জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে হত্যালীলা চালানোর আগে জঙ্গিরা বৈসরণ উপত্যকায় একটি গাছের নীচে বসে রুটি খেয়েছিল। ঘটনাচক্রে, সেই রুটি বানিয়ে দিয়েছিল স্থানীয় একটি পরিবার। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে কী ভাবে জঙ্গিরা হামলার ছক কষেছিল, ১৫৯৭ পাতার চার্জশিটে তা জানাল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন পাক জঙ্গি ফয়জ়ল জাট ওরফে সুলেমান শাহ, হাবিব তাহির ওরফে জিবরাম এবং হামজ়া আফগানি— এই তিন জঙ্গি বৈসরণে পর্যটকদের উপর হামলা চালায়। যে ঘটনায় ২৫ পর্যটক এবং স্থানীয় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল। গত বছরের ২৯ জুলাই সেনার ‘মহাদেব’ অভিযানে হামলাকারী তিন জঙ্গি নিহত হয়। চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, হামলার এক দিন আগে বৈসরণের স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ আহমেদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল জঙ্গিরা। সেই ঘটনায় গ্রেফতার পারভেজ।
তদন্তকারীদের কাছে পারভেজ দাবি করেছেন, ২১ এপ্রিল বিকেল ৫টার সময় ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির দাওয়ায় বসেছিলেন। সেই সময় তাঁর মামা বশির আহমেদ বাড়িতে আসেন। তাঁদের বলেন যে, কোনও রকম চেঁচামেচি যেন না হয়। এই কথা বলেই বেরিয়ে যান বশির। পারভেজের কথায়, ‘‘কিছু ক্ষণ পর মামা ফিরে আসে। সঙ্গে আরও তিন জন। তাদের সঙ্গে বন্দুক ছিল। বাড়ির ভিতরে এসে বসল তিন জন। আমার কাছে জল খেতে চাইল। বলল অনেক দূর থেকে এসেছি, জলতেষ্টা পেয়েছে।’’
চার্জশিটে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, তদন্তকারীদের পারভেজ জানান, তিনি ওই জনকে জল দেন। তাঁর কথায়, ‘‘জল খাওয়ার পর তিন অজ্ঞাতপরিচয় আমাকে বলে, তুমি ‘সওয়াব’ পাবে। যারা কাশ্মীরি মুসলিমদের মুক্তির জন্য জিহাদে নেমেছে, তাদের জল দিয়ে আল্লার আশীর্বাদ অর্জন করেছ তুমি।’’ পারভেজের দাবি, অজ্ঞাতপরিচয়েরা উর্দু এবং পঞ্জাবি মিশ্রিত ভাষায় কথা বলছিল। তাঁদের কোনও ভাবে কাশ্মীরি বলে মনে হয়নি তাঁর। তখনই তিনি বুঝেছিলেন ওরা মুজাহিদ। পারভেজ বলেন, ‘‘ওরা আমাকে কয়েকটা ব্যাগ দিয়ে বলল এগুলি লুকিয়ে রাখো। আমি ওদের কথামতো বিছানার নীচে ব্যাগগুলি লুকিয়ে রাখলাম। তিন জন রাতে বেশি কিছু ক্ষণ আমার বাড়িতেই ছিল। বৌকে বলেছিলাম ওদের জন্য চায়ের ব্যবস্থা করো।’’
পারভেজ জানান, তিন জনের খাবার ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। খাওয়াদাওয়া সেরে কয়েকটি রুটি সঙ্গে নিয়ে রাত ১০টায় তিন জনেই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২২ এপ্রিল বৈসরণে অপেক্ষা করছিল জঙ্গিরা। সেখানে গাছের নীচে বসে সঙ্গে আনা রুটি দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারে তিন জঙ্গি। খাওয়াদাওয়া সেরে ব্যাগ থেকে কম্বল বার করে নিজেদের গায়ে জড়িয়ে নেয়। যেখানে বৈসরণ উপত্যকায় নদী বয়ে গিয়েছে সেই দিকে এগিয়ে যায় দুই জঙ্গি। সেখানে গিয়ে বসে তারা। সেখান থেকে কিছু ক্ষণ পর্যটকদের গতিবিধি লক্ষ্য করে। তার পর তারা আবার ফিরে আসে আগের জায়গায় যেখানে বসে খাওয়াদাওয়া সেরেছিল। তার পর ব্যাগ নিয়ে আবার নদীর ধারে ফিরে যায় তারা। সেখানে গিয়ে ব্যাগ থেকে বন্দুক বার করে। তিন জঙ্গির মধ্যে এক জন গোপ্রো ক্যামেরা পড়ে নেয়। তার পর পার্কে প্রবেশ করে।
তিন জঙ্গির মধ্যে দু’জন পার্কের প্রবেশপথের দিকে যায়। তৃতীয় জন জিপলাইনের শেষ প্রান্তে যায়। দুপুর ২টো ৩৩ মিনিটে তাদের মধ্যে এক জঙ্গি এম-৪ কার্বাইন দিয়ে প্রথম গুলি চালানো শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাকি দুই জঙ্গি একে ৪৭ দিয়ে পর্যটকদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘দক্ষিণে জ়িপলাইন থেকে এক জন এবং উত্তরে পার্কের মূল প্রবেশপথ থেকে দু’জন গুলি চালাতে থাকায় পর্যটকদের বাইরে বার হওয়ার রাস্তা পুরো বন্ধ হয়ে যায়। পর্যটকদের তাড়িয়ে মাঠের মাঝে নিয়ে আসে। তার পর গুলি চালানো হয়। হত্যালীলা শেষে জঙ্গিরা পালানোর সময় গাছের পিছনে লুকিয়ে থাকা তিন পর্যটককেও কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। পালানোর সময় এক ব্যক্তিকে জঙ্গিরা ‘কলমা’ পড়তে বলে। ওই ব্যক্তি ‘কলমা’ পড়তেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার পর পার্ক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শূন্যে গুলি চালিয়ে হত্যালীলা উদ্যাপন করে জঙ্গিরা।