শহরটা বহিরঙ্গে ঝকঝকে। কলকাতার মতো খোলা ময়লার ভ্যাটে উপচে পড়া আবর্জনা বা যানবাহনের কালো ধোঁয়া চোখে পড়ে না। পর-পর আট বছর দেশের ‘পরিচ্ছন্নতম শহর’ হওয়া মুখের কথা নয়! কিন্তু বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের ‘মিনি মুম্বই’ ইন্দোরের এই চাকচিক্য সরিয়ে ভিতরে যদি উঁকি দেওয়া যায়?
স্কুলের ‘ফাস্ট বয়’ আচমকা ফেল করলে সবাই যেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, গোটা দেশের সেই অবস্থা হয় গত জানুয়ারিতে। যখন ইন্দোরের প্রায় প্রাণকেন্দ্রের জনবহুল মহল্লা ভাগীরথপুরায় দূষিত পানীয় জলের জেরে চলেছিল মৃত্যুর স্রোত। প্রথমে বিজেপি সরকার জানায়, ছ’মাসের এক শিশু-সহ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখন বিজেপিরই দখলে থাকা ইন্দোর পুরসভা দাবি করছে, মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের! বাকিদের মৃত্যুর কারণ নাকি দূষিত জল নয়। যদিও বেসরকারি মতে, দূষিত জলের জন্য মৃতের সংখ্যা ৩৫-এর কম নয়। হাসপাতালে ভর্তি হন প্রায় ১৪০০। ইন্দোরের মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকর্তা মাধব প্রসাদ হাসানি জানালেন, এখনও ৩৩ জন রোগী হাসপাতালে, ৮ জন আইসিইউ-তে।
ঘটনার পরে কলকাতার কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ ইন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন’ (নিরবি)-র একটি দল হাসপাতালে ভর্তি ১৫ জন রোগীর মলের নমুনা সংগ্রহ করে আনে। চার জনের মলের নমুনায় কলেরার জীবাণু পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার অধিকর্তা শান্তসবুজ দাস। মাত্র তিন বছর আগে ২০২৩ সালের ২৮ জুন এই ভাগীরথপুরা-ই ইন্দোরের পরিচ্ছন্নতম ওয়ার্ড হিসাবে পুরস্কৃত হয়েছিল! অথচ ভাগীরথপুরার নিম্নবিত্ত মানুষেরা বলছেন, বছর তিনেক আগে থেকেই তাঁরা বার বার পুর-প্রশাসনকে হলদে রঙের, দুর্গন্ধযুক্ত পানীয় জল আসার কথা জানিয়েছেন।
আসলে ভাগীরথপুরার তিন দিক ঘিরেই পূতিগন্ধ-আবর্জনাময় নালা। এক সকালে গিয়ে দেখলাম, যন্ত্রের সাহায্যে সেই আবর্জনা কেটে, মাটি খুঁড়ে পানীয় জলের লাইন সারানোর কাজ চলছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সরু-সরু গলির দু’পাশে গায়ে-গায়ে কমবেশি ১৭০০ বাড়ি। বাস করেন প্রায় ৯ হাজার মানুষ। এক সময় এটা ছিল মালওয়া কটন মিলের শ্রমিক বস্তি। ইন্দোরের মেয়র, প্রাক্তন আইনজীবী পূষ্যমিত্র ভার্গবকে প্রশ্ন না করে পারিনি, ‘‘যে শহরের কেন্দ্রস্থলে এই দশা, সেই শহর আট বার দেশে ‘পরিচ্ছন্নতম’ হয় কোন নিক্তিতে?’’ মেয়রের জবাব, ‘‘কোন শহরে নালা পরিষ্কার থাকে আমাকে বলুন। নালা মানেই তো নোংরা।’’ তার পর গড়গড় করে বলে গেলেন, ‘জাতীয় গ্রিন ট্রাইবুনাল’-এর (এনজিটি) নির্দেশে ভূগর্ভস্থ জলের সংরক্ষণ এবং নদীদূষণ রোধে তাঁরা এখন কী কী কাজ করছেন, তার বৃত্তান্ত।
ঘটনার পর সাংবাদিকের প্রশ্নে মেজাজ হারিয়ে কুকথা বলেছিলেন মধ্যপ্রদেশের পুর-নগরোন্নয়ন মন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গীয়। ভাগীরথপুরা কৈলাসের বিধানসভা এলাকায়। তিনি এখন দাবি করলেন, ‘‘গত কয়েক বছর ধরে ভাগীরথপুরার মানুষ পানীয় জল নিয়ে অভিযোগ করছিলেন, জানতে পারিনি। কিন্তু পুরসভার কিছু কর্তা জানতেন। তাঁরা ব্যবস্থা নেননি বলে তাঁদের বরখাস্ত করা হয়েছে।’’ তাঁরই বিধানসভা এলাকায় নোংরা নালা, গায়ে-গায়ে লাগানো পানীয় জল এবং নিকাশি জলের লাইনের কথাও কি তাঁর অজানা ছিল? কৈলাসের জবাব, ‘‘পুরনো লাইন। পুরসভা জানত। ওরা কিছু করেনি।’’ এই জবাব শুনে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মেয়র পূষ্যমিত্রর। বললেন, ‘‘মিথ্যে কথা। আমাদের কেউ কোনও দিন জল খারাপ আসছে বলে জানাননি। এখন ভাগীরথপুরার ৩২টা জায়গায় নলকূপ সিল করা হয়েছে। প্রতি দিন ৬৮টি জলের ট্যাঙ্কার পানীয় জল সরবরাহ করছে।’’
ইন্দোরে জলসঙ্কট চিরকালীন। প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে নর্মদা নদী থেকে পাইপলাইনে খাওয়ার জল আসে। সকালে এক ঘণ্টা সেই জল মেলে। এর জন্য বাড়ি-পিছু মাসে ১০০ টাকা নেয় পুরসভা। অর্থাৎ টাকা দিয়ে এত দিন বিষাক্ত জল কেনেন ভাগীরথপুরার মানুষ। সেই টাকা কি আপাতত মকুব? মেয়র বলেন, ‘‘সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’’
গেরুয়া শিবির গোটা ঘটনা নিয়ে অতি স্পর্শকাতর। ভাগীরথপুরায় আড়ালে-আবডালে প্রশাসনের চরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কেউ কথা বলছেন দেখলেই হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ‘জনস্বাস্থ্য অভিযান’ সংগঠনের অমূল্য নিধি, কৃষ্ণার্জুন ভার্বে তাই এলাকায় ভোর-ভোর চলে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন ‘চর’দের নজরদারি কম থাকে! পৌঁছনোর পর তাঁরা নিয়ে গেলেন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির পাশে খোঁড়া গর্তের কাছে। উঁকি দিয়ে দেখা গেল, নোংরা নালার জলের উপরেই বসানো নর্মদার পানীয় জলের লাইন।
অমূল্য নিধি-র কথায়, ‘‘ফাঁড়িতে নতুন শৌচাগার তৈরির সময় সেপটিক ট্যাঙ্ক ঠিকমতো তৈরি হয়নি। শৌচাগারের পাইপলাইনের নীচ দিয়ে গিয়েছে পানীয় জলের পাইপলাইন। শৌচাগারের পাইপলাইন থেকে দূষিত জল চুঁইয়ে পানীয় জলের সঙ্গে মিশে এই বিপত্তি।’’ তাঁদের সংগঠনের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় নর্মদার জলের লাইন ফুটো। সেখান দিয়ে নিকাশির নোংরা জল ঢুকছে। বহু নলকূপের জলও দূষিত।
আশি ছুঁইছুঁই দীগম্বর ভারে-র বাড়ি যাওয়া হল। হুকুমচাঁদ কাপড় মিলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। প্রায় ৪০ বছর এই পাড়ায় থাকেন। ছয় মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী মঞ্জুলা ভারে ছিলেন একমাত্র সঙ্গী। দূষিত জল মঞ্জুলাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। মাথায় হাত দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে দীগম্বর বলেন, ‘‘হাম গরিবোঁকা মুকদ্দর কা দোষ। ওউর কিসিকো দোষ দেনে কা অওকাত নেহি হ্যায়। (সবই আমাদের মতো গরিবদের কপালের দোষ। অন্য কাউকে দোষ দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।)’’
আশ্চর্যের কথা, ‘কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব ইন্ডিয়া’-র ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইন্দোর ও ভোপাল পুরসভায় প্রায় ৮ লক্ষ ৯৫ হাজার পরিবারে দূষিত পানীয় জল সরবরাহ হচ্ছে। অথচ, খাতায়কলমে ইন্দোর পুরসভা তাদের বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ টাকা শুদ্ধ পানীয় জলের জন্য খরচ করছে! ২০২১-২২ সালে তারা ১৬৮০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ সালে ২৩১০ কোটি টাকা পানীয় জল ও নিকাশিতে খরচ করেছিল। টাকাগুলো গেল কোথায়?
এখানেই শেষ নয়। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইন্দোর প্রশাসন নাকি ‘অম্রুত’ প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে পরিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য! তার পরেও শতচ্ছিদ্র পানীয় জলের পাইপলাইন মেরামত হয়নি। জানুয়ারিতে মৃত্যু মিছিলের পর ‘জনস্বাস্থ্য অভিযানে’র তরফে ইন্দোর পুরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৪টি মহল্লায় একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে ৮৯ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন, তাঁরা ২৪ ঘণ্টার পানীয় জল জীবনে পাননি। অথচ এর জন্য ২০০৪ সালেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক’ থেকে ১৩৬৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এ হেন অবস্থায় ভাগীরথপুরায় ট্যাঙ্কারের জল খেতেও ভয় পাচ্ছেন মানুষ।
পরিচ্ছন্নতম শহরের নাগরিকের শুদ্ধ পানীয় জলের অধিকার যে ভেসে গিয়েছে নর্মদার জলে। না কিনর্দমার জলে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)