সুন্দর হওয়ার একটা মাপকাঠি আছে। সেই মাপকাঠি কে ঠিক করে দিয়েছে, কেনই বা তার সীমারেখা কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের চৌহদ্দিতে সঙ্কুচিত, তা জানা নেই। তবে ওই মাপকাঠির জেরে প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন অনেকেই। আগে এই সমস্যার কোনও নাম ছিল না। ইদানীং হয়েছে। রূপচর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে এক অদ্ভুত অসুখ। যার নাম ‘বিউটি অ্যাংজ়াইটি’।
বিষয়টি আর কিছুই নয়, নিজের বাহ্যিক রূপ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা এবং সামাজিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘নিখুঁত’ দেখতে না হওয়ার ফলে মানসিক কষ্টে ভোগা। সেখানে ‘ভিলেন’ আর কেউ নয়, নিজের ঘরের অতি প্রিয় আয়না!
আয়না কি সত্যিই মানসিক চাপের কারণ?
আয়নার সামনে দীর্ঘ ক্ষণ থাকতে ভালবাসেন অনেকেই। নিজের রূপে মুগ্ধ হওয়া দোষের নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টোটাই। আয়নার সামনে বেশি ক্ষণ থাকলে নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্য উপভোগ করার বদলে অনেক সময়ে নানা রকমের খুঁত নজরে পড়ছে বেশি করে। তখন আয়নাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানসিক চাপের বড় কারণ। একে বলা হয় ‘মিরর অ্যাংজ়াইটি’।
কেন এই সমস্যা বাড়ছে?
সোশ্যাল মিডিয়া ও ফিল্টার সংস্কৃতি এর মূলে।
ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক বা বিভিন্ন অ্যাপ-এ‘বিউটি ফিল্টারে’ মুহূর্তে মুখের দাগ মিলিয়ে যাচ্ছে, শরীরের গড়ন হয়ে যাচ্ছে নিখুঁত। সেই ছবি পোস্ট করে নিজের এক ‘অবাস্তব’ বা কাল্পনিক সৌন্দর্য জনসমক্ষে তুলে ধরছেন মানুষ। সেই সঙ্গে নিজের মনেও নিজের ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করছেন। ফলে যখন সেই মানুষটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছেন এবং সেই ফিল্টার করা চেহারার সঙ্গে অমিল দেখতে পাচ্ছেন, তখন নিজের তৈরি করা কল্পনার জগতের সঙ্গে নিজেই পাল্লা দিতে পারছেন না। ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
অবশ্য রূপ নিয়ে উদ্বেগের একমাত্র কারণ এটিই নয়।
বাজারে এখন অ্যান্টি-এজিং অর্থাৎ বয়স কমানোর প্রসাধনীর ছড়াছড়ি। বয়সের ছাপ দূরে রাখতে ১৮-২০ বছর বয়স থেকেই কসমেটিক ট্রিটমেন্ট বা দামি প্রসাধনী ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে বিজ্ঞাপনে। তাতে মানুষ প্রভাবিতও হচ্ছেন। ব্র্যান্ডগুলোই নিজেদের স্বার্থে অমূলক ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের মনে। সরাসরি আঘাত আনছে আত্মবিশ্বাসে। স্বাভাবিকত্বকে ঘৃণা করতে শেখাচ্ছে। আর সেই সব বিজ্ঞাপন দেখেই আরও বেশি করে নিখুঁত গ্লাস স্কিন বা নির্মেদ চেহারা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ।
প্রতিকারের উপায় কী?
বিউটি অ্যাংজ়াইটি’ থেকে বাঁচতে প্রথমেই যা প্রয়োজন, তা হল, নিজের শরীর বা ত্বক নিয়ে কোনও রকম মালিন্য না থাকা। এটা বুঝতে হবে, প্রতিটি মানুষই অন্য জনের থেকে আলাদা আর এই পার্থক্যেই লুকিয়ে আসল সৌন্দর্য। সমাজও এখন ‘প্লাস সাইজ়’কে মর্যাদা দিচ্ছে। ফ্যাশনদুনিয়ায় কৃষ্ণকলি মডেলদের পরানো হচ্ছে সেরা পোশাক। আসলে পুরোটাই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। নিজে যদি আত্মবিশ্বাসী হন, তবে সেটাই সৌন্দর্য হয়ে ফুটে বেরোবে আপনার ব্যক্তিত্বে।
এক পর্যটকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে বলা যেতে পারে। ধর্মস্থানের হাত ধোয়ার বেসিনে হাত ধুতে গিয়ে তিনি দেখলেন, বেসিনের উপরের দেওয়ালে কোনও আয়না নেই। যেমনটা সচরাচর থাকে। বদলে ফাঁকা দেওয়ালে লেখা আছে, ‘ইউ আর বিউটিফুল’ অর্থাৎ ‘আপনি সুন্দর’। অর্থাৎ রূপ কেমন তার নম্বর আয়না দেবে না। দেবেন আপনি। নিজেকে নিজেই।