পোশাক নিয়ে পোশাকি কথাবার্তা শুরু করার আগে চলুন, পোশাক ব্যাপারটা আসলে কী, তা বোঝার চেষ্টা করি। মানে খুব সহজ ভাবে পোশাকের দর্শনকে তলিয়ে ভাবার চেষ্টা করি। পোশাক অর্থাৎ যাকে আমরা ‘বসন’ বলি, তার ফাংশনাল স্বরূপটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা পোশাক পরি লজ্জা নিবারণের জন্য। নিজেকে আবৃত রাখার জন্য। আবার পাশাপাশি নিজেকে মেলে ধরার জন্য, প্রকাশ করার মাধ্যমও পোশাকই। দু’টি পরস্পরবিরোধী গুণই পোশাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পোশাক একই সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিসত্তাকে আবৃত করে, আবার উন্মোচিতও করে।
এ তো গেল পোশাক নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা। এখন, এই যে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে উন্মোচনের প্রয়াস, তারও নানা রকম পদ্ধতি আছে। নামী-দামি ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, তার সঙ্গে জুতো, ব্যাগ, গয়নায় আপনার ওয়ারড্রোব যদি উপচে ওঠে, তবে এই শর্ত পূরণ তেমন কঠিন নয়। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হল নিজেকে মেলে ধরার এই উপস্থাপনায় সাজপোশাকের বিভিন্ন কুশীলবদের পারস্পরিক বোঝাপড়া। কে কার সঙ্গে বেশ মানিয়ে থাকবে, কাদের মধ্যে আপাত মিলমিশের অভাব থাকলেও বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় থাকবে না, কে নিজেকে নানা রূপে প্রকাশে পারদর্শী— এমন সব খুঁটিনাটি সাজপোশাকের সাজঘরে বিরাজমান। এবং সাজঘরের নানা চরিত্রের মনের কথা বুঝে ফেলার মুনশিয়ানা যার যত বেশি, ফ্যাশনের দৌড়ে সে তত এগিয়ে।
পোশাক একই সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিসত্তাকে আবৃত করে, আবার উন্মোচিতও করে। — নিজস্ব চিত্র
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমরা যখন নিজেকে সাজিয়ে তুলি, সব সময়েই তার পিছনে একটা যত্ন থাকে। সবচেয়ে সুন্দরী হয়ে ওঠার একটা বাসনা থাকে। এর সঙ্গে চাই নান্দনিকতাবোধ, অর্থাৎ সাজঘরের চরিত্রদের মন পাঠ করার ক্ষমতা, আর চাই বুদ্ধি। আপনার ভাঁড়ারে কাজু, পেস্তা, কিশমিশ, ঘি, ফাইন বাসমতী চাল থাকলে পোলাও, বিরিয়ানি রাঁধা অনেকটাই সহজ। কিন্তু যাঁর ভাঁড়ারে আয়োজনের তত আড়ম্বর নেই, তিনিও কিন্তু সুস্বাদু পদে আপ্যায়ন সারতে পারেন। হ্যাঁ, তাঁর পরিস্থিতি তুলনায় কঠিন। আবার, কঠিন পরিস্থিতিই তো নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়!
একটাই পোশাক, তাকে তিন ভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। মানে, ওই কুশীলবদের সংলাপ পালটে পালটে যাবে। লুক বদলে যাবে, মনে হবে নতুন পোশাক, আলাদা পোশাক। একেবারে ইউনিক। কেতাবি লব্জে যাকে বলা হয় ‘মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ’।
পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় গুণী ডিজ়াইনার। বুননে, রঙে, জামদানি কাজে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট তিনি চালিয়ে যান। পারমিতা তাঁর কালেকশন থেকে নিয়ে এসেছেন ‘মঞ্জিষ্ঠা’ আনোখি ড্রেস। এই কাপড়ের বুননেই কালার ব্লকিং, মানে মঞ্জিষ্ঠা লাল বোনা হয়েছে মেরুন, রাস্ট, সোনালি বুটি দেওয়া বার্গন্ডি জামদানির টানাপড়েনে। এই ড্রেসটির দু’পাশে পান্নাসবুজ আর ইন্ডগোর কুঁচি। চলাফেরায় তৈরি হয় আলছায়ার মায়া। এই মায়াবী পোশাক পরানোর জন্য মুম্বই থেকে ডেকে নিয়েছিলাম জুহি বব্বরকে। রাজ বব্বর আর নাদিরা বব্বরের মেয়ে, বিশিষ্ট থিয়েটার অভিনেত্রী। ওঁর গল্প আলাদা করে অন্য কলামে লিখব শিগগিরি।
এই মায়াবী পোশাক পরানোর জন্য মুম্বই থেকে ডেকে নিয়েছিলাম জুহি বব্বরকে। — নিজস্ব চিত্র।
আলোছায়ার মায়ামাখা এই সিম্পল পোশাকটি ড্রেস হিসেবে তো পরা যায়ই, সঙ্গে জুতি। জুতি হল সব সময়ের মুশকিল আসান। একজোড়া সব সময় সঙ্গে রাখবেন। এই ড্রেসই হয়ে উঠবে কুর্তা-পাজামা সেট, যদি একটা প্যান্ট যোগ করে দেওয়া যায়। আবার জরি স্ট্রাইপের রাজকীয় ময়ুরকন্ঠী দোপাট্টায় গ্ল্যামারাস।
ফ্যাশনে এই টিমিং আপ, কার সঙ্গে কাকে মেলাব, এক অত্যন্ত জরুরি ক্ষেত্র। এই ঘটকালিতে যথেষ্ট বাহাদুরি লাগে। ব্যবহারিক দিক থেকে দেখতে গেলে, রাশিকৃত জামাকাপড়ের ভিড়ে ওয়ারড্রোবের সামনে দাঁড়িয়ে কী পড়ব ভেবে মাথার চুল ছিঁড়তে হবে না। সীমিত সংখ্যক পোশাকেই নিত্যনতুন লুক তৈরি করতে পারবেন। এবং সে সব হবে একান্তই আপনার ক্রিয়েশন। যে কোনও ব্র্যান্ডের চেয়ে নিঃসন্দেহে তা অনেক বেশি মূল্যবান। তিন রকম রং কিংবা তিন রকম টেক্সচারের কাপড়ের মিলমিশে গড়ে উঠতে পারে নতুন লুক।
গোড়ায় বসনের কথা বলেছিলাম। এক পোশাকে নানা মায়া তৈরিতে জরুরি ভূষণ। তাই তো আমরা বলে থাকি, ‘বসন-ভূষণ’। পোশাকে আবৃত করে তার পর তাকে সাজানোর পালা। গয়না, জুতো, স্কার্ফ, ব্যাগ— এরা সব হল সহযোগী শিল্পী। এদের সঙ্গতে সাজঘরের সংলাপ বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।
মঞ্জিষ্ঠা আনোখি ড্রেস জরি স্ট্রাইপের রাজকীয় ময়ুরকন্ঠী দোপাট্টার আলিঙ্গনে যখন ভূষিত হয়ে ওঠে, বলতে ইচ্ছে করে, ‘‘নয়নে চরণে বসনে ভূষণে গাহো গো মোহন রাগ-রাগিণী।’’
মোহন রাগ-রাগিণী বেজে ওঠাতেই ফ্যাশনে টিমিং আপের সার্থকতা।
(মডেল: জুহি বব্বর, ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসু ঠাকুর)