×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন

২১ জুন ২০১৫ ০১:৫৬

ঠি ক কবে থেকে লবঙ্গের সঙ্গে আমাদের পরিচয় বলা শক্ত— রোমান সাম্রাজ্য থেকে এর বোলবোলাও হলেও প্রত্নতাত্ত্বিকরা ১৭২১ খ্রিস্টপূর্বের সিরিয়াতেও লবঙ্গের নিদর্শন পেয়েছেন। শুধু লবঙ্গ না, সব রকম মশলা-বাণিজ্যেই আরব-রা নিজেদের মৌরসিপাট্টা কায়েম করে রেখেছিল। চিনা আর জাপানি বণিকদের কাছ থেকে লবঙ্গ আর অন্য মশলা কিনে তারা জাহাজপথে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে পৌঁছত, আর সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেত। সেই মশলার দাম ছিল অত্যন্ত চড়া— এক পাউন্ড দারচিনির বিনিময়ে তিনটে ভেড়া পাওয়া যেত সেই যুগে!

আরবদের সুখের দিন শেষ হল ১৪৯৭ সালে ভাস্কো ডা গামা’র আফ্রিকা পেরিয়ে ভারতবর্ষ ভ্রমণের সঙ্গে, যখন মশলা-বাণিজ্য চলে এল পর্তুগিজদের হাতে। পর্তুগিজরা আরবদের চেয়ে অনেক ধুরন্ধর ব্যবসাদার— তারা জাপানি আর চিনে বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা না করে সোজাসুজি মশলা উৎপাদক দেশগুলোর রাজাদের সঙ্গেই চুক্তি করতে শুরু করল। ইন্দোনেশিয়ার টার্নাটে দ্বীপ সেই সময় লবঙ্গ উৎপাদনে সেরা ছিল— পর্তুগিজরা সেখানকার সুলতানের সঙ্গে চুক্তি করে অচিরেই সেখানে লবঙ্গ কিনে রাখার জন্য গোলাঘর বানিয়ে ফেলল।

Advertisement



ইউরোপ তখন এই নতুন পাওয়া গুপ্তধনের সন্ধানে এতটাই আত্মহারা যে বিশ্বভ্রমণের পর ম্যাগেলান-এর জাহাজ যখন ১৫২২ সালে স্পেনের বন্দরে গিয়ে পৌঁছল, ফিলিপিন্সে মাক্‌তানের যুদ্ধে নিহত ম্যাগেলানের জন্য চোখের জল ফেলতে লোকে ভিড় করেনি, করেছিল লবঙ্গ-ভর্তি জাহাজ বন্দরে আসার আনন্দে।

এই মশলা-বাণিজ্যে থাবা বসানোর মরিয়া প্রচেষ্টা ছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশের। তা সত্ত্বেও পর্তুগিজদের এই সুখের সময় চলেছিল ১০০ বছর— ওলন্দাজরা ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়ার মোলাক্কাস দ্বীপে না পৌঁছনো অবধি। কিন্তু ওলন্দাজরাও একটা সাংঘাতিক ভুল করে ফেলে। লবঙ্গ-বাণিজ্যে নিজেদের একচেটিয়া রাখতে তারা নিজেদের সীমানার বাইরে বেড়ে ওঠা লবঙ্গ গাছগুলো ধ্বংস করে দিতে শুরু করে। এ দিকে, ওই দ্বীপের স্থানীয় উপজাতিদের এক রীতি ছিল: ঘরে সন্তান জন্মালে একটা লবঙ্গ গাছ পোঁতা— সেই গাছ আর শিশু একসঙ্গে বেড়ে উঠত সেই দ্বীপে, ওরা বিশ্বাস করত এই গাছের স্বাস্থ্য আর আয়ুর সঙ্গে শিশুর মঙ্গল-অমঙ্গল জড়িত। ওলন্দাজদের এই লবঙ্গ গাছ কাটার হিড়িক আদিবাসীদের এত দিনের বিশ্বাস, আচার ও আবেগের ওপর আঘাত হানে। ফলে ওলন্দাজরা হয়ে ওঠে আদিবাসীদের ঘৃণার পাত্র— সমস্ত রকমের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় তারা।

নাছোড় ওলন্দাজরা তা সত্ত্বেও নিজেদের না বদলালে শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ। সেই সময় সব যুদ্ধই শ্বেতপুরুষেরা জিতত— এখানেও অন্যথা হয়নি। কিন্তু এই বিদ্রোহের পর আর বেশি দিন ওলন্দাজরা লবঙ্গ-বাণিজ্যে আধিপত্য কায়েম রাখতে পারেনি— আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ লবঙ্গ উৎপাদন করতে শুরু করে।

লবঙ্গের কদর কি শুধু পাশ্চাত্যেই ছিল? মোটেই না। ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেরও আগে হান সাম্রাজ্যের সময় চিনদেশের নিয়ম ছিল, আমলারা রাজার কাছাকাছি গেলেই মুখে লবঙ্গ বাধ্যতামূলক। আর এই বাংলায় বিয়ের রাতে লবঙ্গের কুলুপ খুলে পান মুখে দিয়ে দাম্পত্য জীবনের সূচনার রীতি কত পুরনো বলা কঠিন।

pinakee.bhattacharya@gmail.com

‘আর এট্টা শালিক দেইখ্যা লই!’

১৯৮৭ সালে বদলি হলাম ত্রিপুরার আগরতলা রেডিয়ো স্টেশনে। সেই প্রথম প্লেনে চড়া। মাত্র ৪৫ মিনিটের যাত্রাপথ। দমদম এয়ারপোর্ট ছাড়ার কিছু পরেই পাইলট ঘোষণা করলেন, আমরা এখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাচ্ছি। আলাদা কিছু নজরে পড়ল না— সেই গাছগাছালি আর সরু সাদা ফিতের মতো নদী। পৌঁছলাম আগরতলা এয়ারপোর্ট। টিনের ছাউনি দেওয়া দোতলা বাড়ি, খুবই ছোট রানওয়ে, চারপাশে ধানখেত। কিছু ক্ষণ অপেক্ষার পর ট্রলিতে মালপত্র এল। নিজের সুটকেস নিয়ে বাইরে আসতেই দেখি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো আগরতলা’ লেখা সাদা অ্যামবাসাডর, পাশেই দাঁড়িয়ে ড্রাইভার, আমার নাম লেখা বোর্ড হাতে। অফিসের গাড়ি আমাকে নিতে এসেছে! মনটা খুশিতে ভরে উঠল। সরু এক ফালি পিচরাস্তা, দু’ধারে বাড়িঘর, অধিকাংশই টিনের চাল। প্রায় ৪০ মিনিট পর পৌঁছলাম আকাশবাণী আগরতলা অফিসে। বিকেল প্রায় সাড়ে চারটে, সুটকেস নামিয়ে দেখা করতে গেলাম স্টেশন ডিরেক্টর-এর সঙ্গে। এক সহকর্মী আমার পরিচয় দিতেই, তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে ‘গুড মর্নিং স্যর, আসেন আসেন’ বলে আপ্যায়ন করলেন। স্মিতহাস্যে তাঁকে অভিবাদন জানালাম, কিন্তু কানে খট করে বাজল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে চলল, এখন গুড মর্নিং!





ছবি: সুমিত্র বসাক


শুরু হল নতুন জায়গায় নতুন কর্তার অধীনে কাজ। স্টেশন ডিরেক্টর ভদ্রলোক আগে ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের ফিল্ড পাবলিসিটি বিভাগের পাবলিসিটি অফিসার। সেখান থেকে রেডিয়োতে চাকরি করতে এসেছেন, কাজকর্মে তখনও সড়গড় হননি। রেডিয়োতে তখন টেপরেকর্ডারের যুগ। একটি মাস্টার টেপ-এর গান বা কোনও অনুষ্ঠান প্রয়োজনে অন্য টেপ-এ ট্রান্সফার-রেকর্ডিংকে বলা হয় ‘ডাবিং’ করা। এক দিন স্টুডিয়োতে এক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় গান ডাব করছি। নতুন প্রোগ্রাম অফিসার কেমন কাজ করছে দেখার জন্য কখন আমার পিছনে চুপচাপ এসে দাঁড়িয়েছেন স্টেশন ডিরেক্টর। হঠাৎ আমি পিছন ফিরতেই চোখাচোখি। উনি অপ্রস্তুত, তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আমি তো শব্দ করি নাই। ডিস্টার্ব হয় নাই তো?’ বললাম, না না, আপনি শব্দ করলেও কোনও ডিস্টার্ব হত না। আমি তো গান ডাব করছি। উনি শুনে বললেন, ‘ও, গান ডাব করত্যাছেন? গান তো শুনত্যাছি— তা আপনের আর্টিস্ট কই?’ আমি অবাক। আর্টিস্ট! না না, আর্টিস্ট থাকবে কেন? তার গান তো টেপেই আছে! ‘ও! আর্টিস্ট লাগে না!’ বলেই বেরিয়ে গেলেন রেডিয়ো স্টেশনের সর্বময় কর্তা। কী বুঝলেন তা তিনিই জানেন।

তখন আকাশবাণীর অফিসের সময় দশটা-পাঁচটা। শীতকালে পাঁচটা বাজার আগেই সবাই রওনা দিত বাড়ির দিকে। এক দিন কাজ করতে করতে ছ’টা বেজে গেছে, অফিসের চৌকিদার সব ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে আমার ঘরে এসে বলছে, ‘ছার, ছোয়েটার পরে থাইকেন না।’ আমি অবাক! কেন, সোয়েটার পরে থাকব না কেন? শীতকালে তো সকলেই সোয়েটার পরে, তুমিও তো পরেছ! শুনে সে বলল, ‘না না, আমি কইত্যাছি ছোয়টার পরে থাইকেন না।’ এ বার ব্যাপার আমার বোধগম্য হল। ওর ডিউটি ছয়টা পর্যন্ত, তাই ছ’টার পর থাকতে বারণ করছে।

এক দিন এক শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করছেন, হঠাৎ আমার কানে এল তিনি গাইছেন, আলু আমার আলু... আমি শিল্পীর গান থামিয়ে বললাম, গানের কথা ঠিকমত উচ্চারণ করুন। ‘আলু আমার আলু’ নয়, ‘আলো আমার আলো, আলোয় ভুবন ভরা।’ শিল্পী আবার রেকর্ডিং করলেন, সেই এক ‘আলু আমার আলু’। আমি গান বদলাতে বলায় শিল্পী রেগে গেলেন: ‘মুই তো আলুই কইত্যাছি, আপনে হোনতেই ওরম হুনত্যাছেন!’

এক জন ঘোষিকা ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ডে চাকরি পেয়েছেন। বয়স ছাড়িয়েছে পঞ্চান্ন বছর, নিপাট গোবেচারা ভালমানুষ গোছের, তবে প্রচণ্ড সংস্কারাচ্ছন্ন। এক দিন সকাল ছ’টায় ট্রান্সমিশন ওপ্‌ন করার কথা তাঁর। অফিসের গাড়িতে সময়মতই সকলে এসে পৌঁছেছেন সেন্টারে। আকাশবাণীর অনুষ্ঠান মানে ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা ধরে চলা। তো সেই ঘোষিকা স্টুডিয়োয় ঢুকতে যাবেন, এমন সময় ওঁর চোখে পড়ল একটা শালিক পাখি। আর যায় কোথায়। তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন স্টুডিয়োর বাইরেই, দুই শালিক না দেখা অবধি তিনি কাজ শুরু করবেন না। ও-দিকে অনুষ্ঠান শুরুর সময় হয়ে যাচ্ছে, ডিউটি অফিসার দু’বার তাগাদা দিয়েছেন, কিন্তু ভদ্রমহিলার এক কথা: ‘খাড়াইন, আর এট্টা শালিক দেইখ্যা লই!’ পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিউটি অফিসার ছুটলেন স্টুডিয়োয়, কিন্তু তাঁর তো ‘কনসোল’ অপারেট করে অনুষ্ঠান চালানোর অভ্যেস নেই— তাই তাড়াহুড়োয় ভুল করলেন প্রথমেই। সেই ভুল নিয়ে হইহই। ইঞ্জিনিয়ারদের নোট, ডিউটি অফিসারের তিন পৃষ্ঠার বিবরণ, নানা জনের টীকাটিপ্পনী, মহিলাটির প্রশাসনিক শাস্তি। আসলে শহরের মধ্যে ছোট্ট জায়গা, সকলের বিনোদন বা তথ্য সংগ্রহের একমাত্র মাধ্যম আকাশবাণী, তখনও আগরতলায় সকালে দূরদর্শনের অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়নি। তাই সেখানে একটা ছোট্ট ব্যাপার ঘটলেও মনে করা হত, সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, এটাকে নিয়ে রইরই না করলেই নয়।

এক বার অফিসে সরকারি আদেশ এল, নবজাতকের ছ’মাস বয়স পর্যন্ত লালনপালনের জন্য সন্তানের মা অতিরিক্ত ছুটি নিতে পারবেন। এর পরেই হঠাৎ এক দিন সেই ঘোষিকা ভদ্রমহিলা ছুটতে ছুটতে এলেন আমার কাছে, হাতে তিন মাসের ছুটির দরখাস্ত। ‘ছার, ছার, আপনি কিন্তু না কইরেন না, আমারে ছুটি দেওন লাগবো।’ কীসের ছুটি? ‘ওই যে অরা হগ্গলে কইত্যাছে মায়েরা ছুটি পাইবো, তাই দরখাস্ত করছি আমার মাইয়ার লাইগ্যা।’ মেয়ের দেখাশোনা! সে কি ছ’মাসের বাচ্চা? ‘ও মা! কী যে কন ছার! আমার মাইয়ার বয়স তো ছাব্বিশ, চাকরি করে ব্যাংকে।’ বিরক্ত হয়ে বলি, তবে? আপনি অতিরিক্ত ছুটি পাবেন কেন? ভাল ভাবে অর্ডারটা পড়ুন আগে! উনি বিড়বিড় করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান: ‘তাইলে অরা যে কইলো মায়েরা ছুটি পাইবো...!

বিমলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মেফেয়ার রোড, কলকাতা

যেখানেই কাজ করুন, ব্যাংক, রেস্তরাঁ, আইটি, অন্য কোথাও— আপনার অফিসের পরিবেশ পিএনপিসি
হুল্লোড় কোঁদল বস কলিগ ছাদ ক্যান্টিন— সব কিছু নিয়ে ৭০০ শব্দ লিখে পাঠান।
ঠিকানা: অফিসফিস, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১

Advertisement