কোনও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রে ১০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের সম্ভাবনা থাকে। গোটা কাজটি হয় অত্যন্ত সংগঠিত উপায়ে। ধাপে ধাপে বিভিন্ন স্তরে বিক্রি হয় প্রশ্নপত্র। সরাসরি পড়ুয়াদের কাছে বিক্রি হয় না এগুলি। প্রশ্নপত্র বিক্রির জন্য থাকে পৃথক ‘পাইকারি’ এবং ‘খুচরো’ বাজার। বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানাচ্ছে ‘নিউজ় ১৮’।
ডাক্তারি পড়ার সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট-ইউজি ২০২৬)-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে গোটা দেশে তোলপাড় হচ্ছে। গত ৩ মে নিট-ইউজি পরীক্ষা হয়। কিন্তু তার পরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই পরীক্ষা বাতিল করে দিয়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেপথ্যে একটি অত্যন্ত সংগঠিত চক্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই চক্র কী ভাবে কাজ চালাত, কারা জড়িত সেই চক্রে— তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
প্রশ্নফাঁসের এই ধরনের চক্রগুলিতে বিভিন্ন স্তর থাকে। সেই স্তরের গঠন অনেকটা পিরামিডের মতো। চক্রগুলির মাথায় বসে থাকে ‘সলভার গ্যাং’-এর মাথা। প্রশ্নপত্রের ছাপাখানা বা যে গাড়িতে করে প্রশ্নপত্র সরবরাহ হয়— বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই সব জায়গায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যোগ থাকে এই ‘মাথা’র। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রটি এই চক্রের ‘মাথা’দের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সরাসরি এই প্রশ্নপত্র পড়ুয়াদের কাছে বিক্রি করেন না। প্রথমে তা বিক্রি হয় ‘পাইকারি’ বাজারে। প্রশ্নফাঁস চক্রের পিরামিডে ‘মাথা’র নীচেই থাকেন এলাকাভিত্তিক কয়েকজন ‘কিংপিন’। চক্রের মাথা প্রশ্নপত্রটি প্রথমে বিক্রি করেন ওই এলাকাভিত্তিক ‘কিংপিনদের’ কাছে।
‘নিউজ় ১৮’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বারের নিট পরীক্ষার ক্ষেত্রে চক্রের ‘মাথা’ ১৮০টি প্রশ্নের সেট বিক্রি করেছিলেন বলে অনুমান তদন্তকারীদের। তার বিনিময়ে তিনি ৫-১০ কোটি টাকা পেয়েছিলেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগও সবচেয়ে বেশি থাকে এই ‘মাথা’দের। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম ওএমআর শিট পূরণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন ভুয়ো অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির আড়ালে লুকিয়ে যান মাথারা। এদের মূল লক্ষ্য থাকে ‘পাইকারি’ বাজার থেকে টাকা কামিয়ে নেওয়া। এর পরে সেগুলি এলাকাভিত্তিক দালালদের কাছ থেকে কী ভাবে বিক্রি হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা থাকে না এই মাথাদের।
এর পরে পিরামিডের দ্বিতীয় স্তরে থাকেন এলাকাভিত্তিক কিছু ‘কিংপিন’ বা দালালেরা। এই দালালেরা মূলত কোটা, সিকার বা পটনার (যে শহরগুলিতে প্রচুর কোচিং সেন্টার রয়েছে) মতো শহরগুলিতে লুকিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কোনও ছোট কোচিং সেন্টার বা হোস্টেলের মালিকেরা এই ধরনের চক্রে দালালের ভূমিকায় থাকেন। পরীক্ষার ৪৮-৭২ ঘণ্টা আগে এই দালালেরা নিজেদের ‘প্রিমিয়াম গ্রাহকদের’ সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ‘নিউজ় ১৮’ জানাচ্ছে, পরীক্ষার্থীপিছু ১৫-৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয় এর জন্য। কোনও দালাল মূল মাথার কাছ থেকে ৫০ লক্ষ টাকায় প্রশ্নপত্র কিনলে, তিনি এই পর্যায়ে এসে প্রচুর লাভ করে ফেলেন। মাত্র ১০টি ধনী পরিবারের কাছে এই প্রশ্নপত্র বিক্রি করতে পারলেই তাঁর ৫০০ শতাংশ লাভ হয়ে যায়।
প্রশ্নফাঁস চক্রের তৃতীয় স্তরে থাকে স্থানীয় কিছু সহযোগী এবং ‘সলভার’ (যাঁরা প্রশ্নপত্রের প্রেক্ষিতে উত্তরপত্র তৈরি করে দেন)। সাধারণত কোনও ডাক্তারি পড়ুয়া বা কোনও মেধাবী পড়ুয়াদের দেখা যায় এই স্তরে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রটি দ্রুত সমাধান করার জন্য তাঁদের ২-৫ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। তার পরে সেই উত্তরপত্র বিলি করা হয়। এরপরে একেবারে নিচুতলায় থাকে আরও এক ধরনের দালালেরা। এই দালালেরা মূলত ‘ডেলিভারি এজেন্ট’ হিসাবে কাজ করে। পরীক্ষার সময় যত এগিয়ে আসে প্রশ্নপত্রের দামও কমতে থাকে। ‘নিউজ় ১৮’ জানাচ্ছে, পরীক্ষার আগের রাতে টেলিগ্রাম বা অন্য কোনও অনলাইন মাধ্যমে মাত্র ২৫-৫০ হাজার টাকাতেও বিক্রি হতে পারে এই ধরনের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন। এই গোটা প্রক্রিয়ায় প্রশ্নফাঁসের চক্রের মাথা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ বারের নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেপথ্যেও যে একটি অত্যন্ত সংগঠিত চক্র রয়েছে, ইতিমধ্যে সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তদন্তকারীরা। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, রাজস্থান, হরিয়ানা, কেরল, জম্মু-কাশ্মীর, তেলঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রশ্নপত্র। তবে তদন্তকারীদের সন্দেহ, দেশের আরও কয়েকটি রাজ্যেও এই চক্র কাজ করেছে। প্রশ্নপত্র ওই রাজ্যগুলিতেও পৌঁছেছে।
কী ভাবে এবং কোথা থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, তার একটা হদিস মিলেছে বলে তদন্তকারী সূত্রে খবর। ইতিমধ্যেই এই দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। তবে তদন্তকারী একটি সূত্রের দাবি, প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, এই চক্রের সদস্যেরা মহারাষ্ট্রের নাসিকে সাক্ষাৎ করেন। সেখান থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের একটি কপি পাঠানো হয় হরিয়ানায়। সেখানে পাঁচটি আলাদা আলাদা প্রশ্নের সেট তৈরি করা হয়। এক একটি সেটে ১০টি করে প্রশ্নপত্র ছিল। সেই সেট পৌঁছোয় রাজস্থানের জয়পুর, সেখান থেকে জমবারামগড় এবং তারপর ওই রাজ্যেরই সীকরে। এর পর সেই প্রশ্নপত্রের সেট আলাদা আলাদা ভাবে পৌঁছে গিয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, তেলঙ্গানা, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি এবং বিহারেও।
তদন্তকারী সূত্রে খবর, রাজস্থান পুলিশের স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি) ইতিমধ্যেই ১৫ জনকে আটক করেছে। শুধু তা-ই নয়, এই দুর্নীতির শিকড় কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী সূত্রে খবর, পরীক্ষার আগে থেকেই বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বিষয়টি নজরে আসতেই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করা হয়। সোমবার রাজ্যের সীকর জেলা থেকে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্য দিকে, জয়পুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে মণীশ নামে এক ব্যক্তিকে। সন্দেহ করা হচ্ছে, তিনি এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ‘মূলচক্রী’।
২০২৪-এও নিট পিজি-র পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের মাত্র একদিন আগে। কারণ, সে বারও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। মিলেছিল কিছু প্রমাণও। সে বার অ্যাডমিট কার্ডও হাতে পেয়ে গিয়েছিলেন পরীক্ষার্থীরা। সব স্থির থাকলেও শেষপর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে পরীক্ষা স্থগিত করে দেন কর্তৃপক্ষ। তাঁরা মনে করেছিলেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বার বার সর্বভারতীয় স্তরে প্রবেশিকা পরীক্ষা এমন বিঘ্ন ঘটনায় কেন্দ্রকে বিঁধতে শুরু করেছে বিরোধী দলগুলিও। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি উদাসিনতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে তারা। একই সঙ্গে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজনে বার বার কেন ‘ত্রুটি’ হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন বিরোধীদের।
পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিশানা করেছেন কংগ্রেস নেতা তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর তথাকথিত ‘অমৃত কাল’ দেশের জন্য ‘বিষ কাল’-এ পরিণত হয়েছে।’’ এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি ব্যর্থতা হিসাবে দেখতে নারাজ রাহুল। তাঁর অভিযোগ, এটি দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যতের প্রতি একটি অপরাধ। রাহুল লেখেন, ‘বার বার ‘প্রশ্নপত্র মাফিয়ারা’ পার পেয়ে যান। আর ফল ভুগতে হয় ছাত্রছাত্রীদের। এখনও লক্ষ লক্ষ পড়ুয়াকে ফের সেই একই মানসিক চাপ, আর্থিক বোঝা এবং অনিশ্চয়তা সহ্য করতে হবে।’ তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কে নিশানা করেছেন কেন্দ্রকে। সমাজমাধ্যমে মহুয়া লিখেছেন, ‘প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে নিট-ইউজি ২০২৬ প্রবেশিকা বাতিল হয়ে গিয়েছে। মোদী জমানায় গত এক দশকে প্রায় ১০০ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং ৫০ বার নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এ বারের ফাঁসের ঘটনায় ২০ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ কি এর দায় নেবে?’