বড় স্টেনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রনের কড়াইয়ে রান্না করার চল কমেছে। এখন পরিবার ছোট। কম জনের রান্না চটজলদি ছোট নন-স্টিক প্যান বা কড়াইতেই হয়ে যায়। তাতে তেলের খরচও বাঁচে আবার রান্নার সময়ও। নন-স্টিক বাসনপত্র ব্যবহার করা সহজ, ছেঁকা খাওয়ার আশঙ্কাও কম। তাই ঘরে ঘরেই এখন নন-স্টিকের জয়জয়কার। রান্নার সুবিধা ও স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে যতই নন-স্টিকের বাড়বাড়ন্ত হোক না কেন, সামান্য ভুলে বিপদ ঘনাতে দেরি হবে না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা তাঁদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করেছেন, রান্নার সময়ে নন-স্টিক বাসনে একটি আঁচড় লাগলেই বিপদ। সেই আঁচড়ের জায়গা দিয়ে অনর্গল বেরোতে থাকবে হাজার হাজার প্লাস্টিক কণা ও তা মিশে যাবে খাবারে।
নন-স্টিক প্যানে রান্নার সময় স্টিলের খুন্তি বা ধারালো কিছুর আঘাতে যদি একটি ছোট আঁচড় পড়ে, তবে সেখান থেকে বেরোবে ৯০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক। আর যদি কোনও ভাবে বাসনটি পুরনো হয়ে যায় এবং তার উপরের আস্তরণ উঠে যায়, তা হলে প্রতি বার ব্যবহারের সময়ে অন্ততপক্ষে ২০-২৩ লক্ষ বিষাক্ত প্লাস্টিকের কণা বেরিয়ে মিশে যাবে খাবারে। 'হার্ভার্ড মেডিসিন ম্যাগাজিন'-এও তেমনটাই লেখা হয়েছে।
কতটা বিষ ঢালতে পারে নন-স্টিক বাসন?
নন-স্টিক প্যানের কোটিং বা উপরের আস্তরণ তৈরি হয় পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই)নামক এক ধরনের সিন্থেটিক পলিমার দিয়ে। এটি ‘টেফলন’ নামেই বেশি পরিচিত। কার্বন ও ফ্লোরিন দিয়ে তৈরি প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ হল টেফলন। এটি ব্যবহারের কারণে নন-স্টিক বাসনের উপরিভাগ মসৃণ হয়। টেফলন তাপরোধীও। তবে সমস্যা হল এটি খুব সহজে ভেঙে যায়। রান্নার সময়ে ধাতব কিছুর আঘাত লাগলে টেফলনের স্তরে চাপ পড়ে ও তা ভেঙে গিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। আবার খুব উচ্চ তাপমাত্রায় টেফলনে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে পারে, তখনও প্লাস্টিক কণা আলগা হয়ে বেরিয়ে আসে ও খাবারে মিশে যায়।
আরও পড়ুন:
নন-স্টিক প্যান থেকে যে প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক বার হয়, তা মূলত পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল (পিএফএএস)। এগুলি শরীরে প্রবেশ করে খুব তাড়াতাড়ি রক্তে মিশে যেতে পারে। সবচেয়ে আগে লিভার ও অন্ত্রের ক্ষতি করে, তার পর হানা দেয় ফুসফুসে। হরমোন ক্ষরণের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে এই ধরনের প্লাস্টিক কণা, প্রভাব ফেলতে পারে বিপাকক্রিয়া, প্রজননেও। এমনও দেখা গিয়েছে, এই ধরনের প্লাস্টিক কণা মস্তিষ্কে গিয়ে জমা হয়েছে, যা থেকে ব্রেন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
নন-স্টিক ব্যবহারের নিয়ম
১) ধাতব খুন্তি বা চামচ ব্যবহার করবেন না। রান্নার সময়ে কাঠ, সিলিকন বা নাইলনের খুন্তি ব্যবহার করা ভাল।
২) টেফলন কোটিং উচ্চ তাপে ভেঙে যায়, তাই রান্নার সময়ে তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। আঁচ কম বা মাঝারি রেখে ঢেকে রান্না করুন।
৩) নন-স্টিক বাসন বেশি ঘষামাজা করলে তার উপরের স্তরটি দ্রুত নষ্ট হবে, তাই পরিষ্কারের সময়ে নরম স্পঞ্জ বা সুতির কাপড় ব্যবহার করা উচিত।
৪) ডিশওয়াশারে নন-স্টিক বাসন না ধোয়াই ভাল।
৫) রান্নাঘরে একটি প্যানের উপর আরেকটি চাপিয়ে রাখবেন না, এতে সহজেই আঁচড় পড়বে। প্রতিটি বাসন আলাদা রাখাই উচিত।
৬) নতুন নন-স্টিক প্যান কেনার পর তা ভাল করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। তার পর সামান্য তেল মাখিয়ে খুব অল্প আঁচে ১ মিনিট গরম করে মুছে নিন। এটি কোটিংয়ের উপর বাড়তি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।