বাহবা-র দাম বড় কমিয়া গিয়াছে। এখন ভাল কাজের বিনিময়ে বাহবা অর্জন করিতে হয় না। বরং প্রশস্তি করিবার, পিঠ চাপড়াইয়া দিবার মতো স্তাবকে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘দেওয়াল’ উপচাইয়া পড়ে। প্রাতরাশে লুচি ভাজিলেও তাহারা হাততালি দেয়, তিমির সঙ্গে নিজস্বী তুলিলেও ‘আহা! আহা!’ করে। অতিরিক্ত প্রশস্তি বিপজ্জনক। নিয়মিত জোগানে মন অভ্যস্ত হইয়া পড়ে। অন্য রকম কিছু ‘পোস্ট’ করিয়া চমক জাগাইবার ইচ্ছা অবিরত তাড়া করিয়া বেড়ায়। অল্প ইচ্ছায় দোষ নাই। কিন্তু দুঃসাহসের তাড়নাটি মাত্রা ছাড়াইলে বিপদ। বিপদ নিজের, অন্যেরও। তখন একের অযৌক্তিক সাধ অন্যের জীবনসংশয়ের কারণ হইয়া দাঁড়ায়। যেমন হইয়াছে আর্জেন্টিনায়, হইয়াছে কর্নাটকেও। লাটিন আমেরিকার দেশটিতে শিশু ডলফিনের সঙ্গে নিজস্বী তুলিবার হিড়িকে নিরীহ প্রাণীটির মৃত্যু হইয়াছে। কর্নাটকে পথ-দুর্ঘটনায় আহত কিশোরও শেষ পর্যন্ত বাঁচে নাই। কারণ, তাহাকে হাসপাতালে লইয়া যাইবার পরিবর্তে উপস্থিত জনতা মৃত্যুযন্ত্রণার ভিডিয়ো তুলিতে ব্যস্ত ছিল।
এই ঘটনাগুলি কি নিছকই চমক দিবার দুর্দম ইচ্ছা? অংশত, অবশ্যই। কিন্তু তাহাই একমাত্র কারণ নহে। অন্যের প্রতি, অন্যের সংকটের প্রতি, এমনকী মৃত্যুযন্ত্রণার প্রতি অপরিসীম ঔদাসীন্যও ইহার জন্য দায়ী। এক ভয়ংকর ঔদাসীন্য ক্রমেই মানবসমাজকে গ্রাস করিতেছে। এই অ-মানবিক ঔদাসীন্যের জন্ম এক ধরনের পরিতৃপ্তি হইতে। নিজে সুরক্ষিত থাকিবার পরিতৃপ্তি। বাহিরের পৃথিবী উচ্ছন্নে যাউক, আপন ঘরটুকু বাঁচিলেই হইল। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে, প্রতিনিয়ত ঔদাসীন্যের অসংখ্য উদাহরণ প্রকট। রাস্তায় মানুষ মরিতে বসিলেও পথচারী পাশ কাটাইয়া চলে, সর্বসমক্ষে নারী যৌননিগ্রহের শিকার হইলেও অন্যে না দেখিবার ভান করে, দিবালোকে খুন হইলেও কেহ ঠেকাইতে আসে না। কারণ হিসাবে পূর্বে বলা হইত, বিপন্নকে বাঁচাইলে উদ্ধারকারীকে পুলিশি হেনস্তার শিকার হইতে হয়। কিন্তু সেই অজুহাতও এখন ধোপে টিকিবে না। অন্তত কর্নাটকের ক্ষেত্রে তো বটেই। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা। সেখানে স্পষ্ট বলা হইয়াছে, দুর্ঘটনায় জখম ব্যক্তিকে হাসপাতালে লইয়া গেলে পুলিশ উদ্ধারকারীকে হেনস্তা করিবে না। তাহা সত্ত্বেও এমন অমানবিক আচরণের নমুনা নিঃসন্দেহে আতংকের।
আতঙ্ক, কারণ ইহা এক বিকৃত মানসিকতার প্রতিও ইঙ্গিত করে। অপহৃত মেয়েদের অত্যাচার করিয়া তাহাদের আর্তনাদ রেকর্ড করা— জনপ্রিয় বলিউড চিত্রনাট্য। কিন্তু পর্দার নৃশংসতা বাস্তবের মাটিতে নামিয়া আসিলে ঘোর বিপদ। বিশেষত যে ক্ষেত্রে অপরাধী ব্যক্তিবিশেষ নহে, কার্যত বহুজন। রক্তস্নাত মানুষের কাতর চিৎকার উপস্থিত জনতা মোবাইলে রেকর্ড করিতেছে, এমন ঘটনা ইতিপূর্বে শোনা যায় নাই। সে দিক হইতে কর্নাটকের সাম্প্রতিক কাণ্ডটি ব্যতিক্রম। কিন্তু ভাবিয়া দেখিলে, আদৌ অপ্রত্যাশিত নহে। সাম্প্রতিক অতীতে ‘সেলফি’ তুলিবার নেশায় বেশ কয়েক বার প্রাণীদের জীবন বিপন্ন হইয়াছে। আর্জেন্টিনা নজিরমাত্র। প্রাণী বলিয়াই হয়তো তাহাদের লইয়া মাতামাতি বেশি হয় নাই। কিন্তু অশুভ সংকেত এই ঘটনাগুলিতেই নিহিত ছিল। বুঝা উচিত ছিল, পশুপাখির বিপন্নতা উপভোগ করিবার ভয়ংকর মানসিকতা অচিরেই মানুষের উপরও প্রতিফলিত হইবে। কারণ, অসহায় প্রাণী হইতে বিপন্ন মানুষের দূরত্ব খুব বেশি নহে। কর্নাটক দেখাইয়া দিল, সেই প্রক্রিয়া শুরু হইয়া গিয়াছে।