‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ ও ‘ইউএন হেল্থ এজেন্সি’ জানাচ্ছে, বেশি মিষ্টি খাওয়ার অসুখে ভুগছে সারা দুনিয়া৷ অসুখ থেকে সুখে ফিরতে গেলে, তাঁদের মতে, দিনে যত চিনি খাচ্ছেন তার চেয়ে ৬–১২ চামচ খাওয়া কমাতে হবে৷ ডায়েট না মানলে এই নিদান স্বাভাবিক লাগতেও পারে। কিন্তু ডায়েটিংয়ে অভ্যস্ত মানুষরা হয়তো ভাবছেন, চিনি যেখানে ছুঁয়েই দেখেন না, সেখানে ৬–১২ চামচ কমানোর গল্প আসে কোথা থেকে!

কিন্তু ডায়েট-জীবনের ফাঁকফোঁকর দিয়েও চিনি ঢুকে পড়ে শরীরে। কখনও অন্য রূপে, আপনার অজান্তেই। সোডা তো খান মাঝেমধ্যে? স্বাস্থ্যকর ভেবেই খান৷ শুধু সেটুকু বন্ধ করে দেখুন চিনির ক্ষতি কতটা কমাতে পারেন? বা ধরুন মধু৷ চাকভাঙা খাঁটি মধু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেলে না ৷ বেশির ভাগ দোকান থেকে যা কেনেন তাতে বিস্তর চিনি–গুড়ের ভেজাল মেশানো থাকে৷ সে বাবদ অযথা কিছু চিনি প্রবেশ করে শরীরে৷ আর রান্নায় চিনি দেওয়ার ব্যাপার তো আছেই৷ এ সবের ফলে কম বয়সেই নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে৷

ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, প্যাকেটজাত ফলের রস, সস, কেচাপ, কুকিস জাতীয় প্রক্রিয়াকরণের খাবারের হাত ধরেই শরীরে বাসা বাঁধে চিনি৷ চিনির এই বাড়বাড়ন্তই ডেকে আনছে নানা অসুখ।

আরও পড়ুন: এই সব অভ্যাস ছাড়ুন আজই, নইলে মেদ কমবে না হাজার নিয়ম মানলেও

চিনির সমস্যা

নিয়ম হল, যত ক্যালোরি খাবার আমরা খাই তার ১০ শতাংশের কম আসা উচিত মিষ্টি জাতীয় খাবার থেকে৷ অর্থাৎ দিনে ২০০০–২৫০০ ক্যালোরি খেলে ২০০–২৫০ ক্যালোরির বেশি যেন মিষ্টি থেকে না আসে৷ তা হলে ওবেসিটি, দাঁতের ক্ষয়, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবিটিস, এমনকি, কিছু কিছু ক্যানসারের আশঙ্কাও অনেক কমে যায়৷ তবে খেতে মিষ্টি হলেও ফল বা দুধে কিন্তু এই সমস্যা নেই৷ তাই শরীরে সে সব সহ্য হলে খেতে পারেন৷ এতে উপকারের পাল্লা ভারীই হবে৷ খেতে পারেন পর্যাপ্ত শাকসব্জি৷ এ ছাড়া আছে কিছু প্রাকৃতিক সুগার সাবস্টিটিউট৷ মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে হলে, নিজেকে কষ্ট না দিয়ে সে দিকেও হাত বাড়াতে পারেন৷ তৃপ্তির পাশাপাশি ভিটামিন–মিনারেলের দৌলতে পুষ্ট হয়ে উঠবে শরীর৷

উপকারের দিক থেকে টাটকা মধুর কোনও বিকল্প নেই৷

সুগার সাবস্টিটিউটের গুণ

সাদা চিনির গুণ বলতে তাৎক্ষণিক কিছুটা এনার্জি দেওয়া৷ তার বাইরে সবটাই তার অগুণ৷ কিন্তু মোটামুটি একই গোত্রের হলেও গুড় এতটা অকাজের নয়৷ কাজেই মিষ্টি খাওয়া ছাড়তে না পারলে, চিনির বদলে গুড় খান৷ আখের গুড়, খেজুর গুড়, তাল পাটালি, ঝোলা গুড় ইত্যাদি৷ ক্যালোরি কিছুটা ঢুকবে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঢুকবে পুষ্টি৷ ভিটামিন বি৬, আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদির গুণে সমৃদ্ধ হবে শরীর৷

গুড়ের চেয়ে চিনির স্বাদ বেশি পছন্দ হলে খান আখের রস৷ ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের বেশ কয়েকটি, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদির ভাল জোগান পাবেন৷ তবে মনে রাখবেন, এরও কিন্তু ক্যালোরি যথেষ্ট বেশি৷ নিয়মিত খেতে শুরু করলে ওজন বশে রাখা কঠিন হবে৷ তাই আখের রস খান বুঝেশুনে।

আরও পড়ুন: ওষুধেই সম্পূর্ণ রোগমুক্তি ফুসফুসের ক্যানসারে! কী ভাবে সম্ভব করছেন বিশেষজ্ঞরা? রোগ ঠেকাবেন কী করে?

খেতে পারেন নারকেল চিনি৷ নারকেলের দুধ ফুটিয়ে শুকিয়ে নিলে নীচে পড়ে থাকে এই চিনি৷ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে অসাধারণ৷ সঙ্গে আছে ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন, পটাশিয়ামের পুষ্টি৷ আবার এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম বলে রক্তে সুগার চট করে বাড়তে পারে না৷ কাজেই ডায়াবিটিকরাও মাঝেমধ্যে এক–আধবার খেতে পারেন৷ চিনির বদলে রান্নায় দিন গুড়ের বাতাসা। পুষ্টিগুণ বাড়বে, কমবে চিনির বিপদ। ক্যালোরিও ঢুকবে রয়েসয়ে, তাই মেদ বাড়ার ভয় ততটা নেই।

নারকেলের চিনি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে অসাধারণ৷

খাওয়ার পর ডেজার্ট চাই–ই? খেজুর বা কিসমিস খান৷ প্রচুর পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি৬ পাবে শরীর৷ তবে অল্প করে৷ ক্যালোরির কথা মাথায় রেখে৷ খেজুরেরও চিনি হয়৷ তবে তা দিয়ে চা–কফি বানানো যায় না৷ কেক বা পুডিংয়ে ব্যবহার করতে পারেন৷ সম্ভব হলে খেজুর বা তালের রস জ্বাল দিয়ে সিরাপ বানাতে পারেন বা তাকে জমিয়ে পাটালি বানানো যায়৷ উপকারের দিক থেকে টাটকা মধুর কোনও বিকল্প নেই৷ কিছু মধু আবার চিনির চেয়েও মিষ্টি৷ কাজেই পরিমাণে কম লাগে৷ গ্রিন টি–তে মিশিয়ে খেতে পারেন৷ তবে চাকভাঙা মধু পাওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়, কাজেই মধু কেনার আগে খেয়াল রাখুন সে দিকে।

চা–কফি বানাতে চিনির বদলে ব্যবহার করতে পারেন ম্যাপল সিরাপ৷ এর ক্যালোরিও যথেষ্ট কম৷ অ্যান্টিক্সিড্যান্ট গুণাবলীও আছে৷ তবে আমাদের এখানে এর বিশেষ প্রচলন নেই৷ আজকাল বেশ কিছু অনলাইনে চড়া দামে পাওয়া যায় ঠিকই, তবে মধ্যবিত্ত সংসারে ঘন ঘন ম্যাপল সিরাপ কেনা অসুবিধের মনে হলে, বাতাসা, গুড়, নারকেলের চিনি, খাঁটি মধু এ সবে আস্থা রাখুন।