Advertisement
E-Paper

স্তন্যপায়ী হয়েও ডিম পাড়ে! ঘামের মতো ঝরায় দুধ! বিশ্বের ‘আশ্চর্যতম’ প্রাণীর শরীরে লুকিয়ে অনেক রহস্য

বিশ্বের ‘আশ্চর্যতম’ স্তন্যপায়ী। তারা এক শরীরে অনেক রকম প্রাণীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঘুরছে। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এই বৈশিষ্ট্যগুলি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছিল। ধীরে ধীরে রহস্যের উদ্‌ঘাটন হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬
জলের নীচে ঢুকে শিকার ধরে প্ল্যাটিপাস।

জলের নীচে ঢুকে শিকার ধরে প্ল্যাটিপাস। —ফাইল চিত্র।

স্তন্যপায়ী প্রাণী, অথচ ডিম পাড়ে! চমকে দেওয়ার জন্য এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার প্ল্যাটিপাসদের শরীরের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে রহস্য। বিশ্বের ‘আশ্চর্যতম’ স্তন্যপায়ী প্রাণীর আখ্যা তাদের দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্ল্যাটিপাসেরা এক শরীরে একাধিক প্রাণীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঘুরছে। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এই বৈশিষ্ট্যগুলি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছিল। ধীরে ধীরে রহস্যের উদ্‌ঘাটন হয়েছে।

প্ল্যাটিপাসদের বিজ্ঞানসম্মত নাম ওরনিথরিনচাস অ্যানাটিনাস। বিশ্বে এই মুহূর্তে মাত্র দু’টি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা স্তন্যপায়ী হয়েও ডিম পাড়ে। প্ল্যাটিপাস তাদের মধ্যে একটি। দ্বিতীয় প্রাণীটির নাম এচিডনা এবং তারাও অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। বিজ্ঞানীরা বলেন, স্তন্যপায়ীদের অতি প্রাচীন বংশোদ্ভূত এই প্ল্যাটিপাস এবং এচিডনা। তাই বিবর্তনের চিহ্ন তারা এখনও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রাচীন স্তন্যপায়ী মনোট্রিম গোষ্ঠীভুক্ত প্ল্যাটিপাসদের দেখতে খানিকটা পাখির মতো। তবে তাদের সারা দেহ লোমে ঢাকা, ঠোঁটগুলি হাঁসের মতো এবং লেজ কানাডার জাতীয় প্রাণী বিভারদের মতো। এরা সন্তান প্রসব করে না। ডিম ফোটার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাতে তা দেয়। শিশুকে স্তন্য পান করানো এবং শিকার ধরার ক্ষেত্রেও প্ল্যাটিপাসদের আচরণ চমকপ্রদ।

কেন ডিম পাড়ে

প্ল্যাটিপাসদের মূলত তিনটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যে আলোকপাত করেন বিজ্ঞানীরা। সেগুলি নিয়েই দীর্ঘ দিন চলেছে পরীক্ষানিরীক্ষা। প্রথম বৈশিষ্ট্য অবশ্যই সন্তান উৎপাদনের ধরন। স্তন্যপায়ীদের সংজ্ঞাতেই বলা আছে, তারা সন্তান প্রসব করে। তাহলে কেন স্তন্যপায়ী হয়েও প্ল্যাটিপাস ডিম পাড়ে? বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, বিবর্তনের একটি পর্যায়ে প্ল্যাটিপাসের মতো মনোট্রিম গোষ্ঠীর বৃদ্ধি, পরিবর্তন থমকে গিয়েছিল। সরীসৃপ এবং পাখির বৈশিষ্ট্য তাই তাদের শরীরে রয়ে গিয়েছে। প্রজননের বিবর্তন সংক্রান্ত ২০০৮ সালের একটি গবেষণা বলছে, মনোট্রিমরা তাদের পূর্বপুরুষ অ্যামনিয়োটদের প্রজননের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ধরে রেখেছে। তাই স্তন্যপায়ী হলেও পাখি ও সরীসৃপের সঙ্গে তাদের বেশি মিল পাওয়া যায়।

Advertisement

অধিকাংশ স্তন্যপায়ী ভ্রুণকে শরীরের ভিতরে ধারণ করে। কিন্তু স্ত্রী প্ল্যাটিপাস নরম চামড়ার মতো আবরণযুক্ত ডিম পাড়ে। শরীরের ভিতর সামান্য বিকাশের পর ডিমগুলি বাইরে বেরিয়ে আসে। ডিমের মধ্যেই থাকে শিশুর বেড়ে ওঠার যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদান। এই ডিম ফুটে অত্যন্ত অপরিণত অবস্থায় প্ল্যাটিপাসের বাচ্চাগুলি বেরিয়ে আসে। তাদের চোখ ফোটে না। সম্পূর্ণ ভাবে মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকে এই সমস্ত শিশু প্ল্যাটিপাস। গবেষকদের একাংশের দাবি, প্ল্যাটিপাসেরা বিবর্তনে কখনওই পিছিয়ে পড়েনি। বরং তারা পৃথক ভাবে বিবর্তিত হয়েছে। তাই তাদের মধ্যে পুরনো কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন আছে, আধুনিক বৈশিষ্ট্যও রয়েছে।

ঘামের মতো ঝরে দুধ!

ডিম পাড়ার বৈশিষ্ট্য যদি প্ল্যাটিপাসকে পাখি এবং সরীসৃপদের ঘনিষ্ঠ করে তোলে, তবে শরীরে দুধ উৎপাদনের বৈশিষ্ট্যটি তাদের স্তন্যপায়ী সত্তা প্রমাণ করে। সন্তান জন্মের পর প্ল্যাটিপাসের শরীরে দুধ উৎপন্ন হয় বটে, কিন্তু স্ত্রী প্ল্যাটিপাসের কোনও স্তনবৃন্ত নেই। তা শিশুর মুখে ঢুকিয়ে সরাসরি দুধ খাওয়ানোর কোনও বন্দোবস্ত নেই। ১৯৮৩ সালের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, প্ল্যাটিপাসের স্তনগ্রন্থি তাদের ত্বকের উপর সরাসরি খুলে যায়। বিশেষ নালীর মাধ্যমে দুধ বেরিয়ে জমা হয় পেটের ত্বকের খাঁজে। সেখান থেকে বাচ্চাগুলিকে চেটে চেটে দুধ খেতে হয়। ত্বক থেকে সরাসরি দুধ বেরিয়ে আসে বলে অনেকে বলেন, প্ল্যাটিপাসেরা ঘামের সঙ্গে দুধ ঝরায়। কিন্তু এই দুধ আদৌ ঘাম নয়। তাতে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৃত পুষ্টিগুণ থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্ল্যাটিপাসের দুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া স্তন্যপায়ীদের বিবর্তনের প্রাথমিক একটি ধাপকে চিহ্নিত করে। শিশু প্ল্যাটিপাসের মুখে দুধ তুলে দেওয়া নয়, বরং মায়ের কোল থেকে তাদের তা সংগ্রহ করে নিতে হয়। এটি শিশুগুলির বিকাশের ক্ষেত্রেও কার্যকর একটি পর্যায়।

ঠোঁটে দিয়ে যায় চেনা!

আধা-জলজ একটি প্রাণী প্ল্যাটিপাস। প্রায়ই জলের নীচে গিয়ে কাদামাটিতে শিকার ধরে। সেখানে দৃশ্যমানতা প্রায় থাকে না বললেই চলে। শিকারের সময় তাই প্ল্যাটিপাসেরা চোখ, কান এবং নাক বন্ধ করে নেয়। কিন্তু তার পরেও যে তারা তীক্ষ্ণ শিকারি হিসাবে পরিচিত, তার একমাত্র কৃতিত্ব প্ল্যাটিপাসদের ঠোঁটের। এই ঠোঁট দিয়ে জলের মধ্যে বিদ্যুতের তরঙ্গ চিনে নিতে পারে প্ল্যাটিপাস। ১৯৯৯ সালের গবেষণায় তাদের ঠোঁটের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানান, জলের মধ্যে প্রাণীর নড়াচড়ার ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ উৎপন্ন হয়। সাধারণ ভাবে তা ধরা যায় না। কিন্তু প্ল্যাটিপাসদের ঠোঁট অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঠোঁটের ত্বকে থাকে বিশেষ ইলেকট্রোরিসেপটর। এগুলি অতি সূক্ষ্ম সঙ্কেতও ধরে ফেলতে পারে। তাই জলের ভিতরে সামান্য বিদ্যুৎ-সঙ্কেতও প্ল্যাটিপাস চিনে নেয় সহজেই। বিদ্যুতের এই সঙ্কেতকে জলের চাপ এবং নড়াচড়ার অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে নেয় প্ল্যাটিপাস। শিকার ধরতে আর কোনও অসুবিধা হয় না তাই। বিজ্ঞানীরা প্ল্যাটিপাসের ঠোঁটের এই পারদর্শিতার নাম দিয়েছেন ‘ইলেকট্রোরিসেপশন’। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিরল।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্ল্যাটিপাস বিচ্ছিন্ন কোনও প্রাণী নয়। বরং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে সুসংগঠিত একটি প্রাণী। বিবর্তন কখনও সরলরেখায় চলতে পারে না। প্রকৃতি নিজের মতো পরীক্ষানিরীক্ষা করে, নতুন নতুন সংমিশ্রণ তৈরি করে এবং যেগুলি যোগ্যতম, সেগুলিকে ধরে রাখে। প্ল্যাটিপাসের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। এই মুহূর্তে প্ল্যাটিপাসেরা অস্ট্রেলিয়াতেই সীমাবদ্ধ। দ্রুত বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এই প্রাণী। যা নিয়ে জীববিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। তাদের সংরক্ষণের বন্দোবস্তও করা হচ্ছে।

Platypus Australia Scientific Discovery
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy