পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়তে পারে—মোদী সরকারের তেলমন্ত্রীর পরে এমন ইঙ্গিত দিলেন রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরও।
মঙ্গলবারই তেলমন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী বলেছিলেন, তেলের দাম যে আর বাড়বে না, সে কথা তিনি বলছেন না। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্র বুধবার জানান, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ না থামলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তাঁর বক্তব্য, “যদি এই সমস্যা দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তা হলে সরকারের দিক থেকে বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কিছুটা ভার সাধারণ মানুষের উপরে চাপিয়ে দেওয়াটা নিছক সময়ের অপেক্ষা।”
ইরান যুদ্ধের সঙ্কটের সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রবিবারই দেশের মানুষের কাছে পেট্রল, ডিজ়েল থেকে ভোজ্য তেলে খরচ কমাতে বলেছিলেন। বলেছিলেন সোনা কেনা কমাতে, অপ্রয়োজনে বিদেশ সফর না করতে। এর প্রধান লক্ষ্য, বিদেশি মুদ্রা বা ডলার সাশ্রয় করা। কারণ, বেশি দামে অশোধিত তেল কিনতে গিয়ে বিপুল ডলার খরচ হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতে আমদানি করা ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭২ ডলার। এখন তা ১০০ ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধির অর্থ, ভারতের আমদানি খরচ ১৩০০-১৪০০ কোটি ডলার বেড়ে যাওয়া, যা দেশের জিডিপি-র ০.৪ শতাংশের সমান।
মোদী সরকার যে শুধু ‘কৃচ্ছ্রসাধনের অনুরোধ’ করেই থামবে না, তা কার্যকর করতে পদক্ষেপ করবে, তার ইঙ্গিত মিলেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে সোনা, রুপো ও দামি ধাতুর উপরে আমদানি শুল্ক ৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করা হয়েছে। আমদানির খরচ কমাতে, টাকার পতন রুখতে, বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয়ে সোনা বিক্রি কমানোর জন্যই এই পদক্ষেপ। তবে এই সিদ্ধান্তের পরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্র বারাণসীতে স্বর্ণব্যবসায়ীরা আজ ঝালমুড়ি বিক্রি করে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের দাবি, এ সবের ফলে তাঁদের ব্যবসা মার খাবে, তখন ঝালমুড়ি বেচেই সংসার চালাতে হবে।
এ দিন অবশ্য তেল ব্যবহার কমিয়ে ‘কৃচ্ছ্রসাধনের দৃষ্টান্ত’ তৈরি করতে প্রধানমন্ত্রী থেকে সমস্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তাঁদের কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমাতে নির্দেশ দিয়েছেন। কনভয়ে বেশি করে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি ব্যবহারের চেষ্টাও হচ্ছে। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাসভবন থেকে মাত্র দু’টি গাড়ি নিয়ে সেবাতীর্থে মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে যান। সূত্রের খবর, সব সময় যে প্রধানমন্ত্রী মাত্র দু’টি গাড়ি নিয়ে চলবেন, তা নয়। তবে তাঁর কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা অর্ধেক করা হচ্ছে। এবং তা করা হচ্ছে এসপিজি-র নিরাপত্তার নিয়মকানুন মেনেই। এসপিজি-র নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে তৈরি ‘ব্লু বুক’ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ে ১৪-১৭টি গাড়ি থাকে। রাজ্য সফরে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩০-৪০টি হয়ে যায়। বিরোধীদের প্রশ্ন, যদি অর্ধেক গাড়িতেই হয়ে যায়, তা হলে মোদী গত ১২ বছর দ্বিগুণ গাড়ির কনভয় নিয়ে ঘুরছিলেন কেন?
অমিত শাহ, রাজনাথ সিংহ, জে পি নড্ডার মতো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমে চারটি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ মাত্র একটি গাড়ি নিয়ে দফতরে যান। কেন্দ্রের সমস্ত মন্ত্রককে জ্বালানির খরচ কমাতে বলা হয়েছে। বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীরাও কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমাচ্ছেন।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, মন্ত্রীরা গাড়ি কমিয়ে তেলের খরচ কমাতে পারেন, সাধারণ মানুষ তা করবেন না। সে ক্ষেত্রে সোনার মতো পেট্রল, ডিজ়েলেরও দাম বাড়ালে তেলের বিক্রি কমবে। তাতে তেল আমদানি তথা আমদানি খরচও কমবে। এবং বর্ধিত তেলের দামের বোঝা পুরোটা রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে বহন করতে হবে না। সরকারের চিন্তার কারণ, বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়লেও মার্চের তুলনায় এপ্রিলে তেল বিক্রি প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের একাংশের মত, পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনে প্রচার, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের জন্যও জ্বালানি বেশি খরচ হয়েছে।
অপ্রয়োজনে বিদেশযাত্রাও কমাতে অনুরোধ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজে নির্ধারিত কর্মসূচি মেনে শুক্রবার সাত দিনের জন্য পাঁচ দেশের সফরে রওনা হচ্ছেন। অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর, তবে অর্থমন্ত্রীর রাশিয়ায় ব্রিকস ব্যাঙ্কের বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের আগামী সপ্তাহে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া সফর রয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, সাধারণ মানুষের বিদেশযাত্রা, বিশেষত বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়ায় রাশ টানতে ট্রাভেল এজেন্টদের ‘ট্যুর প্যাকেজ’-এ কর বা টিডিএস (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স)-এর হার বাড়ানো হতে পারে। আগে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিদেশ সফরের খরচে ৫%, তার উপরে ১০% টিডিএস দিতে হত। এ বারের বাজেটেই তা কমিয়ে ২% করা হয়েছে। যুক্তি ছিল, মধ্যবিত্তের বিদেশ সফর সহজ হবে। এখন সেই টিডিএস-এর হার ফের বাড়ানো হতে পারে। কেউ নিজে বিমানের টিকিট কেটে, হোটেল ‘বুক’ করে বিদেশ গেলে এই টিডিএস দিতে হয় না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)