প্রায় তিন দশক পরে গাঁধী পরিবারের এসপিজি নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, এ বার থেকে এসপিজি-র বদলে জেড প্লাস নিরাপত্তা পাবেন গাঁধী পরিবারের তিন সদস্য— সনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়ঙ্কা। কংগ্রেস নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলছেন, যে পরিবারের দু’জন সদস্য সন্ত্রাসবাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, কী ভাবে সেই পরিবেরের নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিল সরকার? যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির একাধিক আধিকারিকের দাবি, আদৌ নিরাপত্তা কমানো হচ্ছে না, বরং আরও সুসংহত করা হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতে নেতা থেকে মন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য পাঁচটি আলাদা ধরনের নিরাপত্তা প্রচলিত। সাধারণত ওই ব্যক্তির নিরাপত্তা কতটা সংশয়ের মধ্যে রয়েছে বা তাঁর উপর কতটা হামলার আশঙ্কা রয়েছে— সেই ভিত্তিতেই ঠিক করা হয় কে কী ধরনের নিরাপত্তা পাবেন।

১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর হত্যার পরের বছরই প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার জন্য গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী ‘স্পেশ্যাল প্রোটেকশন গ্রুপ’ (এসপিজি)। তৎকালীন ক্যাবিনেট সচিবের নির্দেশে তৈরি হয় ওই বাহিনী। পরে ১৯৮৮ সালের ২ জুন সংসদে ‘এসপিজি বিল’ পেশ করে পাশ করানো হয়।  বর্তমানে ওই বাহিনীতে রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি সদস্য। নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ বিশ্বের প্রথম সারির বলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন: সনিয়া, রাহুল, প্রিয়ঙ্কার এসপিজি নিরাপত্তা তুলে নিচ্ছে কেন্দ্র

এসপিজি গঠনের সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের এসপিজি নিরাপত্তা দেওয়ার কোনও সংস্থান ছিল না আইনে। কিন্তু ১৯৯১ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধীর হত্যাকাণ্ডের পর ওই আইনে সংশোধন এনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারকেও ওই নিরাপত্তা বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসপিজি আইন অনুযায়ী, প্রাক্তন বা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মা-কে ‘পরিবার’ হিসেবে গ্রাহ্য করা হবে। সেই সংস্থান থেকেই ১৯৯১ সাল থেকে সনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়ঙ্কা এসপিজি নিরাপত্তা পান। প্রিয়ঙ্কার স্বামী রবার্ট বঢ়রা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে থাকলে তবেই তিনি ওই নিরাপত্তা পান।

এর পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার মেয়াদ নির্দিষ্ট করা হয়— প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছাড়ার পর ১০ বছর পর্যন্ত। পাঁচ বছর পর ফের সংশোধন এনে ওই মেয়াদ অনির্দিষ্ট কাল করা হয়, হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষিতে। কিন্তু ২০০৩ সালে বাজপেয়ী সরকার ওই মেয়াদ একেবারে কমিয়ে ১ বছর করে দেয়। হামলার আশঙ্কা কতটা প্রতি বছর তা পর্যালোচনা করে সেই নিরাপত্তার মেয়াদ বাড়ানো হবে বলে ফের সংশোধনী আনা হয় ওই আইনে।

আরও পড়ুন: মেঘ-রোদের খেলা, বিধায়ক বৈঠকে না গেলেও সরকারের ডাকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে হাজির শোভন

দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে তৈরি করা এসপিজিকে বর্তমানে দেশের সব চেয়ে খরচবহুল নিরাপত্তা বাহিনী হিসাবে গণ্য করা হয়। বছরে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা খরচ করা হয় ওই বাহিনীর পিছনে। গাঁধী পরিবারের তিন জনকে ধরলে এই মুহূর্তে চার জন এসপিজি নিরাপত্তা পান। চতুর্থ ব্যক্তি, যিনি এসপিজি নিরাপত্তা পান, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  তবে গাঁধী পরিবারের এসপিজি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হলে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউই এসপিজি নিরাপত্তার তালিকায় থাকবেন না। কারণ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের এসপিজি নিরাপত্তা এ বছর অগস্টেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। এইচ ডি দেবগৌড়ার এসপিজি নিরাপত্তা অনেক আগেই প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

এসপিজি বাদ দিলে বাকি চারটি নিরাপত্তার স্তর হল জেড প্লাস, জেড, ওয়াই এবং এক্স। সাধারণ ভাবে জেড প্লাস নিরাপত্তা বলয়ের দায়িত্বে থাকেন ৩৬ থেকে ৫৫ জন উচ্চ প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী। সেই দলে থাকেন অন্তত ১০ জন কমান্ডো। গত কয়েক বছর ধরে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি)-এর একটি অংশ স্পেশাল রেঞ্জার গ্রুপের প্রায় ৬০০ কমান্ডোকে মোতায়েন করা হয়েছে ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য। বাকি সদস্যরা সিআরপিএফ বা আইটিবিপি-র মতো কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর সদস্য। গোটা বাহিনীর হাতেই থাকে সর্বাধুনিক অস্ত্র এবং গ্যাজেট। ২৪ ঘণ্টা ওই বাহিনী ঘিরে থাকে ভিভিআইপিকে। এসপিজি নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মতোই জেড প্লাস নিরাপত্তাতেও থাকে বুলেট প্রতিরোধী গাড়ি। রাজনাথ সিংহ, অমিত শাহ, মুলায়ম সিংহ-সহ দেশের প্রায় ২০ জন ভিভিআইপি এই নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন।

আরও পড়ুন: করতারপুরের করিডোরে...​

আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড়ের সাতকাহন​

এসপিজি-র সঙ্গে যুক্ত থাকা এক পুলিশ কর্তাকে বর্তমান জেড প্লাস এবং এসপিজি নিরাপত্তার পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘এসপিজি মূলত ক্লোজ প্রক্সিমিটি ফোর্স। এসপিজি-র অন্তত চার জন অফিসার ভিভিআইপি-র প্রায় গা ঘেঁষে থাকেন। তাঁদের আদব কায়দা থেকে শুরু করে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এই বাহিনীকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, যার কৌলিন্য অনেক বেশি।” তবে সেই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘গত দু’বছর এনএসজি-র কমোন্ডোরা এসপিজি-র ধাঁচে প্রশিক্ষণ করছেন। তাঁদের কাজের ধারাও অনেক বদলেছে। পাশাপাশি তাঁদের কমান্ডো হিসাবে পারদর্শিতা পৃথিবীর যে কোনও প্রথম সারির বাহিনীর সমান।” তাঁর মতে কৌলিন্য বাদ দিলে এনএসজি কমান্ডো পরিচালিত নিরাপত্তার সঙ্গে এসপিজি নিরাপত্তার পার্থক্য তুল্যমূল্য। সম্প্রতি জেড প্লাস ছাড়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানোর কিছু পার্থক্য এনে জেড স্পেশাল বলে একটি বিভাগ তৈরি করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর থেকে জেড স্পেশাল নিরাপত্তা পাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

জেড প্লাসের পরেই রয়েছে জেড। এই বিভাগে ২০-২২ জন নিরাপত্তাকর্মী থাকেন, যাঁদের মধ্যে ৪-৫ জন কমান্ডো। বাকি দু’টি নিরাপত্তার স্তরে নিরাপত্তাকর্মীর পার্থক্য ছাড়া বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই।