চড়াই, উতরাই অব্যাহত। তৃণমূল চেয়ারপার্সন তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিজেপি নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক এখন মেঘ-রোদ্দুরের খেলায়। খাতায়-কলমে বিজেপিতে থাকা সত্ত্বেও ভাইফোঁটায় বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার বিধায়কদের সঙ্গে মমতার বৈঠকে তাঁকে দেখা যায়নি। আজ অর্থাৎ শুক্রবার আবার অন্য ছবি। সরকারি আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবের (কেআইএফএফ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে এ দিন আবার চর্চায় উঠে এলেন শোভন।

যে দিন ইস্তফা দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা থেকে, সে দিন থেকেই বার বার নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক গতিবিধি সম্পর্কে। গত ১৪ অগস্ট তিনি এবং বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে যোগ দেওয়ার পরেও সে জল্পনা পুরোপুরি থামেনি। কারণ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে যে তাঁদের সম্পর্ক মসৃণ পথে এগোচ্ছে না, তা অচিরেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

সম্প্রতি শুরু হয়েছে শোভনের ‘ঘর ওয়াপ্‌সি’র জল্পনা। এক দিকে এ রাজ্যের বিজেপি নেতাদের বেশ কয়েক জনের সঙ্গে শোভনদের মন কষাকষির ইঙ্গিত মিলছিল। অন্য দিকে বিজেপির একের পর এক কর্মসূচিতে শোভন অনুপস্থিত থাকছিলেন। এমনকি গত ১ অক্টোবর নেতাজি ইন্ডোরে অমিত শাহের সভাতেও শোভনরা যাননি। তার মধ্যেই এল ভাইফোঁটা।শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় একসঙ্গে হাজির হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে।ফোঁটা নিলেন, দীর্ঘক্ষণ ফুরফুরে মেজাজে গল্পগুজবও করলেন। পদ্মফুল ছেড়ে জোড়াফুলে ফেরার জল্পনা তৈরি হতে বাধ্য।

আরও পড়ুন- ‘অতি ভয়ঙ্কর’ হল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, এগোচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলের দিকে

২০১৮ সালের ভাইফোঁটার দিনে কিন্তু তৃণমূলেই ছিলেন শোভন। তা-ও যাননি মমতার বাড়িতে। এ বারের ভাইফোঁটায় তিনি বিজেপিতে, তবু মমতার বাড়ি গেলেন। সেই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে শোভনকে ফের বড়সড় নিরাপত্তা দিল রাজ্য। মন্ত্রী এবং মেয়র থাকাকালীন জেড প্লাস পেতেন শোভন। দল ছাড়ার পরে সে সব চলে গিয়েছিল। রাজ্য পুলিশের তরফ থেকে একজন রক্ষী দেওয়া হত শোভনকে। কিন্তু ভাইফোঁটা পর্বের পরে বিজেপি নেতা শোভনকে মমতার সরকার ফের ওয়াই প্লাস নিরাপত্তা দিয়েছে। তাই তৃণমূলের একাংশ দাবি করতে শুরু করেছিল, শোভন চট্টোপাধ্যায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনে এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকি। ৭ নভেম্বর অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তৃণমূল ভবনে দলীয় বিধায়কদের বৈঠকে ডেকেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠকে শোভন হাজির হবেন এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূলে ফেরার কথা ঘোষণা করবেন— এমন গুঞ্জনও শুরু হয়েছিল। কিন্তু সে জল্পনায় জল ঢেলে শোভন চট্টোপাধ্যায় অনুপস্থিত ছিলেন তৃণমূল ভবনে আয়োজিত ওই বৈঠকে।

‘দিদি’ এবং তাঁর প্রিয় ‘কাননের’ মধ্যে বরফ গলার যে ইঙ্গিত ভাইফোঁটাকে কেন্দ্র করে মিলতে শুরু করেছিল, সেই ইঙ্গিত কি তা হলে ফের ফিকে হয়ে গেল? শোভন কি তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী নন? গতকাল থেকে এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু আজই ঘটনাপ্রবাহে নতুন মোড়। মমতার সরকারের আমন্ত্রণে এ দিন নেতাজি ইন্ডোরে পৌঁছলেন শোভন ও বৈশাখী। কেআইএফএফ-এর উদ্বোধনে বেশ উজ্জ্বল ভাবেই দেখা দিলেন।

আরও পড়ুন-  ১০ বছর পর ফের পরীক্ষা সুন্দরবনে,শনিবার মধ্যরাতেই ‘আয়লার’ গতিতে আছড়ে পড়বে বুলবুল

ঠিক কী করতে চলেছেন শোভন চট্টোপাধ্যায়? বিজেপিতে থাকছেন? নাকি তৃণমূলে ফিরতে চলেছেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এই প্রশ্নের কোনও সোজাসাপটা উত্তর আপাতত নেই। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, কী করা উচিত, সে বিষয়ে শোভন নিজেও মনস্থির করেননি। তবে বিশ্লেষকদের আর একটি অংশ বলছে, শোভন যা করছেন, সচেতন ভাবেই করছেন। বিজেপি ছাড়বেন, এমন কথা একবারও বলছেন না। আবার তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্রবও এড়িয়ে চলছেন। ভাইফোঁটা বা চলচ্চিত্র উৎসবের মতো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠানে তিনি মমতার কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে নিজেদের অনেক দূরে রাখছেন।

কেন মমতার বাড়িতে গিয়েছিলেন ভাইফোঁটার দিন, সে বিষয়ে বিজেপি নেতৃত্ব কিন্তু শোভন-বৈশাখীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাননি। শোভনরাও কাউকে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার উৎসাহ দেখাননি। রাজনৈতিক শিবির বলছে, শোভন আসলে বিজেপি নেতৃত্বকে একটা বার্তা দিয়ে রাখতে চাইছেন। তিনি চাইলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র যে কোনও দিন ফের জুড়ে যেতে পারে— এ রাজ্যের বিজেপি নেতাদের সে কথাই শোভন বুঝিয়ে দিতে চাইছেন বলে বিশ্লেষকদের ওই অংশের মত। কিন্তু তৃণমূলের রাজনৈতিক সংসর্গ এড়িয়ে, শুধুমাত্র সামাজিক বা সৌজন্যমূলক সংযোগ বহাল রেখে শৃঙ্খলাভঙ্গ বা দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ থেকেও তিনি দূরে থাকছেন।

আরও পড়ুন- শুরু হল ২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, নেতাজি ইন্ডোরে চাঁদের হাট

রাজ্য বিজেপি না হয় বার্তা পেল। গুরুত্ব না পেলে শোভন বিজেপিতে থাকবেন না, এ কথা দিলীপ ঘোষদের হয়তো বুঝিয়ে দেওয়া গেল। কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন ওঠে, শোভন কী হিসেব কষে কোন পদক্ষেপ করছেন, তা কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পারছেন না? শুধুমাত্র বিজেপিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্যই শোভন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ভঙ্গি করছেন— বিষয়টা যদি এমন হত, তা হলে মমতা তা বুঝতেন না? বিশ্লেষকরা বলছেন, শোভনের সে রকম উদ্দেশ্য থাকলে মমতার দরজা তাঁর জন্য খুলতই না। বৈশাখীকে বোনফোঁটা দেওয়া বা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে শোভনের পাশাপাশি বৈশাখীকেও আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাও ঘটত না। নিরাপত্তা ফিরে পাওয়া তো আরও অনেক দূরের কথা হত। কিন্তু ঠিক কী কারণে মমতা-শোভনের সম্পর্কের বরফ এত দিন পরে গলেছে, তা নিয়েও বিশ্লেষকরা একমত হতে পারছেন না।

বিষয়টি বুঝতে পারছেন না তৃণমূল নেতারাও। মাঝারি বা ছোট মাপের নেতারা নন, এ রাজ্যে তৃণমূলের একেবারে সামনের সারিতে থাকা নেতারাও শোভন-বৈশাখীর বিষয়ে অন্ধকারে। শুধুমাত্র দলনেত্রীর সঙ্গেই যোগাযোগ হচ্ছে কলকাতার প্রাক্তন মেয়রের। তৃণমূলের অন্য কোনও নেতা-নেত্রী এখনও শোভনদের নাগাল সে ভাবে পাচ্ছেন না। তবে নেত্রীর সঙ্গে যোগসূত্র পুনঃস্থাপিত হওয়ার পরে তৃণমূলের অন্য নেতানেত্রীরা শোভন-বৈশাখীর বিষয়ে একেবারেই চুপ। তাঁরা বিজেপিতে চলে যাওয়ার পরে নানা স্তরের তৃণমূল নেতা তাঁদের তীব্র আক্রমণ করছেন বিভিন্ন অবকাশে। ভাইফোঁটার পর থেকে সেই ঝুঁকি আর কেউ নিচ্ছেন না। আবার শোভনদের খুব স্পষ্ট ভাবে আক্রমণ করা থেকে বিজেপি নেতৃত্বও বিরত থাকছেন। শেষ পর্যন্ত কী করেন শোভন, তা দেখে নেওয়ার জন্য আপাতত অপেক্ষা করার নীতি নিচ্ছে গেরুয়া শিবির।