ষাঙ্গনের দুর্বৃত্তায়নের প্রতিবাদ কি এই রাজ্য কখনও দেখিবে?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy