Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

বাঙালি সংস্কৃতির একফালি ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে বদলে যাওয়া চড়ক

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১১:২৮
পুরনো কলকাতার চড়ক, শিল্পী এস সি বেলনোসের তুলিতে। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

পুরনো কলকাতার চড়ক, শিল্পী এস সি বেলনোসের তুলিতে। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

চৈত্র শেষের বিকেলে চড়কতলায় বেজে উঠেছে ঢাক, ঢোল, কাঁসর। ভিড় করেছে ছেলে-বুড়ো সকলেই। কাঠের প্রকাণ্ড খুঁটির উপরে, অনেকটা উঁচুতে, আংটায় ঝুলে থাকা জনা দুয়েক সন্ন্যাসী ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছেন। সেই দৃশ্য দেখতে নীচে অগুনতি মানুষের ভিড়। ঘুরপাক খেতে খেতে আচমকাই ঝুলে থাকা সেই সন্ন্যাসীদ্বয় নীচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের উদ্দেশে ছুড়ে দিলেন বেল, কাঁচা আমের মতো একাধিক ফল। এরই মাঝে ভিড় ঠেলে একটু পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য চড়ক গাছ ছুঁতে এগিয়ে গেলেন কিছু মানুষ। এটাই গ্রামবাংলার চড়কের অতি পরিচিত ছবি।

সে কাল থেকে এ কাল চড়কের আকর্ষণ খুব একটা বদলায়নি। শুধু বদলেছে কিছু আচার অনুষ্ঠান। তবে গ্রামের সঙ্গে শহরের ইদানীং কিছুটা ফারাক দেখা দিয়েছে। গ্রামবাংলায় আজও চৈত্রের শুরু থেকেই ধ্বনিত হয় ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে’। সমাজের প্রান্তিক স্তরের নারী-পুরুষের একাংশ সন্ন্যাস পালন করেন। কেউ কেউ আবার শিব-পার্বতী সেজে হাতে ‘ভিক্ষাপাত্র’ নিয়ে বের হন। সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আতপচাল, রাঙাআলু, কাঁচা আম, কাঁচকলা-সহ নানা আনাজের সঙ্গে পয়সাকড়ি সংগ্রহ চলে। সন্ধেবেলা সেই চাল-আনাজ সেদ্ধ করেই ওঁরা আহারপর্ব সারেন।

কলকাতায় চড়ক পুজো হলেও সং সেজে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য বেশ বিরল। তবে চড়ক হয়। এবং সেই উপলক্ষে মেলাও বসে। আজও চড়কের মেলা বসে বিডন স্ট্রিটের ছাতুবাবুর বাজারে আর কলেজ স্কোয়্যারে। তবে কলেজ স্কোয়্যারের মেলাটি দিনে দিনে ছোট হয়ে এসেছে। ছাতুবাবুর বাজারের মেলাটি আজও কলকাতার সবচেয়ে বড় চড়কের মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই এখানে মানুষের ঢল নামে। প্রথমত চড়ক দেখতে, দ্বিতীয়ত মেলার আকর্ষণে। তবে, শহরে দিনে দিনে কমে আসছে মেলার সংখ্যা। উত্তর কলকাতার বাসিন্দাদের মতে, আজও এখানে কিছুটা হলেও পুরনো সেই মেলার আমেজ পাওয়া যায়। গেরস্থালির দৈনন্দিন জিনিসপত্র থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর শৌখিন সামগ্রীও মেলে সেখানে। পাশাপাশি এখানেই পাওয়া যায় বসিরহাটের বঁটি, দা, ছুরি থেকে শুরু করে কাঠের নানা জিনিস। চৈত্রসংক্রান্তির বিকেল থেকে শুরু করে সারা রাত অতিক্রম করে পর দিন দুপুর পর্যন্ত চলে এই মেলাটি।

Advertisement
বদলে গিয়েছে, তবু কমেনি চড়কের আনন্দ।

বদলে গিয়েছে, তবু কমেনি চড়কের আনন্দ।


সে কালের চড়ক উৎসব প্রসঙ্গে কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’-য় লিখেছিলেন, ‘…রাস্তায় লোকারণ্য, চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, ধুনোর ধোঁ, আর মদের দুর্গন্ধ। সন্ন্যাসীরা বাণ, দশলকি, সূতোশোন, সাপ, ছিপ, ও বাঁশ ফুঁড়ে একবারে মরিয়া হয়ে নাচ্‌তে নাচ্‌তে কালীঘাট থেকে আস্‌চে।…চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে মোচ বেন্ধে মাথায় ঘি কলা দিয়ে খাড়া করা হয়েচে। ক্রমে রোদ্দুরের তেজ পড়ে এলে চড়কতলা লোকারণ্য হয়ে উঠল।…এদিকে চড়কতলায় টিনের ঘুরঘুরি, টিনের মুহুরি দেওয়া তল্‌তা বাঁশের বাঁশি, হলদে রং করা বাঁখারির চড়কগাছ, ছেঁড়া নেকড়ার তৈরি গুরিয়া পুতুল, শোলার নানা প্রকার খেলনা, পেল্লাদে পুতুল, চিত্তির করা হাঁড়ি বিক্রি করতে বসেচে…। এক জন চড়কী পিঠে কাঁটা ফুঁড়ে নাচ্‌তে নাচ্‌তে এসে চড়কগাছের সঙ্গে কোলাকুলি কল্লে— মইয়ে করে তাকে উপরে তুলে পাক দেওয়া হতে লাগলো। সকলেই আকাশ পানে চড়কীর পিঠের দিকে চেয়ে রইলেন। চড়কী প্রাণপণে দড়ি ধরে কখনও ছেড়ে, পা নড়ে ঘুরতে লাগ্‌লো। কেবল ‘‘দে পাক দে পাক’’ শব্দ। কারু সর্ব্বনাশ, কারু পৌষ মাস! একজনের পিঠ ফুঁড়ে ঘোরান হচ্চে, হাজার লোক মজা দেখচেন।’

সে কালের যে কোনও উৎসবই ছিল বাবুকেন্দ্রিক। তাই দোল, দুর্গোৎসবের মতো চড়কের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন বাবুরা। চড়ক লোকায়ত উৎসব হলেও সেকেলে বাবুদের এতে উৎসাহের কমতি ছিল না। গাজনের সঙ দেখতে চিৎপুর রোড-সহ অন্যান্য রাস্তায় তখন লোকে লোকারণ্য। চড়ক উপলক্ষে সে কালেও শোভাযাত্রা বেরতো কালীঘাট অঞ্চলে। কলকাতার বিশপ হেবার এবং ফ্যানি পার্কস তাঁদের লেখায় কলকাতার চড়ক উৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সব লেখা থেকে জানা যায়, সে কালের এই শোভাযাত্রায় দেখা যেত সন্ন্যাসীদের বীভৎস সব ক্রিয়াকলাপ!

জানা যায়, সন্ন্যাসীরা সকালে কালীঘাটে গিয়ে নিজেদের গায়ে বাণ বিঁধিয়ে আসতেন। সে দিন কলকাতার পথে নামতেন হাজার হাজার সন্ন্যাসী। তাঁদের পরনে কৌপিন, সারা গায়ে সিঁদুরের দাগ, গলায় জবার মালা। সে কালে চড়কের বীভৎসতা দেখে সাহেবরাও বিস্মিত হতেন! ভয়ঙ্কর খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল, মোটা বড়শিতে নিজের শরীর বিদ্ধ করে চড়ক কাছে ঘোরা। আর ছিল বাণ ফোঁড়া, বঁটি ঝাঁপ এবং কাঁটা ঝাঁপ। এমনকী, মাটিতে কাঁটা বিছিয়ে তার উপর ঝাঁপও মারতেন সন্ন্যাসীরা।

এ যুগের চড়কের মেলা।

এ যুগের চড়কের মেলা।


এক সময় চড়কের এই প্রথাটিকেই অমানুষিক আখ্যা দিয়েছিল খ্রিস্টান মিশনারিরা। ১৮৬৩ থেকে ৬৫-র মধ্যে ছোটলাট বিডন এই প্রথা রদ করেন। শোনা যায়, সেই থেকেই সন্ন্যাসীরা পিঠে গামছা বেঁধে চড়কগাছে পাক খেয়ে উঠতে শুরু করেন। কাঁসারিপাড়ার কাঁসারিরা সঙ বের করতেন। অশ্লীলতার দায়ে এক সময় তা বন্ধও হয়ে যায়।

শুধু কলকাতা নয়, চড়ক উপলক্ষে মেলা বা উৎসব হত হুগলির তারকেশ্বরে, চুঁচুড়ার ষাণ্ডেশ্বরতলায়, নদিয়া, বর্ধমান-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বিভিন্ন জায়গায়। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চড়কের মেলার চেহারাটা অনেকটাই বদলেছে। যেমন, কলকাতার মেলাগুলিতে দিনে দিনে কমে এসেছে মাটির পুতুলের কেনাবেচা। এখান মাটির পুতুল এলেও সেগুলি মূলত লক্ষ্মী গণেশের মূর্তি। হয়তো পয়লা বৈশাখের কথা ভেবেই! পুরনো ধাঁচের মাটির পুতুলের পরিবর্তে এখন দেখা যায় চিনে তৈরি রাবার কিংবা স্টোন ডাস্টের রংচঙে নানা দেবদেবীর মূর্তি।

শহুরে মেলা থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বেতের ধামা, ঝুড়ি আর ফুলের সাজি। যায় যায় করছে টিনের কৌটো রং করে তাতে চামড়া সেঁটে তৈরি ঢোল, মাটির খোলের বেহালা আর চাকা লাগানো গাড়ি। হয়তো নাগরিক সভ্যতার দানে এগুলির প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

বর্ষশেষ আর নববর্ষের সন্ধিক্ষণের মতোই চড়ক যেন অতীত আর বর্তমানের একটা যোগসূত্র। কিছু হারিয়ে যায় আর কিছু থেকে যায়।

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement