আপনার তরুণী কন্যাটি ইদানীং মাঝে মাঝেই মাথা গরম করে ফেলছে। রাগ-বিরক্তি-খিটখিটেপনা, সবটাই উগড়ে দিচ্ছে আপনার উপরে। বুঝতে পারছেন, মন খারাপ করে বসে আছে মেয়েটা বা অহেতুক চিন্তাগ্রস্ত হয়ে রয়েছে। আপনি হয়তো ভাবছেন, অফিসের চাপ কিংবা ‘এখনকার মেয়েরা...’ ইত্যাদি! তবে খেয়াল করে দেখেছেন কি, এগুলো শুধুই মানসিক অসুখ কি না? মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়েই এটা হচ্ছে না তো? পাশাপাশি মাথা ব্যথা, লো-ব্যাক পেন, বমি পাওয়া... এগুলোও একইসঙ্গে দেখা দিচ্ছে কি? কারণ এগুলো সবই প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম, সংক্ষেপে পিএমএস। খুবই চেনা অসুখ। তবে প্রত্যেক মাসের এই ‘অ-সুখী’ সময়টার প্রতি একটু যত্নবান হলেই কষ্টের উপশম সম্ভব।

চিনে নিন সমস্যা

মাসের সেই নির্দিষ্ট সময়ে আপনার বাড়ির কাজের মেয়েটি ছুটি চায়। খেয়াল করে দেখুন, কোনও এক নির্দিষ্ট সময়ে হয়তো আপনার নিজের মেয়েটিও অফিসে তার বসের থেকে ছুটি চাইছে। পিএমএস কিন্তু সন্তানধারণে সক্ষম যে কোনও মহিলারই হতে পারে। মাসিক ঋতুস্রাব শুরুর পর থেকে মেনোপজ় পর্যন্ত যে কোনও বয়সে। মেয়েদের শরীরে কথা বলে হরমোন। মাসিক ঋতুচক্র শুরুর দিনদশেক আগে থেকেই পিএমএস’এর লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরনের তারতম্য প্রভাবিত করে সেরোটনিনের মাত্রাকে। অতএব শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি মাথাচাড়া দেয় মনস্তাত্ত্বিক অশান্তিও। শারীরিক সমস্যাগুলো আপনাকে জানান দেবে খানিকটা 

এ ভাবে—শরীর ভারী হয়ে যাওয়া, তলপেট, পিঠ ও কোমরে ব্যথা, টেন্ডার ব্রেস্টস, বমি-বমি ভাব, অ্যাকনের সমস্যা, মাথার যন্ত্রণা, হজমের সমস্যা ইত্যাদি।

প্রি-মেনস্ট্রুয়াল 

সাইকোলজিক্যাল চেঞ্জ শারীরিক কষ্টের চেয়েও বেশি মাত্রায় কাবু করে ফেলতে পারে। এই সময় ফিমেল হরমোন এমন খেল দেখাবে যে, অল্পেই অকারণ রাগ বা বিরক্তি, মানসিক অবসাদ, ঘন ঘন মুড সুইং, উদ্বেগ বা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকা, অপরিমিত ঘুম, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ— এ সবের চক্রব্যূহে পড়তে হবে, না চাইলেও। গাইনোকলজিস্ট চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, যাঁরা ডায়াবিটিক, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায়। দেখা গিয়েছে, অনেকের ক্ষেত্রেই পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম দেখা যায় বেশি করে। পিএমএস-এর আরও একটা মুশকিল হল, সমস্যাগুলো দেখা দিলে কোনও ক্লিনিক্যাল টেস্টে চট করে তা ধরা পড়ে না।

নিজেকে ভাল রাখতে পারেন একমাত্র আপনিই

ট্র্যাকে রাখুন মেনস্ট্রুয়েশন

হরমোন যেমন কথা বলবে, শরীরও সাড়া দেবে তেমনই। অতএব, প্রত্যেক মাসে এই সময়কে ট্র্যাকে রাখাই বাঞ্ছনীয়। মোবাইল ফোনে রিমাইন্ডার দিয়ে বা অ্যাপ নামিয়ে খেয়াল রাখুন নির্দিষ্ট সময়টা। সেই অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করুন আগে থেকেই। আপনার সমস্যাগুলো শুধু প্রি-মেনস্ট্রুয়েশনই কি না, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। লক্ষণগুলো যদি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছয়, যেমন প্যানিক অ্যাটাক, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম, অ্যানিমিয়া— তা হলে শুরুতেই গাইনোকলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভাল। অ্যাংজ়াইটি অ্যাটাক বা অবসাদের ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ববিদের সাহায্য অবশ্যই প্রয়োজন। অনেক সময় থাইরয়েড কিংবা সিস্টের সমস্যার ক্ষেত্রেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তার কারণ এবং চিকিৎসা কিন্তু পিএমএস-এর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

বদলান লাইফস্টাইল

পিরিয়ডসের বেশির ভাগ সমস্যাই যেহেতু লাইফস্টাইল সংক্রান্ত, তাই তার মোকাবিলাও শুরু করতে হবে সেখান থেকেই। অফিস কিংবা অন্যান্য কাজের ফাঁকেই দিনরুটিনটা নিয়মানুবর্তিতায় বেঁধে ফেলুন। এক্সারসাইজ় করার জন্য সময় রাখুন। সেইসঙ্গে পরিমিত ঘুম আর সুষম আহারও প্রয়োজন।

পিএমএস-এ নিয়মিত ভাবে কষ্ট পেলে ডায়েটে এগুলো মাস্ট—

• দই, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার

• বেশি করে সবুজ আনাজপাতি

• আলাদা করে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট

• লো-কার্ব ডায়েট  •মরসুমি ফল

ভাল থাকার সহজ উপায়

পিএমএসের মোকাবিলার সবচেয়ে সহজ উপায় জীবনচর্যা আর খাদ্যাভ্যাসে খানিক বদল আনা। ডক্টর চন্দ্রিমা দাশগুপ্তের মতে, ‘‘লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনলে অনেকটাই রেহাই পাওয়া সম্ভব এই সমস্যা থেকে। আমরা অনেক সময়ে এ সব ক্ষেত্রে দরকার পড়লে হরমোনাল বার্থ কন্ট্রোল পিল নেওয়ার পরামর্শ দিই। ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্টও কার্যকরী। লো কার্বস ডায়েটে চলে যেতে হবে তখন। চকলেট, সফট ড্রিংক, ক্যাফিন জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলাই ভাল।’’ তাঁর মতে, যে সব মহিলা কায়িক পরিশ্রম বেশি করেন, তাঁদের এই অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম। অন্য দিকে, যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময়ই বসে কাজ করেন, সেই সঙ্গে এক্সারসাইজ়ে ফাঁকি— গাইনোকলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় তাঁদের। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৩০-৩২ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ডিম্বাণু তৈরির হার গত দশ বছরে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গাইনোকলজিক্যাল সমস্যাও। এর জন্য বেশির ভাগ চিকিৎসকই দায়ী করছেন লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আর দূষণকে। 

সর্বোপরি নিজেকে ভাল রাখা— এর চেয়ে কার্যকরী মন্ত্র আর দু’টি নেই। মুড সুইংয়ের সমস্যা দেখা দিলে সাহায্য নেওয়া যায় মিউজ়িক থেরাপির। যোগব্যায়ামও করতে পারেন। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডাও মন ভাল রাখে। ইদানীং বিভিন্ন অফিসে মেনস্ট্রুয়াল লিভের সুবিধে দেওয়া হয়। সেই ক’টা দিন সময় কাটান নিজের সঙ্গে। নিজেকে ভাল রাখতে পারেন একমাত্র আপনিই।

মডেল: রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, মুনমুন রায়; ছবি: সুপ্রতিম চট্টোপাধ্যায় (রিয়া), অমিত দাস; মেকআপ: মৈনাক দাস (মুনমুন); লোকেশন: আইবিস, রাজারহাট