সু গত মারজিৎ মহাশয়ের প্রশংসা প্রাপ্য। যে কোনও অন্যায় জুলুম মানিয়া লওয়াই যে রাজ্যের দস্তুর, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের চরম অসভ্যতাকেও মুখ্যমন্ত্রী ‘ছোট ছেলেদের ছোট ভুল’ বলিয়া ফুৎকারে উড়াইয়া দেন, সেই রাজ্যে তিনি বেয়াড়া আবদারের সম্মুখে নিজের অবস্থানে অনড় থাকিলেন। এক বার নহে, একাধিক বার। সাম্প্রতিক উদাহরণটি বিবেকানন্দ কলেজ ফর উইমেন-এর। পরীক্ষায় যে ভাবে হউক বসিতে দিতে হইবে, তাহার জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর থাকুক না থাকুক, এই মামাবাড়ির আবদার লইয়া ছাত্রীরা উপাচার্যকে ঘেরাও করিয়াছিলেন। বিবিধ ভাবে হেনস্থা হওয়া সত্ত্বেও উপাচার্য সেই দাবি মানিতে রাজি হন নাই। এই কঠোরতাই কাম্য। প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি ভাঙিবার অন্যায় দাবি অত্যন্ত দৃঢ় ভাবে পেষণ করা দরকার। দায়িত্ব তো কেবল কর্তৃপক্ষের নয়, শিক্ষার্থী সমাজেরও। তাহাদেরও মনে রাখিতে হইবে যে তাহারা বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছে বলিয়াই সব নিয়ম পদদলিত করিবার অধিকার তাহাদের নাই। বরং সেই নিয়মগুলি মানিবার ও শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার দায়িত্ব তাহাদের উপর বর্তাইয়াছে। প্রতিবাদ ও গুন্ডাবাজি এক নয়। কোন ঘেরাও প্রতিবাদ, আর কোন ঘেরাও গুন্ডাবাজি, সমাজের তাহা বুঝিতে ক্ষণেক-মাত্র লাগে।
দেশময় নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা আন্দোলন দেখিয়া তরুণ প্রজন্ম বিষয়ে যাঁহারা আশাবাদী হইয়া উঠিতেছিলেন, কলিকাতার বড়িশা বিবেকানন্দ কলেজ তাঁহাদের মনে করাইয়া দিল, সব বিদ্রোহ নয় সমান। আপাতদৃষ্টিতে এই কলেজের বিক্ষোভরত ছাত্রীদের সঙ্গে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের ফারাক বোঝা দুষ্কর। কিন্তু একই ছবির পিছনে যে কত বিপরীত কাহিনি, কত বিচিত্র খাঁজখোঁজ, তাহা বিবেকানন্দ কলেজের এই মারমুখী ছাত্রীরাই স্পষ্ট করিয়া দিলেন। সে দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুগত মারজিতের গাড়ি ঘিরিয়া ফেলিয়া যে ছাত্রছাত্রীরা তাঁহাকে নিগ্রহের হুমকি দিতেছিল, তাহাদের মধ্যে কত জন বহিরাগত কত জন নহে, তাহা বস্তুত গৌণ প্রশ্ন। অনেক সময় এক কলেজের কোনও আন্দোলনে অন্য কলেজের ছাত্ররাও আসিয়া যোগ দিতে পারে। মুখ্য প্রশ্ন হইল, আন্দোলনটি কী ও কেন। তাহার বক্তব্য ও গন্তব্য কী ধরনের। বিবেকানন্দ কলেজের ছাত্রীদের গায়ের জোরে জুলুমবাজি এই ‘ছাত্র-আন্দোলন’-এর প্রকৃতিটি বুঝাইয়া দেয়। বহিরাগতই হউক, আর কলেজের অন্তর্গত ছাত্ররাই হউক, বিক্ষোভকারীদের সামনে কোনও সদর্থক চিন্তা, আদর্শ, বক্তব্য কিছুই নাই, আছে কেবল স্বার্থসিদ্ধির উন্মাদনা।
আপাতত ইহাই এ রাজ্যের ছাত্রসমাজের রাজনীতির সাধারণ ধরন। শ্রীমারজিৎও সেই কথাই বলিয়াছেন। যে কোনও ছাত্রের যে কোনও দাবিই ক্রমে অগ্নিবর্ষী হইয়া দাঁড়াইতে পারে, এবং শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হইতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি রন্ধ্রে যে ভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম হইয়াছে, তাহাতে হয়তো ছাত্রদের পক্ষেও সুস্থ বিক্ষোভের পথে নিবিষ্ট থাকা অসম্ভব। ছাত্র-রাজনীতির ধারাটিই আজ পরিবর্তিত। বিশ্বাস করা কঠিন যে, রাজনৈতিক কলকাঠি ছাড়া তরুণ ছাত্রছাত্রীরা কেবল নিজের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এত বড় অন্যায় দাবিতে শোরগোল তুলিবে, এবং তাহা লইয়া সম্মেলক মিছিল-ঘেরাও সংগঠিত করিয়া ফেলিবে! তারুণ্যের ‘বিরাট দুঃসাহস’ যেমন পথের বাধা ভাঙিতে জানে, রক্তদানের পুণ্যও তাহার জানিবার কথা। নিজের বাহিরে যাহারা কিছু ভাবিতে পারে না, নিজের কাজটুকু হাসিল করিতে নিয়মকানুন যাহারা উড়াইয়া দিতে সদাপ্রস্তুত, গণতন্ত্র তাহাদের নিকট নাগরিক অধিকার নহে, গুন্ডাগিরির অধিকার।