প্রশ্ন: থাইরয়েড কী?

উত্তর: থাইরয়েড একটি গ্রন্থি যা আমাদের গলায় শ্বাসনালির সামনের দিকে অবস্থিত। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন মানুষের শরীরের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন বিপাক ক্রিয়া, বাচ্চাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, বুদ্ধির বিকাশ, বয়ঃসন্ধির লক্ষণ, মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্র, গর্ভধারণ—এগুলি নির্ভর করে থাইরয়েড গ্রন্থির থেকে নিঃসৃত হরমোনের উপরে। থাইরয়েড হরমোন দু’প্রকার টি-থ্রি ও টি-ফোর। আমাদের শরীরের রক্তে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় এই হরমোন থাকে। কোনও কারণে এই হরমোনগুলি বেড়ে বা কমে গেলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

প্রশ্ন: থাইরয়েডে কী কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: থাইরয়েডের সমস্যা প্রধানত দুই ধরনের— ১) হাইপারথাইরয়েডিজ়ম (Hyperthyroidism)— এ ক্ষেত্রে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ২) হাইপোথাইরয়েডিজ়ম (Hypothyroidsm)— এ ক্ষেত্রে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ কমে যায়।

প্রশ্ন: হাইপারথাইরয়েডিজ়ম হলে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে?

উত্তর: রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোন আধিক্যের জন্য নানা উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, বুক ধড়ফড় করা, ওজন কমে যাওয়া, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, চোখের আকার বেড়ে যাওয়া, গরম সহ্য না হওয়া, ঋতুস্রাবের সমস্যা, এমনকি, মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হলে কী উপসর্গ দেখা দেয়?

উত্তর: হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হলে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, দুর্বলতা, ওজনবৃদ্ধি, বেশি ঠান্ডা লাগা, পেশি এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, চুল পড়ে যাওয়া, পা ও মুখ ফুলে যায়, গলার স্বর পাল্টে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া, মনে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া, কিছু ভাল না লাগা (ডিপ্রেশন), কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিয়মিত ও অতিরিক্ত ঋতুস্রাব হওয়া ইত্যাদি। গর্ভাবস্থায় এই রোগ থাকলে বাচ্চার নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। জন্মের পরেই কোনও শিশু এই রোগে আক্রান্ত হলে তার বুদ্ধির স্বাভাবিক বিকাশ, পড়াশোনা, বয়ঃসন্ধির সময়ে নানা সমস্যা হতে পারে।

মনে রাখুন

  • থাইরয়েড একটি গ্রন্থি যা আমাদের গলায় শ্বাসনালির সামনের দিকে অবস্থিত।

  • থাইরয়েড হরমোন দু’প্রকার টি-থ্রি ও টি-ফোর। আমাদের শরীরের রক্তে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় এই হরমোন থাকে।

  • থাইরয়েডের সমস্যা প্রধানত দুই ধরনের—হাইপারথাইরয়েডিজ়মে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর হাইপোথাইরয়েডিজ়মে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ কমে যায়। 

  • রক্তের এফটি-ফোর এবং টিএসএইচের মাত্রা, থাইরয়েড গ্রন্থির আল্ট্রাসাউন্ড, অ্যান্টি টিপিও অ্যান্টিবডি, থাইরয়েড স্টিমিউলেটিং, ইমিউনোগ্লোবিউলিন ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা  হয়।

প্রশ্ন: থাইরয়েডের এই সব সমস্যা কেন হয়?

উত্তর: বিভিন্ন কারণে থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে। যেমন, হাইপোথাইরয়েডিজ়ম মূলত দেখা যায়— ১) খাদ্যে আয়োডিনের অভাব, ২) কিছু অটো ইমিউনি ডিসঅর্ডার ৩) থাইরয়েডের অপারেশন হলে, ৪) রেডিয়েশন থেরাপি নিলে, ৫) কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন লিথিয়াম, অ্যামিওডারোন, ৬) জন্মের সময়ে থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি না হওয়া, কিছু উৎসেচক ঠিকঠাক কাজ না করা, ৭) কিছু খাদ্য উপাদান বেশি পরিমাণে খেলে, যেমন, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পুঁইশাক, মিষ্টি আলু, মটরশুটি, কাসাভা, পিচফল, স্ট্রবেরি ইত্যাদি।

হাইপারথাইরয়েডিজ়ম এর মূল কারণগুলি হল-১) অটো ইমিউননি ডিসঅর্ডার যেমন গ্রেভস ডিজ়িজ, ২) থাইরয়েড হরমোন বেশি পরিমান হলে, ৩) থাইরয়েড গ্রন্থির সংক্রমণ হলে, ৪) কিছু ধরনের থাইরয়েড টিউমার হলে।

প্রশ্ন: থাইরয়েডের রোগ নির্ণয়ের জন্য আমরা কী কী পরীক্ষা করাতে পারি?

উত্তর: ১) এফটি-ফোর এবং টিএসএইচ— হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হলে রক্তে এফটি৪ কমে যায় এবং টিএসএইচ বেড়ে যায়। এর বিপরীত হয় হাইপারথাইরয়েডিজ়মের ক্ষেত্রে। ২) থাইরয়েড গ্রন্থির আল্ট্রাসাউন্ড (ইউএসজি): বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে এটি করা হয়। এ ছাড়া অ্যান্টি টিপিও অ্যান্টিবডি, থাইরয়েড স্টিমিউলেটিং, ইমিউনোগ্লোবিউলিন ইত্যাদি পরীক্ষা হয়।

প্রশ্ন: গর্ভবস্থায় থাইরয়েড পরীক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব গর্ভবতী মহিলা গর্ভাবস্থায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি। মায়ের শরীরে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকাটা খুবই দরকার। বিশেষ করে ভ্রূণের মস্তিষ্কের উন্নতির জন্য গর্ভবতী হওয়ার পরে শরীরে থাইরয়েড হরমোনের চাহিদা বেড়ে যায় এবং সেজন্য থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে বেশি পরিমাণ টি-থ্রি, টি-ফোর হরমোন নিঃসৃত হয়. এই অবস্থায় খাদ্যে আয়োডিনের পরিমান কম থাকলে শরীরে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের অভাব দেখা দেয়।

প্রশ্ন: এক জনের শরীরে প্রতিদিন কতটা আয়োডিনের প্রয়োজন হয়?

উত্তর: এটি নির্ভর করে বয়সের উপরে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এর পরিমাণ আলাদা হয়। ১) জন্ম থেকে ছ’মাস পর্যন্ত: ১১০ মাইক্রোগ্রাম, ২) সাত মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত: ১৩০ মাইক্রোগ্রাম, ৩) ১ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত: ৯০ মাইক্রেোগ্রাম, ৪) ৯ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত: ১২০ মাইক্রোগ্রাম এবং ৫) ১৪ বছর এবং তার পরে: ১৫০ মাইক্রোগ্রাম. ৬) গর্ভাবস্থায়: ২২০ মাইক্রোগ্রাম, ৭) স্তন্যপান করানোর সময়ে: ২৯০ মাইক্রোগ্রাম।

প্রশ্ন: কোন খাদ্য উপাদানগুলিতে আয়োডিন উপযুক্ত পরিমাণে থাকে?

উত্তর: পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত খাবারগুলি হল, দুধ, দই, চিজ ও দুধ থেকে তৈরি অন্যান্য খাবারগুলি। সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত খাবার যেমন, মাছ, সমুদ্র শৈবাল, চিংড়ি, ফলমূল, আনাজ, আয়োডিন যুক্ত নুন, ডিম ও মাংসের মধ্যেও পর্যাপ্ত পরিমান আয়োডিন থাকে।

প্রশ্ন: টিএসএইচ হরমোনের গুরুত্ব কী?

উত্তর: টিএসএইচ আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় এবং থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে টি-থ্রি, টি-ফোর হরমোন বেশি মাত্রায় থাকলে টিএসএইচ-এর পরিমাণ কমে যায়।

প্রশ্ন: হাইপোথাইরয়েডিজ়মে আক্রান্ত রোগীকে কী ভাবে চিকিৎসা করা হয়?

উত্তর: এই সব রোগীকে প্রতি দিন থাইরয়েড হরমোন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে দেওয়া হয়। টিএসএইচ ও এফটি-ফোর এর মাত্র রক্তে কেমন আছে সেটির উপর ভিত্তি করে থাইরয়েড হরমোন এর ডোজ নির্ধারণ করা হয়। এই ওষুধ ট্যাবলেট আকারে বাজারে বিভিন্ন নামে পাওয়া যায়। এই ওষুধটি প্রতি দিন সকালে খালিপেটে খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে খেতে বলা হয়। যে সব খাবার খেলে হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হতে পারে সেগুলি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। চিকিৎসা শুরু করার ছ’সপ্তাহ থেকে ছ’মাস অন্তর পুনরায় এফটি-ফোর এবং টিএসএইচ মাত্রা দেখা হয় এবং এদের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য থাইরয়েড হরমোনের ডোজ বাড়ানো বা কমানো হয়। নিয়মিত ওষুধ খেলে হাইপোথাইরয়েডিজ়ম রোগ দূরে রাখা সম্ভব। আয়োডিনের অভাবে হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হয়ে থাকলে রোগীকে আয়োডিন যুক্ত নুন ও অন্যান্য আয়োডিন পরিপূর্ণ খাবারও খেতে বলা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে কিছু ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

প্রশ্ন: হাইপারথাইরয়েডিজ়মের কী ভাবে চিকিৎসা করা হয়?

উত্তর: এই রোগীকে থাইরয়েড হরমোন কম তৈরি করার জন্য মেথিমাজেল, কার্বিমাজোল ইত্যাদি ওষুধ দেওয়া হয়। কিছু দিন পর রক্তে টি-থ্রি, টি-ফোরের পরিমাণ কমে যায় এবং রোগীর উপসর্গগুলি আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়। বুক ধড়ফড় কম করার জন্য বেটা-ব্লকার ব্যবহার করা হয়। এই সব চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে না এলে রেডিও আয়োডিন দিয়ে থাইরয়েড গ্রন্থিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয় অথবা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই গ্রন্থটিকে বাদ দেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: শরীরে উপযুক্ত পরিমাণ আয়োডিন আছে কি না সেটা জানার কোনও উপায় আছে কী? 

উত্তর: এক জন বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় ১৫-২০ মিলিগ্রাম আয়োডিন থাকে। যার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ থাকে থাইরয়েড গ্রন্থির মধ্যে। রক্তে আয়োডিনের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে বাড়ে বা কমে বলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এটি বোঝা যায় না। কিন্তু প্রস্রাবে আয়োডিনের পরিমাণ নির্ণয় করে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি। প্রস্রাবে যদি আয়োডিনের মাত্রা ২০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটারের থেকে কম হয় তা হলে বুঝতে হবে শরীরে আয়োডিনের অভাব আছে।

প্রশ্ন: থাইরয়েডের অসুখে ভিটামিনের কোনও ভূমিকা আছে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। বিশেষ করে ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন-ডি এর পরিমাণ স্বাভাবিক থাকাটা জরুরি থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোন উৎপাদন ও নিঃসরণের জন্য।

প্রশ্ন: মদ্যপান করলে থাইরয়েডের অসুখ হতে পারে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, হতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান করলে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে টিএসএইচ হরমোন কম নিঃসৃত হয়। ফলে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে টি-থ্রি, টি-ফোরের কম উৎপাদন হয়। এবং অবশেষে হাইপোথাইরয়েডিজ়ম দেখা দেয়।

প্রশ্ন: থাইরয়েডের সমস্যা হলে কি ডায়াবিটিস হতে পারে? 

উত্তর: থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোন রক্তে বেশি হলে বা কমলে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ডায়াবিটিস হতে পারে। যেহেতু হাইপোথাইরয়েডিজ়ম বেশি পরিমাণ দেখা যায় হাইপারথাইরেয়ডিজ়মের থেকে, সে জন্য সচরাচর আমরা ডায়াবিটিসের সঙ্গে হাইপোথাইরয়েডিজ়মের চিকিৎসা করি। এ ছাড়া, গ্রেভস হাইপারথাইরয়েডিজ়ম এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস যেহেতু একটি অটো ইমিউনি ডিজ়িজ অনেক ক্ষেত্রে এক সঙ্গে দেখা যায়।

প্রশ্ন: গলগণ্ড বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: থাইরয়েড গ্রন্থি আকারে বৃদ্ধি পেলে গলার অগ্রভাগটা ফুলে যায় একেই গলগণ্ড বলে। এর কারণগুলি হল—আয়োডিনের অভাব, গ্রেভস ডিজ়িজ, থাইরয়েডের সংক্রমণ এবং থাইরয়েডের টিউমার ইত্যাদি। সুতরাং হাইপোথাইরয়েডিজ়ম এবং হাইপারথাইরয়েডিজ়ম— দু’টি ক্ষেত্রেই গলগণ্ড হতে পারে।

(সাক্ষাৎকারর: বিপ্লব ভট্টাচার্য)