E-Paper

‘জেতাতে হবে’, প্রয়াত কোচের কথা রাখেন মুকুল

২০২০-তে আরাবল্লি অ্যাকাডেমিতে আসার পর থেকেই ছক্কা হাঁকানোর মেশিনে পরিণত হন মুকুল। কোচ বিবেকের নির্দেশে দিনে ১৫০-২০০ ছক্কা হাঁকাতেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁকে খেলতে নিয়ে যেতেন কোচ।

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত 

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫৯
উৎসব: মুকুলকে কেক মাখিয়ে দিচ্ছেন অধিনায়ক ঋষভ।

উৎসব: মুকুলকে কেক মাখিয়ে দিচ্ছেন অধিনায়ক ঋষভ। ছবি: এলএসজি।

‘ভক্ত ‘ক্যাপ্টেন কুল’-এর। নাম— মু‘কুল’। তোর নামের মধ্যেই কুল আছে।’

বন্ধুরা এ ভাবেই মস্করা করতেন তাঁর সঙ্গে। ছোটবেলায় তাঁর জীবনে আনন্দ বলে কিছু ছিল না। সংসারে টানাপড়েন থেকে ক্রিকেট সরঞ্জামের অভাব। ধার-দেনায় ডুবতে থাকা বাবা, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা কোচ, এই বৃত্তের মধ‌্যেই যেন আটকে গিয়েছিলেন তিনি। জীবনের প্রত্যেক ধাপেই পরীক্ষার মুখে পড়েছিলেন মুকুল চৌধরি। ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে হারতে থাকা ম্যাচে নিজের দল লখনউ সুপার জায়ান্টসকে জেতানোর পরেও তাই সীমিত উৎসবেই খুশি ২১ বছরের তরুণ।

অল্পে সন্তুষ্ট হওয়ার ছেলে তিনি নন। এসবিএস ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে বোলার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আট-নয় নম্বরে ব্যাট করতেন। বড় ছক্কা হাঁকাতে পারতেন। জয়পুরে আরাবল্লি ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে আসার পরেও বোলার হিসেবেই যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু তাঁর ছক্কা হাঁকানো দেখে তৎকালীন কোচ বিবেক যাদব নির্দেশ দেন, ‘‘ব্যাটিং করো। রাজস্থান থেকে পেস বোলার হওয়া কঠিন। পিচ পেসারদের সাহায্য করে না। তোমার ছক্কা মারার দক্ষতা আছে। সেটাকে কাজে লাগাও।’’

২০২০-তে আরাবল্লি অ্যাকাডেমিতে আসার পর থেকেই ছক্কা হাঁকানোর মেশিনে পরিণত হন মুকুল। কোচ বিবেকের নির্দেশে দিনে ১৫০-২০০ ছক্কা হাঁকাতেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁকে খেলতে নিয়ে যেতেন কোচ। একটি ম্যাচের আগে বলা হয়েছিল, ‘‘২০টি ছক্কা মারতে পারলে নতুন ব্যাট দেব।’’ মুকুল ঠিক ২১টি ছক্কা মেরেছিলেন। বাধ্য হয়ে তাঁকে নতুন ব্যাট দেন বিবেক। কিন্তু পাকস্থলীতে ক্যানসার জীবন কেড়ে নেয় তাঁর কোচের।

দ্বিতীয় লকডাউনের সময় অক্সিজেনও ঠিক মতো পাওয়া যাচ্ছিল না। মুকুল নিজে জয়পুরে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করে অক্সিজেন জোগাড়ের চেষ্টা করতেন। শেষমেশ কোচকে বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় মুকুলের হাত ধরে বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন কোচ। কী বলেছিলেন? বিবেকের ভাই বিকাশ যাদব জয়পুর থেকে ফোনে আনন্দবাজারকে বলছিলেন, ‘‘আমার দাদা ওকে নিজের ছেলের মতো দেখত। মৃত্যুর আগে মুকুলকে বলে গিয়েছিল, ভারতের হয়ে তোকে খেলতেই হবে। আইপিএলও খেলতে হবে। ম্যাচ জেতাতে হবে। তুই পারবি মুকুল! তুই পারবি!’’ কথা রেখেছেন তাঁর ছাত্র। ইডেনে ২৭ বলে অপরাজিত ৫৪ রান করে আকাশের দিকে হাত জোড় করে তাকিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াত কোচের মুখটা কি ভেসে উঠেছিল মুকুলের সামনে? সাংবাদিক বৈঠকে অবশ্য এই নিয়ে কিছু বলেননি মুকুল। প্রয়াত কোচের ভাই বিকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরেই উঠে এল এইহৃদয়বিদারক ঘটনা।

বিকাশ বলছিলেন, ‘‘দাদার মৃত্যুর পর থেকেই মুকুলের মধ‌্যে অন্য রকম জেদ লক্ষ্য করি। নিজে উদ্যোগ নিয়ে দল গঠন করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলতে যেত। যা এক সময় দাদা করত। ধার করে প্রবেশমূল্য যোগাড় করত মুকুল। প্রতিযোগিতা জিতিয়ে যে টাকা পেত, আগে সেটা দিয়ে ধার মেটাত। বাকি টাকা সতীর্থদের মধ্যে ভাগ করে দিত।’’ যোগ করেন, ‘‘এখনও কিপ্যাড ফোন ব্যবহার করে। ওর মামা আইপিএলের আগে স্মার্টফোন দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামওখুলে দিয়েছে।’’

বিবেক চলে যাওয়ার পরে বিকাশই প্রশিক্ষণ দেন মুকুলকে। বলছিলেন, ‘‘রাজস্থানের অনূর্ধ্ব-১৯ ম্যাচ খেলার সময় ওর কাছে জুতো ছিল না। আমি নিজের জুতো দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ম্যাচ খেলে ফেরত দিয়ে যাস। আমার জুতো পরে এক দিনের ক্রিকেটে ২৭০ রানের ইনিংস খেলেছিল মুকুল। মেরেছিল ১৮টি ছক্কা। ওই ইনিংসের পরে আমি আর জুতোটা ফেরত চাইনি। বলেছিলাম, এ রকম খেলতে থাক। তোকে আরও নতুন জুতো দেব।’’

বিবেক ও বিকাশের অবদান ভোলেননি তাঁর বাবা দলীপ চৌধরিও। বলছিলেন, ‘‘আরাবল্লি কোচিং সেন্টারে আগে প্রত্যেক মাসে ৫০০ টাকা দিতে হত। আমি ধার করেই দিতাম। বিবেক তা জানার পর থেকে মুকুলের কাছ থেকে আর পারিশ্রমিক চাইত না। অকালে চলে গেল ওর কোচ। আজ বেঁচে থাকলে, সব চেয়ে খুশি হত।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

LSG Lucknow Super Giants

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy