নিট-এ পদ্ধতি বদলের পথে হাঁটছে কেন্দ্র। শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। সে কারণে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী বছর থেকে কম্পিউটার ভিত্তিক পরীক্ষা (সিবিটি) পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি এ দিন স্বীকার করে নেন কোথাও ত্রুটি অবশ্যই ছিল। তিনি বলেন, ‘‘এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি। প্রশ্নফাঁসের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আমরা দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন।’’
সারা দেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট। সেখানেই বার বার উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ। নিট-এর প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা কমাতে এবং নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতেই এই পরিবর্তন বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
গত ৩ মে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতকে ভর্তির পরীক্ষা (নিট) দেন ২২ লক্ষের বেশি পরীক্ষার্থী। তার পর থেকেই উঠতে শুরু করে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ। রাজস্থান পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানতে পারে, পরীক্ষার প্রায় এক মাস আগে থেকে ‘সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র’ ঘুরছিল বাজারে। অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন বিলি হচ্ছিল। সেই সম্ভাব্য প্রশ্নের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল অনেক প্রশ্নই। তার পরই গত ১২ মে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভে। এমনকি দিল্লি ও কলকাতায় বিক্ষোভ দেখান এবিভিপি-র সদস্যেরাও। এনটিএ আগেই জানিয়েছিল ফের পরীক্ষা নেওয়া হবে। সেই মতো শুক্রবার, ১৫ মে ঘোষণা করা হয় নতুন পরীক্ষার দিন। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির তরফে জানানো হয়েছে আগামী ২১ জুন ফের নিট ইউজি পরীক্ষা নেওয়া হবে। শুক্রবার তাদের এক্স হ্যান্ডলে পরীক্ষার দিন ঘোষণা করেছে এনটিএ। ১৪ জুন পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড প্রকাশ করা হবে। ২১ জুনের পরীক্ষায় অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময়ও দেওয়া হবে বলে জানিয়ছে পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা। ওই দিন দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত চলবে পরীক্ষা। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পরীক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমতো পরীক্ষাকেন্দ্র বাছাই করতে পারবেন।
তার পরই সাংবাদিক সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। ‘এডুকেশন মাফিয়া’-এর জন্য যোগ্য পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে সরকারের তরফে কোনও রকম আপস করা হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সরাসরি তিনি বলেন, “আমরা কোনও অর্থশালী ব্যক্তিকে অন্য কারও প্রাপ্য আসন কেড়ে নিতে দেব না। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আমরা দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন। পরীক্ষা বাতিলের মতো কড়া সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হল পরীক্ষায় যেন কোনও ধরনের ভুল না থাকে, তা নিশ্চিত করা।”
নিট ইউজি-র প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দেশ জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। পাঁচ জনকে গ্রেফতারও করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে রাজস্থান থেকে তিন জন, মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানা থেকে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের পর জানা গিয়েছে, রাজস্থানের সীকর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। রাজস্থান থেকে হরিয়ানা হয়ে মহারাষ্ট্রের নাসিকে পৌঁছোয় প্রশ্ন। তার পর সেখান থেকে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ লক্ষ টাকায় প্রশ্ন কেনা হয়েছিল বলে তদন্তকারী সূত্রের খবর। এই ঘটনার সঙ্গে গুরুগ্রামের এক চিকিৎসকের যোগ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। নাসিক থেকে গ্রেফতার হয়েছেন এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। রাজস্থান পুলিশের স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি)-এর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন ১৩ জন। ১৪ সন্দেহভাজনকে জেরা করছে সিবিআই।
প্রশ্ন ফাঁস এবং তার জেরে পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা নিয়ে এ বার সক্রিয় হয়েছে চিকিৎসক সংগঠনও। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের কাছে এ বিষয়ে আবেদন জানানো হয় চিকিৎসকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ‘ফেডারেশন অফ অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ (ফাইমা)-এর তরফে। শীর্ষ আদালতে ‘ফাইমা’র প্রস্তাব, নিট-ইউজি পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (এনটিএ)-র হাত থেকে সরানো হোক। তার বদলে গড়া হোক একটি বিকল্প সংস্থা। বার বার পরীক্ষা বাতিলের ফলে ২২ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি পড়ুয়ার মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছে বলে দাবি করে শীর্ষ আদালতে সংগঠনের আইনজীবী তন্বী দুবে বলেন, ‘‘নতুন সংস্থা আনুষ্ঠানিক ভাবে গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পুনঃপরীক্ষা তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হোক।’’