হঠাৎই মস্কোর রাস্তায় পুলিশের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। বেড়ে গিয়েছে নিরাপত্তার কড়াকড়ি। দলে দলে আসছেন ইংল্যান্ড সমর্থক। যাতে সেই দলে ‘ফুটবল গুন্ডা’-রা ঢুকে ঝমেলা পাকাতে না পারে সে জন্য প্রচন্ড সতর্ক রুশ প্রশাসন।

হ্যারি কেনের আলোয় উজ্জ্বল ইংল্যান্ডকে দেখে নড়ে গিয়েছে রাজ পরিবারও।

রাশিয়ায় দল পাঠালেও, কুটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় রাজ পরিবার ও সরকারের লোকজন এত দিন পর্যন্ত আসার প্রয়োজন মনে করেননি রাশিয়ায়। সব বিবাদ সরিয়ে ফেলে সবাই আজ বসবেন লুঝনিকির গ্যালারিতে, দেশের নতুন প্রজন্মের ইংল্যান্ডকে দেখতে। উপভোগ করতে।

ইংল্যান্ড যে জায়গায় টুনার্মেন্টের শুরু থেকে বেস ক্যাম্প করেছিল, সেটা সেন্ট পিটাসবার্গের মূল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। জায়গাটার নাম রেপিনো। রাজারহাট বা নিউ টাউনের মতো জায়গা। সমুদ্র সৈকতে ওই বিচ রিসর্টে আসার পর শুরুতে দারুণ সমস্যায় পড়েছিলেন হ্যারি কেন, রাহিম স্টার্লিংরা। সারাদিন সূর্যের আলোর জন্য ঘুমোতেই পারছিলেন না কেউ। জানলা দিয়ে আলো এসে ঘুম নষ্ট করে দিত। শেষ পর্যন্ত জানালায় কালো পর্দা লাগিয়ে নিয়মিত ঘুমোতে যেতে হত গ্যারেথ সাউথগেটের দলকে। আসলে জুন-জুলাই মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গে কার্যত রাতই হয় না। বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে ‘রাতের সাদা আলো’ বা ‘হোয়াইট লাইট’ দেখতে ভিড় করেন। সূর্য ডুবলেও একটা মায়াবি সাদা আলো ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র।

আরও পড়ুন:  ‘ক্রোয়েশিয়া, ইংল্যান্ড তারকা-নির্ভর নয়’

কিন্তু এখন আর হ্যারি কেন অ্যান্ড কোম্পানি ‘অন্ধকার’ চায় না। ১৯৯০ এর পর ইংল্যান্ডে তো শুধুই অন্ধকার। ইটালি বিশ্বকাপে ববি রবসন, গ্যারি লিনেকাররা শেষ বার শেষ চারে তুলেছিলেন ইংল্যান্ডকে।  তারপর ডেভিড বেকহ্যাম, ওয়েন রুনিরা অনেকেই এসেছেন, অন্ধকার কিন্তু ঘোচেনি। এ বার ফের ইংল্যান্ডের বারান্দায় আঠাশ বছর পর রোদ্দুরের উঁকি ঝুঁকি। আজ বুধবার শেষ চারের ক্রোয়েশিয়াকে অন্ধকারে পাঠাতে পারলেই আরও আলো এসে পড়বে সাউথগেটের টিমের উপর। সামনে শুধূ তখন ১৯৬৬-র ববি মুরের ইংল্যান্ড। বাহান্ন বছর আগের সেই পূর্ণিমার আলো আনার চেষ্টায় এ বার তাই মরিয়া অ্যাশলে ইয়ং, কিয়ারেন ট্রিপিয়াররা। লুকা মদ্রিচ, ইভান রাকিতিচদের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে অবশ্য দারুণ শান্ত ইংল্যান্ড শিবির। সব উত্তেজনা ও চাপ সরিয়ে রাখতে নানা রকম অনুশীলন চলছে সেখানে। কখনও কবাডি, কখনও টেকবল অনুশীলন চলছিলই। এ দিন আবার রবারের মুরগি নিয়ে  অনুশীলন করলেন কেনরা। পাসিং গেম বা পজিশনিং ঠিক করতে এই অনুশীলন হল। সকালে মিনিট পনেরো অনুশীলনে দেখতে দেওয়া হল মিডিয়াকে। সেখানে দেখা গেল মুরগী নিয়ে একে অন্যকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন কেনরা। ছোঁড়ার সময় যিনি ছুঁড়ছেন তার হাত থেকে সেটি কেড়ে নেওয়ার জন্য ধেয়ে যাচ্ছেন  একজন। বল পায়ে পড়লে যেটা করতে পারেন মদ্রিচরা, সেটাই করছেন ওই তাড়া করা ফুটবলার।

কিন্তু এ বারের ক্রোয়েশিয়া যে রবারের মুরগি নয়। বরং প্রচন্ড শক্তিশালী। তীব্র শব্দব্রহ্মের মধ্যে সংগঠক  রাশিয়াকে তারা হারিয়েছে টাইব্রেকারে।  সেটা জানেন ইংল্যান্ড কোচ সাউথগেট। সে জন্যই জ্লাটকো দালিচের দলের বিরুদ্ধে নামার আগে ইংল্যান্ড কোচ এ দিন বলে দিলেন, ‘‘আমাদের দলে কোনও তারকা নেই। আমাদের এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। আমরা সবাই মিলে একটা দল। এ বারের বিশ্বকপে যে তিনটে দল সব চেয়ে কম বয়সী ফুটবলার খেলাচ্ছে তাদের মধ্যে আমার দল আছে। ওরা নিজেরাই স্বপ্ন দেখছে কিছু করার।’’ ইংল্যান্ড দলে কোনও চোট আঘাত নেই। জর্ডান হেন্ডার্সনের সামান্য চোট ছিল কিন্তু তিনিও দেখলাম ‘মুরগী-চোর’ খেলছেন।

জ্যোতিষী: রাশিয়ার এক চিড়িয়াখানায় দুই দেশের পতাকা দিয়ে বানানো হয়েছিল দু’টো বাক্স। ইংল্যান্ডকে ছেড়ে ক্রোয়েশিয়ার বাক্স ধরে বাঘের ভবিষ্যদ্বাণী, সেমিফাইনালে জিতবেন লুকা মদ্রিচরাই। ছবি: রয়টার্স

ইংল্যান্ডের সব চেয়ে বড় সুবিধা তাদের অধিনায়ক এখনও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সোনার বুটের দিকে দৌড়োচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্টার্লিং, ভার্দি, গ্যারি ক্যাহিলরা। কিন্তু তাতে যে একেবারেই কাঁপছে না ক্রোয়েশিয়া। তাদের গোলকিপার-সহ চার জন ফুটবলারের সামান্য চোট রয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাটকো দালিচ বলে দিয়েছেন, ‘‘আমার দলের রক্ষণ লিয়োনেল মেসির মতো ফুটবলারকে খেলতে দেয়নি। হ্যারি কেনকে ওরা ভয় পাবে কেন? হ্যারি তো মেসি নয়।’’ আটানব্বইতে শেষ বার সেমিফাইনালে উঠেছিল ক্রোয়েশিয়া। কুড়ি বছর পর আবার ফাইনালে ওঠার সুযোগ তাদের সামনে। সে জন্য পুরো দলই তেতে।'

এর আগে পাঁচবার দু’দলের দেখা হয়েছে। তার মধ্যে তিন বার জিতেছে ইংল্যান্ড। বাকি দু’বার ক্রোয়েশিয়া। শেষ বার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ৫-১ হারিয়েছিল ক্রোয়েশিয়াকে। সেই দলের অধিনায়ক দাভর সুকের এখন ক্রোয়েশিয়া ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান। তিনি অবশ্য মস্কোর এই ম্যাচকে প্রতিশোধের ম্যাচ হিসাবে দেখতে রাজি নন। বলে দিয়েছেন, ‘‘কোনও প্রতিশোধ নিতে আমরা নামছি না। ছেলেরা নামবে একটা উত্তেজক ম্যাচ জেতার জন্য।’’

সুকের যতই ‘প্রতিশোধ নেওয়া’ শব্দটা থেকে দূরে থাকতে চান, তাঁর দলের মনোভাব কিন্তু অন্য। ‘‘এটা আমাদের কাছে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ম্যাচ। ইংল্যান্ড ভাল দল। কিন্তু আমাদের দলও যথেষ্ট শক্তিশালী।’’ বলে দিয়েছেন দলের অধিনায়ক রিয়াল মাদ্রিদের লুকা মদ্রিচ।

‘ইউক্রেন’ নিয়ে বিতর্কিত ছবি ও মন্তব্য পোস্ট করার জন্য দলের সহকারী কোচ ও এক ফুটবলারকে ফিফা সতর্ক করেছে। সহকারী কোচের চাকরিও যেতে পারে বলে খবর। তাতে অবশ্য দলে কোনও প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। কারণ ক্রোয়েশিয়ায় রয়েছে ক্লাব ফুটবলের এক ঝাঁক নক্ষত্র। রিয়াল মাদ্রিদের লুকা মদ্রিচ, বার্সেলোনার ইভান রাকিতিচ একে অপরের বিরুদ্ধে নামেন এল ক্লাসিকোতে। এখানে দু’জনে নামবেন লাল-সাদা জার্সি পরে। সঙ্গে জুভেন্তাসের মারিয়ো মানজুকিচ তো রয়েইছেন। ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। অ্যাশলে ইয়ং বা ডেলে আলিরা তাদের রুখতে না পারলে আলো আসবে না ইংল্যান্ডের ঘরে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের সেই ‘সাদা আলো’ আটশো কিলোমিটার দূরে পূর্ণিমা হয়ে হ্যারি কেনদের উপরে পড়বে তখনই, যদি গ্যারেথ সাউথগেটের দল মাঝমাঠের ব্যাটন নিজেদের হাতে নিতে পারে।