মাসের পর মাস ‘বন্দি’ হয়ে ছিলেন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে, কিছু উপার্জনের আশায় বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজ করতে যেতেন শ্রমিকেরা। কিন্তু তাঁদের কর্মজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল! সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের মুজ়ফ্ফরনগরের এক কারখানা থেকে শ্রমিকদের উদ্ধারের ঘটনার পরই প্রকাশ্যে এসেছে এই ‘চক্রের’ কথা। কী ভাবে শ্রমিকেরা ওই কারখানায় কাজ করতেন, কী ভাবে সেখানে বন্দিজীবন কাটাতেন, তার টুকরো টুকরো নানা ‘গল্প’ জানা যাচ্ছে। উদ্ধার হওয়া শ্রমিক বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বয়ানে উঠে আসছে নানা হাড়হিম করা ঘটনার কথা।
মাস তিনেক ধরে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন ৬৮ বছর বয়সি মেহেরবান শাহ। তিনি শুধু জানতেন, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলশাদ মহম্মদ মুজ়ফ্ফনগরের এক কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গিয়েছেন— সেই প্রশ্নের উত্তর ছিল না মেহেরবানের কাছে। ২৪ বছর বয়সি দিলশাদ উত্তরপ্রদেশের অমরোহা জেলার বাসিন্দা। নিজেই কাজ খুঁজে পাঁচ মাস আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তার পরে হঠাৎই একদিন ফোন আসা বন্ধ হয়ে যায়। মেহেরবানের কথায়, ‘‘আমরা নানা জায়গায় খোঁজ করি। কোথায় কোথায় ও (দিলশাদ) যেতে পারে, সেখানে সেখানে গিয়ে খবর নিই। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। আমরা জানতামই না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না। সবটাই ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’’ মঙ্গলবার হঠাৎই বেজে ওঠে মেহেরবানের ফোন। বৃদ্ধা দেখেন, ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ছোট ছেলের নাম!
শুধু দিলশাদ একা নন, এমন অন্তত ১১ জন শ্রমিককে সোমবার উদ্ধার করে মুজ়ফ্ফরনগর পুলিশ। পুলিশকর্তাদের মতে, এই ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন রাজস্থানের জোধপুরের বাসিন্দা বিক্রম। তিনিও মুজ়ফ্ফরনগরের ওই কাগজের থালা-বাটি তৈরি করার কারখানায় কাজ করতেন। বিক্রম ওই কারখানার পাঁচিল টপকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। গত ২২ জুন কারখানা থেকে পালিয়ে তিনি সোজা চলে যান তিতাওয়ী থানায়। তার পরই প্রকাশ্যে আসে ওই কারখানার ‘অমানবিক’ ছবি। তাঁর বয়ানের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত ওই কারখানায় কর্মরত ১২ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কারখানার মালিক অঙ্কিত বালিয়ানের বাবা প্রদীপ এবং সুপারভাইজ়ার শিব ত্যাগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অঙ্কিতের খোঁজ চলছে। তিনিই শ্রমিকদের উপর নজরদারি চালাতে নিয়োগ করেছিলেন শিবকে। তিন জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে কেউ কেউ দেড় বছরের বেশি সময় ওই কারখানায় বন্দিদশায় কাটিয়েছেন। মুজ়ফ্ফরনগরের এসএসপি সঞ্জয় বর্মা বলেন, ‘‘ভাল চাকরি, বেতন, খাবার, বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড এবং অন্য জনবহুল এলাকা থেকে শ্রমিকদের কারখানায় নিয়ে আসা হত। শুধু স্থানীয় নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিকদের আনতেন কারখানার কর্তৃপক্ষ।’’
তদন্তে জানা গিয়েছে, কাজে যোগ দেওয়ার পরই শ্রমিকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হত। শুধু তা-ই নয়, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড-সহ যাবতীয় পরিচয়পত্রও শ্রমিকদের থেকে নিয়ে নিতেন কর্তৃপক্ষ। কারখানা চত্বর ছেড়ে কোনও শ্রমিকের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আর সেই কারণে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব বা পরিজন— কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। অভিযোগ, কারখানায় তাঁদের মারধর করা হত। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকেরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁদেরকে প্রতিদিন ভোর ৪টে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হত। অসুস্থ হলেও ছাড় মিলত না। যদি কেউ প্রতিবাদ করতেন, তাঁদের লোহার রড দিয়ে মারধর করা হত।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারের পর ১২ জন শ্রমিকের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়। সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, শ্রমিকদের কারও শরীরে আঘাতের চিহ্ন, কারও হাড় ভেঙেছে, কারও শরীরে কাটার দাগ। তদন্তকারীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অত্যাচারের কারণে শ্রমিকের এমন অবস্থা হয়েছে। লোহার রড, বেল্ট, লাঠি ইত্যাদি নানা কিছু দিয়ে মারধর করার অভিযোগও উঠেছে। কেউ যাতে কাজ বন্ধ করতে না-পারেন, সেই জন্য পিটবুল দিয়ে ভয় দেখানো হত। অভিযোগ, কেউ যাতে কারখানা ছেড়ে পালিয়ে যেতে না-পারেন, সেই জন্য পাহারায় থাকত ওই হিংস্র কুকুর।
২০ ঘণ্টা কাজ করিয়ে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হত না, বলে অভিযোগ। শ্রমিকেরা পুলিশকে জানিয়েছেন, একবেলা খাবার জুটত তাঁদের। তা-ও পরিমাণে সামান্য। খাবার হিসাবে থাকত তুষের তৈরি রুটি আর অল্প তরকারি। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ওই কারখানায় বন্দিদশায় কী ভাবে তাঁদের দিন কাটত, তা বলতে গিয়ে অনেক শ্রমিকই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। পুলিশের অনুমান, অপুষ্টিকর খাবার, মাত্রাতিরিক্ত কাজ, ঘুমের অভাব, শারীরিক নির্যাতন— এই সব কারণে কারখানার মধ্যে কয়েক জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পুরো বিষয়টিই তদন্তাধীন।
সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দিলশাদ নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। কথা বলতে বলতে শিউরে উঠেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘কেউ যদি বাড়ি যেতে চাইতেন বা তিন-চার ঘণ্টার বেশি ঘুমের কথা বলতেন, তা হলে মারধর করা হত। আগরার বাসিন্দা সোনু চৌহন বলেন, ‘‘আমি দু’মাস ধরে ওই কারখানায় কাজ করছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করতে হবে। বেতন দেওয়া হবে ১৪ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু কাজে গিয়ে দেখি পুরো ছবি অন্য। প্রথমেই আমার মোবাইল, পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। কাজ শুরুর পর দেখি, কোনও সময়ের ঠিক নেই। ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করাত। ভুল হলে তো কথাই নেই। মারধরের পাশাপাশি খাবার জুটত না।’’