ঘাসফুলের বদলে ফুলকপি।
রুমাল থেকে বেড়ালের গল্প নয়। তৃণমূল থেকে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস হওয়ার গল্প।
একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্ন ছিল তৃণমূল জাতীয় দল হবে। তাই মণিপুর, অরুণাচলের মতো তৃণমূলের শাখা খোলেন কেরলেও। সে বছর তিনেক আগের কথা। মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসার পরে দিল্লিও দূর অস্ত্ নয় বলে মনে হচ্ছিল। এখন পশ্চিমবঙ্গেই সরকার টিকিয়ে রাখতে নাজেহাল তৃণমূল নেতৃত্বের অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। তাই কেরলে ভোটে লড়লেও ঘাসফুল প্রতীক জোটেনি। ১৪০টির মধ্যে ১২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে তৃণমূল। কোথাও প্রতীক ফুলকপি, কোথাও টেলিফোন বা আংটি।
বিপদটা এসেছে ভোটের এক সপ্তাহ আগে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস স্বীকৃত জাতীয় রাজনৈতিক দল নয়। তৃণমূলের কোনও প্রার্থী মনোনয়নের সময় ফর্ম-এ জমা দেননি। নিয়ম অনুযায়ী, এই ফর্ম-এ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে জমা দেওয়া হয়। কেরলে তা হয়নি। বিপদ দেখে সোমবার কোচিতে দলের রাজ্য কমিটির বৈঠক ডাকেন কেরল তৃণমূলের সভাপতি মনোজ শঙ্করানেল্লুর। সব জেলার নেতারাও এসে জড়ো হন। সকলেই পুরনো কংগ্রেসি। ইন্দিরা গাঁধীর মতোই মমতাকে ‘আয়রন লেডি’ বলে মনে হয়েছিল। এখন মাথায় হাত। প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। যেটুকু ফ্লেক্স-ব্যানার লাগানো হয়েছে, সেখানে ‘দিদি’-র ছবির পাশে ঘাসফুল। সিদ্ধান্ত হয়েছে, ঘাসফুল ফুলকপি দিয়ে ঢাকতে হবে। কোথাও বলা হবে, তৃণমূল সমর্থিত নির্দল প্রার্থী। দলীয় ঐতিহ্য মেনে কেরলের তৃণমূল নেতারাও ‘ষড়যন্ত্র’-র গন্ধ পাচ্ছেন। সিপিএমের নয়, কংগ্রেসের। যুক্তি, নির্বাচন কমিশন ঘাসফুল চিহ্নে সবুজ সঙ্কেত দিলেও রাজ্য কমিশন বাদ সেধেছে। বাস্তব হল, কমিশনের নির্দেশের বিরুদ্ধে কেরালা হাইকোর্টে আর্জি জানিয়েছিলেন তৃণমূলের দুই নেতা। তা-ও খারিজ হয়ে গিয়েছে।
এর আগে মণিপুর, অরুণাচলে বিধানসভায় আসন জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু বিধায়কদের দলবদল করতে বেশি সময় লাগেনি। কেরল নিয়ে প্রথম থেকেই দোনমনা ভাব তৃণমূল নেতৃত্বের। মনোজ তিরুঅনন্তপুরমে ৭০ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দেওয়ার পরে ডেরেক ও’ব্রায়েন টুইটে জানান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনও নাম অনুমোদন করেননি। কেরলের সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র কাকোরি বলেন, ‘‘তার পর কলকাতায় গিয়ে মুকুল রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েনের সঙ্গে দেখা করে প্রার্থী তালিকা অনুমোদন করিয়ে এনেছি। সব প্রার্থীর বায়োডেটা জমা দিতে হয়েছে।’’ তা হলে ফর্ম-এ জমা পড়ল না কেন? সুরেন্দ্রর জবাব, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ব্যস্ত নেতারা। তাই বোধহয় দিতে ভুলে গিয়েছেন।’’
তা-ও মেনে নিয়েছিলেন কেরলের নেতারা। কিন্তু ভোটে লড়তে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এক পাইপয়সাও দিতে রাজি নন দেখে তাঁরা চিন্তায় পড়েছেন। আর এক সাধারণ সম্পাদক এল সি পরামবিলের অনুযোগ, ‘‘এক এক জন প্রার্থীর ভোটে লড়তে অন্তত দু’তিন লক্ষ টাকা খরচ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব টাকা না দিলে কোথা থেকে খরচ উঠবে?’’
তৃণমূলের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে তো ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নারদ নিউজের ভিডিও দেখেছেন? প্রশ্ন শুনে সুরেন্দ্র বলেন, ‘‘ডোনেশন তো নিতেই হবে। না হলে দল চলবে কী করে? কিন্তু আমরা তো পকেট থেকে টাকা দিয়ে ভোটে লড়ছি।’’
কেরলের নেতাদের আর্জি ছিল, মমতা আসুন। কেরলে যুযুধান বাম-কংগ্রেসের বাংলায় জোটের কথা প্রচার করুন। ত্রিশূরে থেক্কিনকাড়ু ময়দানে জনসভা করারও প্রস্তাব জানিয়ে তাঁরা দলনেত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন। মমতা তো দূরের কথা, কলকাতা থেকে অন্য কোনও নেতাও আসতে রাজি হননি।
লোকসভা ভোটে কেরলের পাঁচটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তৃণমূল। সে বার ঘাসফুল প্রতীক থাকলেও ফুল ফোটেনি। পঞ্চায়েতে ৮০ জন প্রার্থী দিয়ে সাকুল্যে ২ হাজার ভোট জোেট। এ বার কী হবে? রাজ্য কমিটির নেতা সুভাষ কুন্ডান্নুরের জবাব, ‘‘আমরা ১৪টা জেলায় কমিটি গড়েছিলাম। ভাল ফল হতে পারত। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাহায্য পাচ্ছি না।’’