দু’সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতির শর্ত হিসাবে ইরান ‘হরমুজ় প্রণালী অবিলম্বে, সম্পূর্ণ এবং নিরাপদে খুলে দেওয়ার বিষয়ে’ রাজি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগর (আরর সাগরের অংশ) সংযোগরক্ষাকারী জলপথ খুলে যাওয়ার এই সম্ভাবনায় বুধবার স্বস্তি প্রকাশ করেছে ভারতীয় রফতানিকারক সংস্থাগুলির সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজ়েশনস’ (এফআইইও)। ইরানের হরমুজ় অবরোধের সিদ্ধান্তের ফলে রান্নার গ্যাসের বুকিং নিয়ে কিছু বিধিনিষেধ জারি করেছিল কেন্দ্র। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার বদল হবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তাদের আশা, হরমুজ় খোলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল এবং অন্যান্য পণ্য পরিবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০ শতাংশ আসত হরমুজ় প্রণালী হয়ে। ভারত গড়ে দৈনিক ১৯.৫ কোটি আদর্শ ঘন মিটার (এমএমএসসিএমডি) গ্যাস কেনে। এর মধ্যে ৬০ এমএমএসসিএমডি আমদানি করা হত কাতার থেকে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। কিন্তু যু্দ্ধ পরিস্থিতিতে তা তলানিতে ঠেকেছিল। হরমুজ় প্রণালী আবার চালু হওয়ার ফলে পেট্রোপণ্যের সরবরাহ-শৃঙ্খল পুরনো গতিতে ফিরবে বলে এফআইইও-র দাবি। তবে সেই সঙ্গেই ভারতীয় রফতানিকারকদের আশঙ্কা, কোনও কারণে ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি’ ভেস্তে গেলে সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে আবার।
বুধবার এফআইইও-র তরফে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই যুদ্ধবিরতি এবং নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচলে ইরানের অনুমতি দেওয়া— এই দু’টির ফলে সংঘর্ষ চলাকালীন পণ্য পরিবহণের বর্ধিত খরচ এবং বিমার প্রিমিয়াম কমতে পারে’। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় বাজারে পাঠানো পণ্যের ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচলের জট এবং বিলম্বিত চালান রফতানিকারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এফআইইও-র সভাপতি এসসি রালহান বুধবার বলেন, ‘‘যুদ্ধবিরতির ঘোষণা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিম এশিয়া ভারতীয় রফতানিকারকদের একটি প্রধান বাজার। ২০২৪-২৫ সালে ওই অঞ্চলে ভারতের বাণিজ্যের অঙ্ক ছিল ১৭৮০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১৬ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা)। রফতানি ৫৬৮৭ কোটি ডলার এবং আমদানি ১২১৬৭ কোটি ডলার।’’
রালহান জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহণে তাঁদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পেট্রোলিয়াম পণ্য ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসায়নিক ও প্লাস্টিক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, চাল, ওষুধ এবং রত্ন ও গয়নার বাণিজ্য। পশ্চিম এশিয়ার ছ’টি দেশ হল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, ওমান, বাহরিন, কাতার এবং কুয়েত। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য এই দেশগুলি রফতানি করে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার জবাবে ইরান ২ মার্চ থেকে হরমুজ় প্রণালী ‘শত্রুদেশগুলির জন্য’ বন্ধ করে দিয়েছিল। ভারতের মতো মিত্রদেশগুলিকে হরমুজ় দিয়ে তেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছিল তেহরান। কিন্তু তাতে চাহিদা মেটানো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।
ওই প্রসঙ্গের উল্লেখ করে রালহান বলেন, ‘‘বাসমতি চাল, সামুদ্রিক পণ্য এবং তাজা কৃষিপণ্যের জন্য ওই অঞ্চল সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য। কিন্তু সমুদ্রপথ স্থাভাবিক না থাকায় তাজা ফল ও সব্জির পরিবহণ খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।’’ অন্য দিকে, বুধবার ইন্ডিয়ান অয়েল ডিলার্স ফোরামের সভাপতি জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “হরমুজ় প্রণালী খুলে যাওয়ায় আমাদের দেশে তেল এবং গ্যাসের জোগান বৃদ্ধি পাবে। তবে এত তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না, কিন্তু সময় দিলে অবশ্যই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে এই পরিস্থিতিতে দাম বৃদ্ধির যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হবে বলেই আমরা মনে করছি।”