অভিযোগ শিরোধার্য
আপনার টিম কিন্তু বলছে, শট দেওয়ার পর কোনও রিঅ্যাকশন দেন না। এই অভিযোগ কি ঠিক? হেসে অভিষেক বললেন, ‘‘এই সব অভিযোগ মেনে নিচ্ছি। আসলে আমি ভাবি যে, ঠিকই তো করল, আবার কী বলব? কিন্তু ছোটদের এনকারেজ করার চেষ্টা করেছি। আর সুদীপ্তা, চিত্রাদি আমার এনকারেজের থেকেও অনেকটা এগিয়ে রয়েছে।’’

শুরুর গল্প
১৯৯৪-এ হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে মুম্বই গিয়েছিলেন অভিষেক।ফর্ম জমা দিয়ে এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলেন। অ্যাডমিট কার্ড আসতে তখনও দিন ১৫ বাকি। বন্ধুর বাড়ির পাশেই এক প্রযোজক থাকতেন। তাঁর সূত্রে শুটিং দেখার সুযোগ  হয়। কৌতূহলবশত দেখতে গিয়ে ভাল লেগে গিয়েছিল অভিষেকের। সেই শুরু। ‘‘ওদের গিয়ে বললাম, কিছু করতে চাই। প্রোডাকশনের কাজ দিল, করলাম। তার কিছু দিন পর মনে হল ভাল লাগছে না। ক্যামরার কাজ করলাম। পয়সা পেতাম না কিছুই তখন। ওখানে আর্ট ডিরেক্টর সুমিত বসুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। বাড়িতেও অ্যালাও করছিল না। ১৫ দিনে ফেরার কথা ছিল। ফিরেছিলাম পৌনে দু’বছর পরে। তার পর টানা ১৬ বছর মুম্বইতে ছিলাম। ১২-১৩ বছর বিজ্ঞাপনে কাজ করেছি। তার আগে করিনি, এমন কাজ নেই। লাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ‘দিল জ্বলে’, ‘শপথ’-এও কাজ করেছি,’’ মিঠে স্মৃতিতে হাত বোলালেন অভিষেক।

বাড়ির ছোট ছেলে
অভিষেক কী করতে চান, তা বাড়িতে বোঝাতে পারতেন না। কসবার বাড়িতে পাঁচ ভাইবোনের সব চেয়ে ছোট তিনি। বাবার ব্যবসা ছিল। তবে অভিষেকের কাজ নিয়ে নাকি তাঁর বাবা কোনও দিন ভয় পাননি। অভিষেকের কথায়: ‘‘আমি ছোট বলে বেশি কাছের ছিলাম। আমার ছোট ছেলেই আমার কাছ থেকে চলে গেল, এই অভিমানটা বাবার ছিল। তবে ভুল পথে হাঁটব না, এই ভরসাও ছিল।’’

আরও পড়ুন, প্রেম ছাড়া কি আর প্রশ্ন নেই? বলছেন সোহিনী

কলকাতায় ফেরা
২০১০-এর সেপ্টেম্বরে কলকাতায় ফেরেন অভিষেক। বাংলার একটি চ্যানেলে তখন কাজ শুরু করেন। ‘‘অ্যাড, প্রোমো ডিরেক্ট করেছি স্মলার ভার্সনে। সবার স্বপ্ন থাকে ৩০-৪০ সেকেন্ডটাকে দু’ঘণ্টায় ট্রান্সফার করার। আমারও ছিল।’’ নতুন পরিচালকের কথায় ধরা পড়ল স্বপ্ন।


ছবির দৃশ্যে সুদীপ্তা এবং রাজনন্দিনী।

প্রযোজকের সঙ্গে আলাপ
প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়। ‘উড়নচণ্ডী’র প্রযোজক। অভিষেকের সঙ্গে প্রসেনজিতের প্রথম আলাপ তাঁর বিয়ের দিন। তিনি শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলেন অভিষেকের স্ত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর নিমন্ত্রিত হিসেবে। তার পর আলাপ একটি বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে। ‘‘বুম্বাদা জানত না আমি ওই অ্যাডটা করছি। লোকেশনে গিয়ে দেখল আমি। তখনই বলেছিল তুমি ফিল্ম বানাও, ভাল ফিল্ম বানাবে,’’ বললেন অভিষেক।

‘উড়নচণ্ডী’র প্রথম ধাপ
এক বছর আগে এই ছবির চিত্রনাট্য লেখেন অভিষেক এবং সুদীপ দাস। তার পর সে গল্প শুনিয়েছিলেন প্রসেনজিত্‌কে। অভিষেকের কথায়, ‘‘গল্পটা শুনে বুম্বাদা বলেছিল, আর কোথাও যাবে না তুমি। এটা আমি করব। অবাক হয়েছিলাম। বুম্বাদা করতে রাজি হবে ভাবিনি। তখন থেকেই গাড়িটা চলতে শুরু করল।’’

আরও পড়ুন, ‘ঋদ্ধির জাতীয় পুরস্কার যে আমি দেখে গেলাম, এটাই বড় প্রাপ্তি’, বললেন চিত্রা সেন

‘মিনু’, ‘ছোটু’র খোঁজ
‘উড়নচণ্ডী’-তে ডেবিউ করতে চলেছেন রাজনন্দিনী এবং অর্মত্য। দু’জনেরই ফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। ইন্দ্রাণী দত্তের মেয়ে এবং চৈতী ঘোষালের ছেলেকে অভিষেক খুঁজে পেলেন কী ভাবে? পরিচালকের উত্তর, ‘‘আমার দুটো ফ্রেশ মানুষের দরকার ছিল। নতুন পরিচালক, নতুন দু’টো মুখে প্রযোজক রাজি হবেন কি না, সেটা একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু বুম্বাদাও বলল, নতুন মুখ ছাড়া এটা হবে না। তখন সাহস পেলাম। বুম্বাদা আমাকে রাজনন্দিনীর কথা বলে। একটা লুকেই ওকে আমার পছন্দ হয়ে যায়। আর ছেলের চরিত্রের জন্য অনেক খোঁজা হচ্ছিল। অডিশন চলছিল। বুম্বাদাও অনেকের নাম সাজেস্ট করেছিল। কিন্তু কিছুতেই কানেক্ট হচ্ছিল না। সুদীপ্তা সে সময় ফেসবুকে অনেকের ছবি দেখাচ্ছিল। হুট করে অমর্ত্যর ছবি দেখায়। দেখেই বলি, এ আমার ছোটু। ওদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা খুব ভাল। সুদীপ্তাও হেল্প করেছে। শুটিংয়ে কিছু ভুল হলেই, সুদীপ্তা ধরিয়ে দিয়েছে। ওরাও খুব কথা শুনেছে। ওদের দেখে মনে হবে না, এটা ওদের প্রথম ছবি। এতটাই ম্যাচিওর্ড কাজ করেছে ওরা।’’


এই ছবির ছোটু অর্থাত্ অমর্ত্য।

বুম্বাদাকে খুশি করাটা ফার্স্ট প্রায়োরিটি
নতুন পরিচালক হিসেবে অভিষেকের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল প্রযোজক অর্থাত্ প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়কে খুশি করা। আর সেই হার্ডল তিনি পেরিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি করলেন। ‘‘দেখুন, কমিটমেন্টের একটা জায়গা থাকে। আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল বুম্বাদাকে হ্যাপি করা। এই ফিল্মটা প্রেজেন্ট করতে যেন বুম্বাদা প্রাউড ফিল করে। বুম্বাদার তো একটা নাম আছে। সেটা যেন আমার জন্য কোনও ভাবেই খারাপ না হয়। সেটার টেনশন ছিল। কম বাজেট বা কম দিন শুট হলে একটা লুক সেট হয়ে যায়। এটা এই ধরনের ছবি হবে। আমি সেটা থেকে বেরিয়ে ভাবতে চেয়েছি। প্রাথমিক ভাবে বুম্বাদা খুশি। আমার মনে হয়, বুম্বাদা প্রাউড ফিল করবে। এ বার অডিয়েন্স। বুম্বাদা বলেছিল, ফেস্টিভ্যালের জন্য। কিন্তু আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল বুম্বাদার ঘরে যেন পয়সা আসে…’’ অভিষেকের গলায় ধরা পড়ল আত্মবিশ্বাস।  

আরও পড়ুন, ‘এখন তো শুক্রবার রিলিজ হলে রবিবারই সুপারহিট লেখা হচ্ছে’

নতুন পরিচালক হিসেবে স্বাধীনতা ছিল? 
এই প্রথম একটু পজ নিলেন অভিষেক। তার পর বললেন, ‘‘স্বাধীনতাটা খুব রিলেটিভ একটা ব্যাপার। কোন জায়গায় আমরা স্বাধীন? অ্যাডজাস্ট করতেই হবে। কি লেভেলে করতে হচ্ছে, সেটাই আসল। একটা কাজ করতে গেলে তো এ সব হবেই। পুরো স্বাধীনতা কোথাও পাওয়া যায় না। সেটা নিয়েই উড়নচণ্ডী। এই ছবিটা বুম্বাদা ছাড়া হত না।’’

কতটা সাজেশন দিয়েছেন প্রসেনজিত্?
অভিষেকের দাবি, প্রতি মুহূর্তেই সাজেশন আসত। কিছু নিয়েছেন তিনি। কিছু নেননি। অভিষেক শেয়ার করলেন, ‘‘কী করলে আরও বেটার হয় সেটা নিয়ে তো আলোচনা হতই। কখনও বুম্বাদা রেগে গিয়েছে। অভিষেক কী করছে খুটুর খুটুর করে! আমি একটু পিটিরপিটির করি। তবে প্রজেক্টের বাঁধুনিটা ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জ ছিল।’’


‘উড়নচণ্ডী’র দৃশ্যে চিত্রা সেন।

‘উড়নচণ্ডী’র গান
এই ছবির গানঘরের দায়িত্ব সামলেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। অভিষেকের দাবি, ‘‘দেবুদার ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতা। দেবুদা বলতেই একটা ইমেজ। একটা আলাদা ধরন। সেটা থেকে বের করে এনে আমার ধাঁচে বসানোটাও কাজ ছিল। দেবুদাও হয়তো রেগে গিয়েছে। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। গানগুলো শুনলে বুঝতে পারবেন। দেবুদা রিদম বেস গান করেই না। স্ট্রিং বেস গান করে। সেখানে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেবুদা বলছে আমার ওয়ান অফ দ্য বেস্ট কাজ।’’ এ ছাড়াও হেমা মুন্সির কথা আলাদা ভাবে উল্লেখ করলেন অভিষেক। আদতে হেয়ারস্টাইলিস্ট হেমা এই ছবিতে কস্টিউমও করেছেন। লুক ডিজাইন করেছেন। এটাও বড় পাওয়া বলে মত তাঁর।  

টেনশত কতটা?
কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন অভিষেকের টেনশনটা নাকি নিজের কাছে। ‘‘আমি যেটা ভাবলাম, সেটা কারেক্ট ভাবলাম কি না সেটাই টেনশন। এটা যদি ঠিক থাকে, তা হলে পরেরটা ভাবতে সুবিধে হবে’’ সাইন অফ করলেন অভিষেক।

ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে।