Advertisement
E-Paper

‘আমাদের মনে মনে এগিয়ে যাওয়া জয়া মন থেকে মেনে নিতে পারেননি...’

এক নারীর মন নিয়ে রেখা চেয়েছিলেন বিনোদ মেহরার সঙ্গে ঘর বাঁধতে। বিয়ের পর বিনোদের মা জুতো নিয়ে তাড়া করেন রেখাকে। জুটেছিল অশ্রাব্য গালাগালি। বিনোদ সে দিন অসহায়। আর রেখা? লাঞ্ছনা নিয়ে আরও আগুনের মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করালেন।

​স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৮ ১১:৪৪
চিরকালীন সুপার কাপল অমিতাভ–রেখা।

চিরকালীন সুপার কাপল অমিতাভ–রেখা।

মাত্র পনেরো বছর বয়স তাঁর। ছবি করছেন ‘আনজানা সফর’। মেহবুব স্টুডিয়োর ঘটনা। পরিচালক আর নায়কের যৌথ চক্রান্তে সেই কিশোরী বেলায় প্রথম যৌন হেনস্থার কালো রূপ দেখলেন তিনি। চিত্রনাট্য পড়ার সময় কোনও উল্লেখ ছিল না। অথচ নায়ক জোর করে তাঁর ঠোঁটে বার বার চুমু খেলেন! বেশ কিছুক্ষণ পরে কাট শব্দ তাঁর কানে এসে পৌঁছলো। ফ্লোরে তখন দু’চার খানা সিটি পড়েছে। চারিদিকে হৈ হৈ। শুধু সেই কিশোরীর চোখ জলে ভরা। সেই প্রথম সমাজ তাঁকে বাস্তবের নগ্ন দরজায় দাঁড় করালো। রেখা...পনেরো বছরের কিশোরী!
সেলুলয়েড তাঁকে রহস্যময়ী মোহিনীর চোখে দেখে। গ্ল্যামার আর সম্মোহনের আলোর আঁধারে বিলীন তাঁর গভীর ক্ষত। সমাজ যতই তাঁকে নিঃস্ব করুক তিনি আগুন-বাহক! তাঁর দেমাক তাঁর অস্ত্র!

এক নারীর মন নিয়ে রেখা চেয়েছিলেন বিনোদ মেহরার সঙ্গে ঘর বাঁধতে। বিয়ের পর বিনোদের মা জুতো নিয়ে তাড়া করেন রেখাকে। জুটেছিল অশ্রাব্য গালাগালি। বিনোদ সে দিন অসহায়। আর রেখা? লাঞ্ছনা নিয়ে আরও আগুনের মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করালেন।

ঘরোয়া রেখার কথায় ফিরি। যখন ওঁর মা পুষ্পাবলী মারা গেলেন, রেখা মারাত্মক ভেঙে পড়েছিলেন।
মা-ই ছিলেন রেখার ভরসা, আদর্শ। দীর্ঘ সময় নিজেকে বাড়ির চৌহদ্দিতে বন্দি রেখেছিলেন তিনি। রেখারড্রেস-সেন্স, লাল লিপস্টিকের ওপর এই টান— সবটাই মায়ের থেকে পাওয়া। ছোট থেকেই মাকে দেখতেন দিনের যে কোনও সময়েই তিনি অসম্ভব পরিপাটি। মা’র পরনে থাকত পাটভাঙা শাড়ি, লাল লিপস্টিক...
১৯৮০ সালে নীতু সিংহ আর ঋষি কপূরের বিয়ে।নীতু রেখার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। এমনকি সাজগোজের টিপস্ নীতু রেখার থেকে নিতেন। যেমন নিতেন শ্রীদেবী। আর কে স্টুডিয়োতে রেখা সাদা শাড়ি, লাল টিপ আর মাথায় সিঁদুর পরে ঢুকতেই সকলে চমকে উঠলেন। রেখা তখন আর বিবাহিত নন। সিনে ব্লিৎজম্যাগাজিন সেই সন্ধ্যা সম্পর্কে লিখল, ‘‘মাথায় সিঁদুর লাগিয়ে কী প্রমাণ করতে চাইলেন রেখা? যে তিনি বিবাহিত?’’ শোনা যায়, নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখা চলে যান আর কে স্টুডিয়োর বাগানে। হঠাৎ কী এমন হল যে, এত লজ্জা পেলেন রেখা? পার্টিতে উপস্থিত লোকজন বললেন, দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে শুধু একজনকেই দেখছিলেন রেখা। ভদ্রলোকের নাম অমিতাভ বচ্চন। সেই পার্টিতে আসার আগে, হাতে চোট পেয়েছিলেন অমিতাভ। ব্যান্ডেজ বাঁধা। অনেক সাহস সঞ্চয় করে রেখা তাঁর চিকিত্সক বান্ধবী স্নেহলতা পাণ্ডেকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন অমিতাভের দিকে। মুহূর্তে সব চোখ ধাওয়া করল রেখাকে। কয়েক মিনিট হাল্কা কথাবার্তা। সে প্রসঙ্গে স্টারডাস্ট পত্রিকা লিখেছিল, ‘‘বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে সংযত রাখেন জয়া। তবে বেশি সময় নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। দু’চোখের কোণ দিয়ে ঝরে পড়ে জল।”রেখা পার্টি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও থেকে যায় অনেক অনুচ্চারিত প্রশ্ন। অনেক পরে রেখা সব বিতর্ক দূরে সরিয়ে বলেছিলেন যে, শুটিং সেরে সোজা চলে যান ওই পার্টিতে। তাড়াহুড়োতে ভুলে গিয়েছিলেন মেক আপ তুলতে। মাথার সিঁদুরটাও আর মোছা হয়নি...

আরও পড়ুন: #মিটু ঝড়ে টালমাটাল বলিউড

কিন্তু বিতর্ক কি তাঁর পিছু ছাড়ে? রেখাও জানেন তাঁর জবাব দিতে। ১৯৮২-তে 'উমরাওজান' এর জন্য জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে রেখা গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, “আমার শহরে সিঁদুর পরা একটা ফ্যাশন।” ত্রস্ত চোখ, আস্বাদিত বিষাদ তাঁর কালো মেঘের চুলে।সমাজের অনিচ্ছায় তিনি বাঁচেন!
কী করে এই সুপারস্টারের প্রেম সামলালেন রেখা?

একটু ফিরে তাকানো যাক। সত্তরের দশকের শেষে অমিতাভ বচ্চনের দুই সুপারহিট ছবি ‘মিস্টার নটবরলাল’ এবং ‘সুহাগ’‌-এর নায়িকার নামও ঘটনাচক্রে রেখা। কেরিয়ারের শীর্ষে তখন অমিতাভ। তার আগের বছরই রিলিজ হয়েছে সুপার-ডুপারহিট ‘ডন’। সাফল্যের রেশ তখনও কাটেনি, এবং সেই সময়ই মুক্তি পায় রিভে়ঞ্জ ড্রামা ‘মিস্টার নটবরলাল’। হিন্দি সিনেমায় একটা মজার ব্যাপার আছে। এখানে দর্শকের মনে বহু দিন থেকে যান ছবির নায়ক-নায়িকারা, গানের সৌজন্যে। এবং সে কারণেই অমিতাভ–রেখা চিরকালীন সুপার কাপল। ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দর’‌য়ের ‘সালাম-এ-ইশক’ যেমন অচিরেই হয়ে উঠেছিল অমিতাভ-রেখার প্রেমের অ্যানথেম। এত দিন যা ছিল গুজব, সেটাই যেন বাস্তবে পরিণত হল ‘মিস্টার নটবরলাল’‌য়ের সময়। ‘পরদেশিয়া ইয়ে সচ হ্যয় পিয়া’ যেন দু’জনের প্রেমের স্বীকারোক্তি...

অনেক পরে একটি সাক্ষাৎকারে জয়া বচ্চন সাফ জানিয়ে দেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে কোনও দিন কারও ‘অ্যাফেয়ার’ ছিল না। ‘‘যার যা ইচ্ছে বলুক। ও (অমিতাভ) তো আমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তা সত্ত্বেও যদি আমার পিছনে অন্য কারও সঙ্গে কোনও সম্পর্কে জড়ায় তবে সেটা ওর প্রবলেম। আমার নয়। সেটা নিয়ে ওকেই বাঁচতে হবে। ভুগতে হবে ফলও,’’ সে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন অমিতাভ-জায়া...

রেখাকে নিয়ে বচ্চনবাড়িতে তখন অশান্তির কালো মেঘ। চতুর্দিকে রটে গিয়েছে অমিতাভ-জয়ার বিয়ে ভাঙার খবর। এমন সময় মুখ খুললেন অমিতাভ। রেখার নাম না নিয়েও পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তাঁদের ডিভোর্স হচ্ছে না। ‘‘আমি ডিভোর্সে বিশ্বাস করি না। জয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটা একদম সঠিক ছিল। ফার্স্ট ক্লাস,’’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন অমিতাভ। সেই একবারই অন্দরমহলের কথা অমিতাভের মুখে শোনা গেছিল। অমিতাভ সাবধানী হলেও, সে পথে হাঁটেননি রেখা। স্টারডাস্টে দেওয়া একটা ইন্টারভিউতে রেখা হঠাৎ দাবি করেন, বচ্চনবাড়িতে নাকি তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জয়া। বলেন, ‘‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনও আপত্তি ছিল না জয়ার, যত দিন ও মনে করত এটা নিছকই একটা ‘ফ্লিং’। কিন্তু যখন দেখল আমরা মনে মনে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি, সেটা জয়া মেনে নিতে পারেনি। একদিন আমাকে ডিনারে ডেকেছিল। সারা সন্ধে অনেক কথা হল, অমিতাভের নামও উঠল না। আমি যখন বেরিয়ে আসছিলাম, জয়া বলল, যাই-ই হোক, আমি কিন্তু কখনও অমিতকে ছেড়ে যাব না।”

আরও পড়ুন: প্রকাশ্যেই চুম্বন রণবীর-দীপিকার! দেখুন ভিডিয়ো

এ ঘটনা পর্দায় আজো দেখা চলে। এই জুটি চিরকালীন।
তুম হোতি তো ক্যায়সা হোতা’... ‘সিলসিলা’য় অমিতাভ-রেখা
শ্রীনগরে তিনু আনন্দের ‘কালিয়া’ ছবির শুটিং চলছে। ১৯৮০ সালের ২১ অক্টোবর। ডিনারে অমিতাভের সঙ্গে দেখা করেন যশ চোপড়া। পরে শাহরুখ খানকে এক সাক্ষাত্কারে যশ বলেছিলেন ‘‘সবাই চলে যাওয়ার পর আমার ঘরে এল অমিতাভ। জিজ্ঞেস করল ‘আর ইউ শিওর উইথ দ্য কাস্টিং অব দ্য ফিল্ম? আর ইউ হ্যাপি?’’ আমি বলেছিলাম, আমি খুশি নই। অমিতাভ বলল ‘‘আপনার কী মনে হয়, এর আইডিয়াল কাস্টিং কী হতে পারে।’’ যশ সটান অমিতাভকে বলে বসলেন, ছবিতে অমিতাভের জীবনে তৃতীয় মহিলার রোলে তিনি রেখাকেই দেখতে চান। স্ত্রীর রোলে জয়া বচ্চন।

৫ মিনিট সময় নেন অমিতাভ। তারপর রাজি হন। তবে নিজে জয়াকে বলার ঝুঁকিটা নেননি। তিনি চেয়েছিলেন অভিনয়ের প্রস্তাব যশ নিজে জয়াকে দিক। ২২ অক্টোবর অমিতাভ-যশ মুম্বইয়ের ফ্লাইট ধরেন। দু’জনেই জানতেন কাস্টিংয়ের ব্যাপারটা সহজ হবে না।
কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না জয়া। এমনকি তাঁকে সিনেমার গল্পটুকু শোনাতেও বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। পুরো গল্প শোনার পরেও জয়া একেবারে ভাবলেশহীন হয়েই বসে ছিলেন। ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত জয়া রোলটা করার জন্য এতটুকুও আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু শোনা যায় ‘সিলসিলা’র লাস্ট সিনটার জন্যই নাকি রোলটা অ্যাকসেপ্ট করেন জয়া। সেই সিনটা, যেখানে অমিতাভকে জয়া বলছেন,‘‘আমি জানতাম তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।” এই ক্লাইম্যাক্সটাই রাজি হওয়ার একমাত্র কারণ।
'সিলসিলা' তো হল।কিন্তু রেখার রেখায় যেন শুধুই লড়াই।

মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পুরুষতন্ত্র রেখার ইচ্ছেমতো জীবন মেনে নেবেন কী করে?
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পুরুষসঙ্গই তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অমিতাভ-জিতেন্দ্র-ধর্মেন্দ্র-সুনীল দত্ত — কে নেই সেই লিস্টে! বলিউডের একাংশ তখন একমত — বিবাহিত পুরুষদের সবচেয়ে বড় ‘থ্রেট’‌য়ের নাম রেখা। ‘ম্যান-ইটার’, ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’, ‘সেক্স কিটেন’... রেখার তখন কত নাম ইন্ডাস্ট্রিতে। সাফল্যের মধ্যগগনে থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে বারবার রক্তাক্ত হতে হয়েছে রেখাকে। তাঁর ‘ম্যান-ইটিং’ নিয়ে যখন জোর গসিপ বলিউডে, সেই সময় রেখার বিরুদ্ধে মুখ খোলেন এমন একজন, যিনি পরিচিত ছিলেন স্বল্পবাক হিসেবে। ভদ্রমহিলার নাম নার্গিস দত্ত। ‘‘মাঝে মাঝে দেখে মনে হয় রেখা ভীষণ সহজলভ্য। আবার কেউ কেউ তো ওকে ডাইনি বলেও ডাকে।”
১৯৯০মুকেশ অগ্রবালের হত্যা রেখাকে আরও'ম্যান ইটার' হিসেবে সুনিশ্চিত করল। সব দোষ রেখার। সুভাষ ঘাই থেকে অনুপম খের বললেন,“রেখার জন্য ইন্ডাস্ট্রির মুখ পুড়ছে। আর কোনও ইন্ডাস্ট্রির মেয়েকে কেউ ঘরের বউ করবে না।”

আরও পড়ুন: ধর্ষণের কাঠগড়ায় এ বার ‘সংস্কারি’ অলোক নাথ, ফেসবুকে বিস্ফোরক পোস্ট বিনতা নন্দার

সব শুনেছেন রেখা, কিন্তু মুখ খোলেননি। বলেননি মুকেশ ক্রনিক ড্রিপ্রেশনের রুগি ছিল। ব্যবসায় সব হারিয়ে রেখাকে বিয়ে করেছিল। রেখা সেটা জানতেনও না। বলেননি মুকেশ চাইতেন না রেখা ছবি করুক।
রেখা থেমে যেতে পারতেন। ডাইনি শুনেও তাঁর চলা থামল না। নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন। সোফিয়া লোরেনের সঙ্গে তাঁর তুলনা এল।
সব পেয়েছিলেন রেখা। কখনও ভানুরেখা গণেশণ। কখনও অমিতাভের রেখা বা বিনোদ মেহরার রেখা আবার কখনও উমরাওজান। কখনও সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো রেখা...
না পাওয়া শুধু এক মুঠো ভালবাসা আর আশ্বাসের আলিঙ্গন...
আজ তাঁর জন্মদিন।
নিষ্ঠুর চেতনার মাঝে রামধনু রেখায় আকাশ আলো করুন...

কৃতজ্ঞতা
রেখা – দ্য আনটোল্ড স্টোরি’
লেখক — ইয়াসির উসমান
প্রকাশক — জাগরনট

(সেলেব্রিটি ইন্টারভিউ, সেলেব্রিটিদের লাভস্টোরি, তারকাদের বিয়ে, তারকাদের জন্মদিন থেকে স্টার কিডসদের খবর - সমস্ত সেলেব্রিটি গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)

Celebrity Birthday Rekha Amitabh Bachchan Relationship Bollywood Celebrities রেখা অমিতাভ বচ্চন
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy