Advertisement
E-Paper

রাস্তা নেই, পিনকোডও নেই! অশোকের রামপুরা অন্য পৃথিবী, শুভমনদের মতো গ্রামবাসীদেরও ভরসা তাঁর বলের ১৫০ কিমির গতি

অশোক শর্মার গ্রামে কোনও রাস্তা নেই। পিনকোডও নেই! কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎ এসেছে। উন্নয়ন এটুকুই। জয়পুর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরের এক অজানা পৃথিবী থেকে আইপিএলের ঝকঝকে দুনিয়ায় শুভমন গিলের সতীর্থ।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ২০:১৩
picture of cricket

(বাঁ দিকে) অশোক শর্মা এবং শুভমন গিল (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

আইপিএলে নজর কেড়েছেন অশোক শর্মা। গুজরাত টাইটান্সের বোলারের বলের গতি ১৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রায়ই। ২৩ বছরের ক্রিকেটারকে নিয়ে ভাল কিছুর আশায় রয়েছেন শুভমন গিলেরা। আশায় রাজস্থানের রামপুরা গ্রামের বাসিন্দারাও।

শুভমনদের আশা, অশোকের বলের গতি আইপিএলে ভাল জায়গায় পৌঁছে দেবে গুজরাতকে। গ্রামবাসীদের এত গতি দরকার নেই। তাঁরা শুধু চান গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত একটা রাস্তা। জয়পুর থেকে রামপুরার দূরত্ব মেরেকেটে ৩৫ কিলোমিটার। তা-ও উন্নয়ন গতি পায়নি। দিল্লি-মুম্বই এক্সপ্রেসওয়ে ছেড়ে রামপুরার দিকে খানিকটা এগোলেই মাটির পথ। কয়েক কিলোমিটার রাস্তায় এখনও উন্নয়নের পরত পড়েনি। কিছু দূর গিয়ে রেললাইন টপকানোর পর রাস্তাই নেই! মাঠের মধ্যে দিয়েই চলাচল। মানুষ চলে চলে যেমন রাস্তা তৈরি হয়। মন্দের ভাল, বিদ্যুৎ এসেছে কয়েক বছর আগে। আইপিএলের ঝকঝকে দুনিয়ার সঙ্গে রামপুরার ন্যূনতম মিল নেই। অন্য পৃথিবী।

অশোক আইপিএলে সাফল্য পাওয়ার পর অনেকেই তাঁর বাড়ি যেতে চাইছেন। কিন্তু কিন্তু করছেন তাঁর দাদা অক্ষয় শর্মা। বলা ভাল, লজ্জা পাচ্ছেন। কেন? একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে অক্ষয় বলেছেন, ‘‘লোকজনকে আসতে বলতে লজ্জা লাগে। কী করে আসবে? রাস্তাই তো নেই আমাদের এখানে। ঠিকানাও দিতে পারি না। আমাদের গ্রামের কোনও পিনকোডও নেই। কয়েক শো মিটার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। সরু সরু রাস্তা। অসংখ্য বাঁক। গাড়ি নিয়ে আসলে সমস্যায় পড়বেন। গাড়ি নিয়ে সকলে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেও পারবেন না হয়তো।’’

Advertisement

প্রত্যন্ত গ্রাম বললেও কম বলা হয়। অধিকাংশ বাড়িই মাটির। অক্ষয়েরা এখন থাকেন দোতলা পাকা বাড়িতে। অশোক ক্রিকেট খেলে যে আয় করেছেন, মূলত তা দিয়েই তৈরি বাড়ি। ভাইয়ের দৌলতে আর্থিক অনটন নেই এখন। তা হলে কেমন এমন প্রত্যন্ত জায়গায় থাকেন? অক্ষয় বলেছেন, ‘‘আমরা এখানকারই মানুষ। কয়েক পুরুষের বাস। শিকড় ছেড়ে যেতে মন চায় না আমাদের। পরিবারের সকলেই এখানে থাকতে চায়। আমাদের অসুবিধা হয় না। জন্মে থেকেই আমরা অভ্যস্ত এ ভাবে থাকতে। অশোকও এখানেই থাকতে ভালবাসে। কিছু থাক আর না থাক, আমাদের গ্রামে শান্তি রয়েছে। আমি ক্রিকেট খেলতাম। ভাই আমাকে দেখেই ক্রিকেট খেলা শুরু করে। অশোকও বলে, ‘যাই হয়ে যাক গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাব না।’ আমরা কেউ এই শান্তিটা ছেড়ে যেতে চাই না।’’

বাড়ির সামনে দু’দিকে দুটো নিম গাছ। ওটাই অশোকের ‘হোম গ্রাউন্ড’। ঘরের ২২ গজ। এক ধারে দুটো দড়ির খাটিয়া রাখা। গ্রামের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। অতিথি আপ্যায়নের আয়োজনও বটে। নিয়মিত রঞ্জি ট্রফি বা আইপিএল খেলেন এমন ক্রিকেটারেরা কেউই প্রত্যন্ত গ্রামে পড়ে থাকেন না। সকলেই শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে চলে আসেন। বদলে যায় জীবনযাত্রার মান। মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে যান। অশোক ব্যতিক্রম। তিনি গ্রামের মাটি আঁকড়ে রয়েছেন এখনও। কেন? অক্ষয়ের বক্তব্য, ‘‘অশোক বিলাসবহুল জীবনযাপন পছন্দ করে না। যে ভাবে এই পর্যন্ত পৌঁছেছে, সে ভাবেই থাকতে চায়। গাড়ি, বাড়ি নিয়ে ওর আগ্রহ নেই। বাড়িতে থাকলে ভোর ৫টায় উঠে পড়ে। গ্রামের মাঠে দৌড়োয়। তার পর ৩ ঘণ্টা অনুশীলন করে। তার পর সকাল ৮টায় ঘরে ফিরে আবার ঘুমোয়। খাওয়ার ব্যাপারেও খুব সতর্ক থাকে। যখন কলকাতা নাইট রাইডার্সে ছিল, তখন হাঁটুতে চোট পেয়েছিল। তার পর থেকে খুব নিয়ম মেনে চলে।’’ অক্ষয় আরও বলেছেন, ‘‘অশোক বলে, চাইলেই বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারে। সঙ্গতিও রয়েছে ওর। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে কোথাও ওর ভাল লাগে না। বাড়ির খাবার ছাড়া খায় না। খাওয়া, অনুশীলন এবং বিশ্রাম— এই তিনটে জিনিসের সঙ্গে কোনও রকম আপস করে না।’’

(বাঁ দিকে) গুজরাত টাইটান্স কোচ আশিস নেহরা এবং অশোক শর্মা (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) গুজরাত টাইটান্স কোচ আশিস নেহরা এবং অশোক শর্মা (ডান দিকে)। ছবি: পিটিআই।

বাবা নাথুলাল শর্মাকে একটা ইলেকট্রিক স্কুটার কিনে দিয়েছেন গুজরাতের বোলার। সেটা নিয়েই যান চাষের কাজ দেখাশোনা করতে। গম চাষ করছেন এখন। মা লালি দেবীও সাধারণ গ্রাম্য মহিলা। ক্রিকেটারের বাড়িতে কাচের বাসনও নেই। অতিথি এলে স্টিলের গ্লাসে জল দেন। থালায় খাবার। বাড়ি থাকা দই আর নানা মশলা দিয়ে মায়ের তৈরি এক বিশেষ পানীয় দু’ভাইয়ের পছন্দ। লালি দেবী বলেছেন, ‘‘আমার তৈরি এই সরবত খেয়েই দু’ছেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে খেলত। গরম যতই হোক, এক গ্লাস সরবতই শরীর তরতাজা করে দেয়।’’ কী থাকে তাঁর তৈরি বিশেষ সরবতে? নজরকাড়া ক্রিকেটারের মা ‘রেসিপি’ গোপনই রাখলেন।

দুই ভাইই জোরে বোলার। দু’জনের বলের গতিই ভাল। স্থানীয় ব্যাটারেরা তাঁদের বল খেলতে ভয় পান। দু’ভাই আবার এক দলের হয়েই খেলেন। মুখোমুখি লড়াইয়ে সায় নেই তাঁদের। অক্ষয় বলেছেন, ‘‘আমরা ব্যাটারদের গতিতে ভয় পাওয়াতে চাই। ওরা ভয় পেলে মনে হয় কিছু একটা করতে পেরেছি। এই গ্রামে এ ছাড়া আর কী পাওয়ার আছে? এটুকুই আনন্দ।’’

কাকা রামদয়াল শর্মার উৎসাহে দু’ভাইয়ের ক্রিকেটার হওয়া। রামদয়ালও ক্রিকেট খেলতেন। জোরে বোলার ছিলেন। ভাল গতি ছিল তাঁরও। অক্ষয়-অশোকের প্রাথমিক ক্রিকেট পাঠ কাকার কাছেই। ভাইপোদের নিয়ে ভীষণ গর্বিত রামদয়াল। অক্ষয় বলেছেন, ‘‘আমরা কাকাকে ক্রিকেট খেলতে দেখিনি। আর্থিক অনটনে অনেক আগেই ক্রিকেট ছাড়তে হয়েছে কাকাকে। আমরা শুনেছি, কাকাও খুব জোরে বল করতেন। বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাকাকে নিয়ে যাওয়া হত, তাদের দলের হয়ে খেলার জন্য। কাকাকে নিয়ে টানাটানি হত আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে। খেলার সময় কাকা বড় চুল ছিল। প্রথম দিকের মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মতো।’’

ভাইকে ক্রিকেটার করতে খেলা ছাড়তে হয় অক্ষয়কে। নাথুলাল দু’ছেলের খেলার খরচ টানতে পারতেন না। ভাইয়ের জন্য নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেন অক্ষয়। তা ভোলেননি অশোক। কাকা এবং দাদার বড় ক্রিকেটার হওয়ার অপূর্ণ স্বপ্ন একাই পূরণ করতে চান। কেকেআর এবং রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে আইপিএল খেলার সুযোগ পাননি। দু’দলই তাঁকে ভাল টাকায় কিনেও খেলায়নি। সেই আক্ষেপ মিটেছে গুজরাতে যোগ দিয়ে। আক্ষেপ শুধু অশোকের নয়। গোটা পরিবারের। তাই এ বার পঞ্জাব কিংস-গুজরাত টাইটান্স ম্যাচে অশোকের আইপিএল অভিষেক দেখতে গোটা পরিবার ৪৫০ কিলোমিটার দূরে চন্ডীগড়ে গিয়েছিল গাড়ি চালিয়ে। অশোকই কিনেছেন গাড়ি। নিজের জন্য নয়। গোটা পরিবারের জন্য। এই রাস্তায় গাড়ি চলে? অক্ষয় বললেন, ‘‘ওই চলে। চালাতে হয়। অসুবিধা হলেও চালানো যায়। রাজস্থানে থাকার সময়ও ভাই টিকিট দিয়েছিল। সে বারও গিয়েছিলাম খেলা দেখতে। তবে এ বারের অনুভূতি একদম আলাদা।’’ বাড়ির সকলকে খেলা দেখার জন্য অহমদাবাদেও ডেকে ছিলেন অশোক। গোটা পরিবার ১০ ঘণ্টা ট্রেনে করে জয়পুর থেকে অহমদাবাদে গিয়েছিল। প্লেনে কেন গেলেন না? নাথুলাল বললেন, ‘‘না না, ট্রেনই ঠিক আছে।’’ অক্ষয় বলেছেন, ‘‘বাবার প্লেনে উঠতে ভয় লাগে। তবে মায়ের প্লেনেও ওঠার খুব ইচ্ছে। হয়তো কোনও একদিন আমরা সকলে প্লেনেও উঠব।’’

অশোক শর্মা।

অশোক শর্মা। ছবি: পিটিআই।

অক্ষয় শান্ত স্বভাবের হলেও অশোক ছোট থেকেই দুরন্ত। প্রায় দিনই স্কুল কেটে বাড়ি চলে আসতেন। অক্ষয়ের কথায়, ‘‘একেক দিন একেক রকম যুক্তি দিত। অদ্ভূত সব কথা বলত। আসলে সারাক্ষণ খেলতে চাইত। পড়াশোনায় তেমন মন ছিল না। বাড়ির কত কী যে ভেঙেছে। ভাই ভেঙেটেঙে পালিয়ে যেত। আমি মার খেতাম। এক বার ওর জন্য বাবার কাছে বেল্টের মারও খেয়েছি।’’

২০২৩ সালে কেকেআরে ছিল অশোক। আইপিএল শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার আগে অক্ষয় ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী উপহার চাই। উত্তরের অশোক বলেছিলেন, তাঁর ‘থর’ চাই। অন্য কোনও গাড়ি হলে হবে না। ‘থর’ কিনে না দিলে বাড়িতেই ফিরবেন না! গাড়ির পাশে রাখা থাকে অশোকের গাড়ি। নিজে চড়ার খুব একটা সুযোগ পান না। ক্রিকেটের জন্য বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখন জয়পুরে থাকতে হয়। বাড়ির অন্যেরাও চড়েন না। অশোককে ছাড়া কেউ ও গাড়িতে চড়তে চান না। বাড়িতে থাকলে ২ বছরের ভাইঝিকে নিয়ে গাড়ি করে ঘুরতে যান অশোক। তাঁর গাড়ি এখন রামপুরা গ্রামের সবচেয়ে দ্রষ্টব্য বস্তু।

২০২২ সালে কেকেআর অশোককে কিনেছিল ৫৫ লাখ টাকায়। ২০২৫ সালে ৩০ লাখে কেনে রাজস্থান। ২০২৬ সালে ৯০ লাখ টাকায় কিনেছে গুজরাত। এ ছাড়া রাজস্থানের হয়ে নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেট এবং ক্লাব ক্রিকেট খেলেন অশোক। ক্রিকেটের সব আয় বাড়ি, পরিবারের জন্য খরচ করেন। মাটির কাঁচা বাড়ি থেকে পাকা বাড়ি। একতলা থেকে দোতলা বাড়ি। বাবার স্কুটার। নিজের থর। ২৩ বছরের বোলারের সব বিনিয়োগ রামপুরায়।

অশোকের বাড়ি দেখতে অনেকে আসছেন। আরও অনেকে আসবেন। কোনও দিন হয়তো নেতা-মন্ত্রী-আমলারাও আসবেন। তখন রাস্তা হবে। উন্নয়ন হবে। রামপুরার বাসিন্দারা স্বপ্ন দেখছেন। অশোকের গতিই তাঁদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। যেমন শুভমনেরাও দেখছেন।

সংক্ষেপে
  • ২৮ মার্চ থেকে শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা। গত বছর প্রয়াত ১১ সমর্থকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বার হল না উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
  • আইপিএলের গ্রুপ পর্বের ৭০টি ম্যাচের সূচি ঘোষণা হয়েছে। প্রথমে ২০টি ম্যাচের সূচি জানিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। পরে বাকি ৫০টি ম্যাচেরও সূচি ঘোষণা করেছে বোর্ড।
  • আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি, পাঁচ বার করে ট্রফি জিতেছে চেন্নাই সুপার কিংস এবং মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। কলকাতা নাইট রাইডার্স জিতেছে তিন বার।
Gujarat Titans Jaipur
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy