জৈ ব জ্বালানির দুষ্টচক্র নিয়ে ইদানীং কালে আলোচনার পরিমাণ বেশ খানিকটা বেড়েছে। কাঠকুটো অথবা কয়লা-ঘুঁটে-কেরোসিনে রান্না করলে যে ধোঁয়া শরীরে ঢোকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, তাতে নিউমোনিয়া, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট থেকে ফুসফুসের ক্যানসার অবধি মারাত্মক সব রোগ হতে পারে। এক দিকে রোগের কারণে কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়, আর অন্য দিকে এই গোত্রের জ্বালানি জোগাড় করার জন্যও অনেকখানি সময় নষ্ট হয়। ফলে, মানুষের কাজের পরিমাণ ও পরিধি ছোট হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি সমস্যা মহিলা আর শিশুদের। মহিলারা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না, শিশুরা লেখাপড়ার জন্য সময় পায় না। ফলে, বর্তমান ও ভবিষ্যতে আয়বৃদ্ধির ক্ষমতাও কমে।
শক্তি গবেষণা সংস্থা টেরি-র রিপোর্ট অনুসারে, কারও আয় একটি ন্যূনতম স্তরের ওপরে না থাকলে, দেখা যাচ্ছে, তাঁর পক্ষে এলপিজি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। জৈব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যাঁদের আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে, তাঁরা এলপিজি ব্যবহার করার মতো আয়ে পৌঁছোতে পারছেন না। তাঁরা জৈব জ্বালানি ব্যবহারেই বাধ্য হচ্ছেন। এটাই জৈব জ্বালানির দুষ্টচক্র।
এই দুষ্টচক্র ভাঙার একমাত্র পথ গরিবের রান্নাঘরেও এলপিজি ঢোকানো। তার জন্য এখনও বহু পথ হাঁটা বাকি। ২০১১-১২ সালের এনএসএস-এর রিপোর্ট বলছে, এখনও দেশের ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার জৈব জ্বালানিতে রান্না করে। গ্রামে এলপিজি-র ব্যবহার খুবই সীমিত। এবং, যেটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, গত তিন দশকে গ্রামাঞ্চলে এলপিজি-র ব্যবহার অতি সামান্যই বেড়েছে। রাজ্যভিত্তিক অসাম্যও তীব্র। যেমন, ছত্তীসগঢ়, বিহার, ওড়িশা, এবং আমাদের পশ্চিমবঙ্গ এলপিজি-র ব্যবহারের নিরিখে বহু পিছিয়ে রয়েছে। ছত্তীসগঢ়ে এখনও মাত্র দুই শতাংশ গ্রামীণ পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে।
কেন? সবচেয়ে বড় কারণ প্রারম্ভিক খরচ। একটা নতুন এলপিজি কানেকশন নিতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। যাঁরা সেই টাকার সংস্থান করতে পারেন, তাঁরাও শেষ পর্যন্ত এই স্বচ্ছ জ্বালানি খুব একটা ব্যবহার করতে পারেন না। কারণ, ডিস্ট্রিবিউটারের গুদাম অনেক দূরে। নিয়মিত গ্যাস এসেই পৌঁছোয় না।
এই গোলমেলে ব্যবস্থা থেকে বেরোনোর একটা পথের সন্ধান চলছে। এ বছর জানুয়ারি থেকে বেশ কিছু শহরে পরীক্ষামূলক ভাবে পাঁচ কেজি ওজনের ছোট সিলিন্ডার বিক্রির ব্যবস্থা হয়েছে। ভর্তুকি ছাড়া সেই সিলিন্ডারের দাম ২৫০ টাকা, আর ভর্তুকিসমেত ১৫০ টাকা। এবং, পেট্রোল পাম্প বা মুদিখানাতেও পাওয়া যাবে এই সিলিন্ডার।
প্রকল্পটিকে দেশের গ্রামাঞ্চলে চালু করলে ছবিটা বদলাতে পারে। তার জন্য অবশ্য প্রারম্ভিক খরচটাকে অনেকখানি কমিয়ে আনতে হবে। ধরুন, মোটামুটি ১৫০০ টাকায় দিতে হবে নতুন সংযোগ। যেহেতু এখন ভর্তুকির টাকা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়, তাই ডিস্ট্রিবিউটারের ওপর আর নির্ভর করার দরকার নেই। পাড়ার দোকান থেকেই সিলিন্ডার কিনে নেওয়া যাবে।
সত্যিই যদি গরিব মানুষের ঘরে এলপিজি পৌঁছে দিয়ে জৈব জ্বালানির দুষ্টচক্রটাকে ভাঙা যায়, সর্বজনীন উন্নয়নের পথে এক মস্ত পদক্ষেপ হবে।
ফেলো, শিব নাদার ইউনিভার্সিটি