Advertisement
E-Paper

স্বাবলম্বী না হলে কৃষি বাঁচবে না

ভর্তুকির ভরসায় উৎপাদন আর সরকারকেই ফসল বিক্রি, এটাই সরকারি সহায়তার আসল ছবি। বিশেষত, সরকার-নির্ভর ছোট চাষি এই চক্রের বাইরে বেরোতে পারছে না। পেশা হিসেবে কৃষি অর্থহীন হয়ে পড়ছে।ভারতের ষাট শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। সেই চাষিদের জন্য সরকার কয়েক ডজন প্রকল্প তৈরি করেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। ঋণে ভর্তুকি, সহজ শর্তে বিমা, সহায়ক মূল্যে ফসল কিনে নেওয়া, কৃষি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকার যেন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। এটা আশ্চর্য নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও সরকার চাষিদের প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন (একশো কোটি) ডলার ভর্তুকি দেয়।

স্বপন দত্ত

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০০

ভারতের ষাট শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। সেই চাষিদের জন্য সরকার কয়েক ডজন প্রকল্প তৈরি করেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। ঋণে ভর্তুকি, সহজ শর্তে বিমা, সহায়ক মূল্যে ফসল কিনে নেওয়া, কৃষি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকার যেন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। এটা আশ্চর্য নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও সরকার চাষিদের প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন (একশো কোটি) ডলার ভর্তুকি দেয়। কিন্তু ভারতে এত কিছু সত্ত্বেও চাষিদের একটা বড় অংশই চাষ ছেড়ে দিতে পারলে যেন বেঁচে যান। মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা পেলেই তাঁরা অন্য কাজ করতে প্রস্তুত। তাই প্রশ্ন ওঠে, কৃষির যা প্রয়োজন, আর সরকার যা দিচ্ছে, দুটোর মধ্যে কি অসঙ্গতি আছে?

প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে খাদ্য সুরক্ষা আইনের প্রেক্ষিতে। আইন বলছে, পরিবার পিছু মাসে সর্বোচ্চ ৩৫ কিলোগ্রাম চাল বা গম পাওয়া যাবে দু’তিন টাকা দরে। বছরে সরকারের অতিরিক্ত এক লক্ষ ত্রিশ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। যাঁরা এর সুযোগ পাবেন, তাঁদের একটা বড় অংশই চাষি। ধানের উৎপাদক আর সরকারি হারে চালের উপভোক্তা যখন একই ব্যক্তি, তখন পুরো হিসেবটা কী দাঁড়াচ্ছে? একটা গড় ছবি হল: সরকারি ভর্তুকি ছাড়া ১ কিলোগ্রাম ধান তৈরি করতে ২১ থেকে ২৫ টাকা খরচ হয়। কিন্তু কৃষিঋণ, সার, বীজ, এমন নানা জিনিসে ভর্তুকির ফলে খরচ অনেকটা কমে আসে। ফলে সরকারকে ১১ টাকা ১০ পয়সা কিলোগ্রাম দরে বিক্রি করেও কিছু লাভ থাকে চাষির। সেই ধান থেকে তৈরি চাল চাষিরা ২ টাকায় কিনবেন সরকারের কাছ থেকে।

মনে হতে পারে, বেশি টাকায় ধান বিক্রি করে কম টাকায় চাল কিনলে চাষির লাভ। কিন্তু চাষির লাভ কী, কৃষিরই বা লাভ কতটা, একটু তলিয়ে ভাবা দরকার। বহু চাষি ধান-গম চাষ করেন পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে। তা যখন সরকার সস্তায় দেবে, তখন অন্য, আরও লাভজনক চাষ করবেন। বা অন্য কাজ করবেন। নিজের দরকারের চাল-গম সরকার থেকে দেবে। এর ফলে সরকারি গোলা খালি হতে থাকবে। আইনত সরকার তাঁকে চাল-গম দিতে দায়বদ্ধ, নইলে আদালতের কোপে পড়তে হবে। যেমন হয়েছে গুজরাতে। একেই একশো দিনের কাজের প্রকল্পে কাজ দিতে বাধ্য সরকার। তাই চাষের মজুর পাওয়া কঠিন হয়েছে, মজুরি বাড়ায় চাষের খরচও বেড়েছে। কাজ ও খাবার দুইই যখন আইনত সুরক্ষিত, তখন চাষি শস্য চাষের মতো পরিশ্রমসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করবেন কেন? অতএব শস্য আমদানি করে তা বিলি করতে হবে সরকারকে, সে সম্ভাবনা যথেষ্ট। এখন ভারত উন্নত মানের সরু চাল (অধিকাংশই বাসমতী) বিক্রি করে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ঘরে তুলছে। সেখানে হয়তো ফের চাল আমদানি করতে হবে। তাতে বিপুল টাকা যাবে।

চিন্তা কৃষি নিয়েও। উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ না হলে কৃষি লাভজনক হবে না, সে কথা বহু দিন ধরেই নেতারা বলছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ ধারণায় ‘ডিজিটাল কৃষি’কেও অন্তর্ভুক্ত করলেন। কিন্তু ঘটনা হল, এ রাজ্যে অধিকাংশ জোত ক্ষুদ্র, সেচ এখনও সীমিত, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। লাঙল আর হাল-বলদ এখনও বহু চাষির ভরসা। কৃষি কর্তারাও অনেকে ‘পরম্পরা’য় আস্থা রাখেন বেশি। ছোট চাষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যে ধরনের প্রযুক্তি ও বিধিব্যবস্থা চাই, বাজারে তাঁর ফসল বিপণনের জন্য যে সংযোগব্যবস্থা প্রয়োজন, তার কতটুকু আমাদের আছে? একই ছবি প্রাণী পালনে। গ্রামের যে কোনও বাড়িতে গেলে যেমন হাড়জিরজিরে গরুর দেখা মেলে, তা বলে দেয় আধুনিক ডেয়ারি বিজ্ঞান এ রাজ্যে কার্যত অধরা। এই চাষিদের দেখলে বোঝা যায়, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি ধান-কেনা শিবিরের ভরসায় তারা টিকে রয়েছে।

মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথ কৃষি ও কৃষককে স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর দেখতে চেয়েছিলেন। চাষকে লাভজনক করতে তাঁর সুসংহত চিন্তা ছিল। এক দিকে ছেলে রথীন্দ্রনাথকে বিদেশ থেকে বিজ্ঞানসম্মত চাষে প্রশিক্ষিত করিয়ে আনলেন। ট্রাক্টর, রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ফলন বৃদ্ধি শুরু হল। অন্য দিকে নোবেল পুরস্কারের টাকা দিয়ে চাষিদের জন্য সমবায় ব্যাঙ্ক গড়লেন, যাতে তাঁরা স্বল্প সুদে ঋণ পান, মহাজনের উপর নির্ভরতা কমে। খণ্ড খণ্ড জমি সংহত করে সেচের ব্যবস্থা, সমবায় পদ্ধতিতে চাষ, এ সবের উপকার চাষিদের বোঝালেন। বিরোধিতা এসেছিল, ব্যক্তিগত ক্ষতিও হয়েছিল। কিন্তু চাষির আত্মনির্ভরতাই যে কৃষির ও চাষির উন্নতির পথ, তা তিনি বার বার বলেছেন।

আজ প্রযুক্তির বহু উন্নতি হয়েছে, চাষির কাছে নানা প্রযুক্তি ও সুবিধে সরকার পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু চাষিকে আত্মনির্ভর হতে দেওয়া হয়নি। কম খরচে উন্নত মানের ফসল ফলিয়ে বাজারে চড়া দামে বিক্রির ক্ষমতা, এটাই চাষে স্বনির্ভরতার উপায়। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বিপণন, এই সবেরই উদ্দেশ্য শেষ অবধি উৎপাদন ব্যয় কমানো ও বাজারে লাভ বাড়ানো। সরকারি সহায়তার লক্ষ্যও হতে হবে চাষির সঙ্গে বাজারের মজবুত বোঝাপড়া। তাঁকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন বিপণন ব্যবস্থা, নতুন বাজারের খোঁজ দেওয়া। এ দেশে সরকার কার্যত এই সংযোগকে ‘শর্ট সার্কিট’ করে দিচ্ছে। সরকারি ভর্তুকির ভরসায় উৎপাদন আর সরকারকেই বিক্রি, এটাই সরকারি সহায়তার আসল ছবি। বিশেষত ছোট চাষির সরকার-নির্ভরতা বেশি হওয়ায় এই চক্রের বাইরে বেরোতে পারছে না। পেশা হিসেবে কৃষি অর্থহীন হয়ে পড়ছে।

অথচ সরকারের কাজ বিস্তর। উন্নত কৃষি খামার তৈরি ছাড়াও, কৃষিকে নিবিড় ভাবে যুক্ত করতে হবে খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গে, খেতখামারের সঙ্গে যুক্ত হবে ফসলের প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্যগুণ বৃদ্ধি, বিপণনের পরিকাঠামো তৈরি। কৃষি মেলায় নতুন প্রযুক্তির প্রদর্শনী থেকে কৃষি মান্ডিতে ফসল বিক্রি, এই শৃঙ্খল তৈরি করা ও বজায় রাখাই সরকারের কাজ। এটা করতে পারলে চাষি নিজের জোরেই বাজার ধরতে পারবে, চাষের উন্নতি করতে পারবে। সরকারকে শিবির করে তার ধান কিনতে হবে না, রেশন দোকান খুলে পাতের ভাতও জোগাতে হবে না। খাদ্যনীতি, কৃষিনীতি যত দিন ভোটবাক্সে বাঁধা পড়ে থাকবে, তত দিন ‘চাষ করি আনন্দে’ গাইতে গেলে নিজেদের অপরাধী মনে হবে।

লেখক বিশ্বভারতীর সহ-উপাচার্য। মতামত ব্যক্তিগত।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy